‘জেনে রেখ এখানেও ফোটে ফুল’

বঞ্চনা তাদের আজন্ম সঙ্গী। চা বাগানের শ্রমজীবী পরিবারে বেড়ে ওঠা। চারপাশে সীমিত সুযোগ-সুবিধা, প্রতিকূল পরিবেশ আর অভাব। এর মধ্যেও স্বপ্ন দেখেছেন তারা, পড়াশোনা চালিয়ে গেছেন এবং নিজেদের জায়গা তৈরি করেছেন। মৌলভীবাজারের তিন চা শ্রমিক পরিবারের সন্তান এখন সাফল্যের ভিন্ন ভিন্ন পর্যায়ে। তাদের একজন সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন, একজন ভারতের অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে পিএইচডি করছেন। আরেকজন চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মেডিসিন (নিউরোলজি) বিষয়ে এফসিপিএস পার্ট-১ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন।
ব্যাংক কর্মকর্তা মনোজ কুমার: মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার চাম্পারায় জন্ম মনোজ কুমার যাদবের। সম্প্রতি সোনালী ব্যাংকের সিনিয়র অফিসার হিসেবে নিয়োগ পেয়েছেন তিনি। চা বাগানের শ্রমজীবী পরিবারের সন্তান হিসেবে বেড়ে ওঠা মনোজের সামনে সুযোগ ছিল সীমিত। তবে সেই সীমাবদ্ধতা তাকে থামাতে পারেনি। অধ্যবসায় ও কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে শিক্ষাজীবন শেষ করে তিনি এখন ব্যাংকিং পেশায় নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন।
চিকিৎসাসেবায় আকাশ নুনিয়া: চা বাগানের বাস্তবতা থেকে উঠে এসে আরেকজন যুক্ত হয়েছেন চিকিৎসাসেবায়। শ্রীমঙ্গলের কালাপুর ইউনিয়নের মাজদিহি চা বাগানে বেড়ে ওঠা ডা. আকাশ নুনিয়া বর্তমানে শ্রীমঙ্গল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। সম্প্রতি মেডিসিন (নিউরোলজি) বিষয়ে এফসিপিএস পার্ট-১ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছেন তিনি। এর পাশাপাশি ভারপ্রাপ্ত আবাসিক মেডিকেল কর্মকর্তা (আরএমও) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করছেন।
পেছনে ফিরে নিজের এই পথচলার কথা বলতে গিয়ে আকাশ সবচেয়ে বেশি স্মরণ করেন মা-বাবার ভালোবাসা ও আত্মত্যাগকে। তার ভাষায়, ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন স্কুল তাকে বড় হওয়ার স্বপ্ন দেখার সাহস দিয়েছে। যারা তার পাশে ছিলেন, তাদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়ে তিনি বলেছেন, তাদের সহযোগিতা ও অনুপ্রেরণাই তাকে সামনে এগিয়ে যাওয়ার সাহস জুগিয়েছে।
ভারতের অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ে চম্পা: চা বাগানে বেড়ে ওঠা শিশুদের উচ্চশিক্ষা ও পেশাগত সাফল্যের সুযোগ সীমিত। মনোজ কুমারের মতো একই বাস্তবতা থেকে উঠে এসেছেন চম্পা নাইডু। কুলাউড়া উপজেলার লংলা চা বাগানে বেড়ে ওঠা চম্পা এখন ভারতের অন্ধ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের নৃবিজ্ঞান বিভাগে পিএইচডি করছেন। তার শিক্ষাজীবনের বাঁকবদল ঘটে ২০১০ সালে। ওই বছর প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি ক্যামেলিয়া ডানকান ফাউন্ডেশন স্কুলে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পান। বিনা খরচে পড়াশোনা ও আবাসনের সুযোগ তার সামনে উচ্চশিক্ষার পথ খুলে দেয়। শিক্ষাজীবন যত এগিয়েছে, চা শ্রমিক পরিবারের সন্তান হিসেবে নিজের বেড়ে ওঠার অভিজ্ঞতাও চম্পার ভাবনায় গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। চা শ্রমিকদের শিক্ষা, অধিকার ও জীবনযাত্রা নিয়ে কাজ করতে গিয়ে মানবাধিকার ও পাবলিক পলিসির প্রতি তার আগ্রহ তৈরি হয়। সেই আগ্রহই শেষ পর্যন্ত তাকে দেশের গণ্ডি পেরিয়ে গবেষণার জগতে নিয়ে যায়।



