পুশইন
ট্রাকে করে সীমান্তে আনা হয় মানুষ
- কমপক্ষে কুড়িগ্রামের ৮টি পয়েন্ট দিয়ে পুশইনের চেষ্টা
- সতর্ক অবস্থানে বিজিবি
- বিজিবির সঙ্গে পাহারায় গ্রামবাসী

বিএসএফের পুশইনের অপচেষ্টাসহ নানাবিধ কারণে সীমান্তপাড়ে এখন চরম অস্বস্তি বিরাজ করছে। ছবি : আগামীর সময়
টানা কয়েক দিন ধরে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফের পুশইনের অপচেষ্টাসহ নানাবিধ কারণে সীমান্তপাড়ে এখন চরম অস্বস্তি বিরাজ করছে। এই পরিস্থিতিতে খুব জরুরি প্রয়োজন ছাড়া স্থানীয় জনগণও সীমান্ত পাড়ে যাচ্ছেন না। তবে পুশইনের যেকোনো অপচেষ্টা রুখে দিচ্ছে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি)। বাহিনীটির সঙ্গে যোগ দিচ্ছে স্থানীয় বাসিন্দারাও।
বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ভারতীয় সীমান্ত ক্যাম্পগুলোয় ট্রাকে ট্রাকে করে মানুষ আনা হচ্ছে। রাত হলেই সীমান্তের লাইট বন্ধ করে চেষ্টা চালানো হচ্ছে পুশইনের।
তবে স্থানীয় বিজিবি ও এলাকাবাসী জানিয়েছে, তারা সতর্ক অবস্থানে রয়েছেন। যেকোনো পুশইনের অপচেষ্টা তারা রুখে দেবেন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কুড়িগ্রামের রৌমারী সীমান্তে অন্তত ৮টি পয়েন্ট দিয়ে শতাধিক নাগরিককে বাংলাদেশে পুশইনে বিএসএফের অপচেষ্টা ব্যর্থ করে দিয়েছে বিজিবি ও স্থানীয় জনতা।
৮ জুন রাত ১০টার দিকে রৌমারী উপজেলা দিয়ে এই পুশইন উত্তেজনা শুরু হয়। এরপর গত ৯ জুন মঙ্গলবার রাত ১টার দিকে জামালপুর ব্যাটালিয়নের অধীন মোট আটটি বর্ডার অবজারভেশন পোস্ট (বিওপি) এলাকায় একযোগে এই পুশইনের চেষ্টা চালানো হয়।
প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রে বিএসএফ কৌশলে সীমান্তের লাইট বন্ধ করে দেয় এবং ‘থ্রি-টন’ ট্রাকে করে লোক নিয়ে এসে বাংলাদেশে পুশইনের চেষ্টা চালায়। তবে বিজিবি ও স্থানীয় সীমান্তবাসীর কড়া নজরদারি ও প্রতিরোধের মুখে বিএসএফের এই অপচেষ্টা পুরোপুরি ব্যর্থ হয়।
বিএসএফ যে পয়েন্টগুলো দিয়ে পুশইনের চেষ্টা চালায়, সেগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো দাঁতভাঙ্গা বিওপি সীমান্ত পিলার, মোল্লারচর বিওপি এলাকা, ইজলামারী বিওপি এলাকা এবং খেয়ারচর বিওপি এলাকা। এ ছাড়া, পাথরেরচর বিওপি এলাকা, বাঘারচর ও সাতানীপাড়া বিওপি সীমান্ত এলাকা এবং ঝাউডাঙ্গা বিওপি এলাকা থেকেও ট্রাকে করে মানুষ এনে পুশইনের চেষ্টা করা হলে তা ভণ্ডুল হয়ে যায়।
ভারতের আসাম এবং পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বাংলাভাষী মুসলিম ও অন্যান্য বাসিন্দাদের 'বাংলাদেশি' আখ্যা দিয়ে আটকে রাখছে সে দেশের পুলিশ। আটক করা নারী, পুরুষ ও শিশুদের প্রথমে বিভিন্ন জেলার হোল্ডিং সেন্টারগুলোয় রাখা হয়। পরবর্তী সময়ে তাদের বিএসএফের কাছে হস্তান্তর করা হয়।
সম্প্রতি আসামের মানকারচর থানাধীন মানকারচর, কাকড়িপাড়া এবং সুদুরটিলা বিওপিসংলগ্ন ক্যাম্প ও বাড়িগুলোয় শত শত মানুষকে এনে জড়ো করেছে বিএসএফ। সেখান থেকে সুযোগ বুঝে তাদের ছয়টি পয়েন্ট সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশের ভূখণ্ডে পুশইন করার চেষ্টা চালানো হচ্ছে। কিন্তু সীমান্তবর্তী এলাকাবাসী ও বিজিবির কঠোর অবস্থানের কারণে বিএসএফের এই প্রচেষ্টা বারবার নস্যাৎ হয়ে যাচ্ছে।
বড়াইবাড়ি সীমান্তের বাসিন্দা আমজাদ হোসেন বলেছেন, ‘ভারতের পুশইন ঠেকাতে কয়েক দিন ধরে দিনরাত বিজিবি এবং এলাকাবাসী মিলে পাহারা দিচ্ছি। যাতে একটি লোককেও তারা এপাড়ে পুশইন করতে না পারে। যতক্ষণ বুকে বল রয়েছে, ততক্ষণ পর্যন্ত ভারতের এই অন্যায়ের বিরুদ্ধে এভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলব।
‘বিএসএফ প্রথমে ট্রাকে করে কাঁটাতারের পাশে মানুষকে আনে, তারপর লাইট বন্ধ করে দিয়ে পুশইনের চেষ্টা করে’, যোগ করেন আমজাদ হোসেন।
রৌমারী উপজেলার যাদুরচর ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য নজরুল ইসলাম জানালেন, কয়েক দিন ধরে ভারতীয় সীমান্তে বিএসএফ ক্যাম্পগুলোয় শত শত মানুষকে ধরে এনে রাখা হয়েছে বাংলাদেশে পুশইন করার জন্য। গত মঙ্গলবার সকালেও তারা একাধিকবার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছে। গত তিন দিনে বিজিবি ও এলাকাবাসী মিলে লাঠিসোঁটা নিয়ে দিনরাত সীমান্ত পাহারা দিচ্ছেন।
সর্বশেষ গত বুধবার (১০ জুন) রাতে রৌমারী উপজেলার খেওয়ারচর সীমান্তের আন্তর্জাতিক ১ হাজার ৬৯ নম্বর মেইন পিলারের ২৪ সাব পিলারের নিকটবর্তী ভারতের সদরটিলা বিএসএফ ক্যাম্পের কাঁটাতারের বেড়ার কাছে ট্রাকে করে বেশ কিছু ভারতীয় মুসলিম নাগরিককে জড়ো করা হয়।
সীমান্ত এলাকায় বিজিবি, আনসার, গ্রাম পুলিশসহ স্থানীয় তরুণ, যুবক ও বয়োজ্যেষ্ঠরা শক্ত অবস্থানে থেকে ওই এলাকায় পাহারা দিচ্ছেন বলে জানিয়েছেন স্থানীয় ইউপি সদস্য মো. নজরুল ইসলাম।
জামালপুর ৩৫-বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল হাসানুর রহমান জানালেন, কয়েক দিন ধরে কুড়িগ্রামের রৌমারী ও জামালপুরের একাধিক এলাকা দিয়ে পুশইনের চেষ্টা করা হয়েছিল। দেশের সার্বভৌমত্ব ও সীমান্ত সুরক্ষায় বিজিবি অত্যন্ত কঠোর অবস্থানে রয়েছে।
‘অনুপ্রবেশের এ ঘটনার পর থেকে সীমান্ত জুড়ে নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নজরদারি আরও জোরদার করা হয়েছে। যেকোনো ধরনের অবৈধ অনুপ্রবেশ ঠেকাতে বিজিবি সদা তৎপর রয়েছে। বিজিবির সঙ্গে সীমান্ত পাহারায় গ্রামবাসীও যোগ দিয়েছেন’, যোগ দিচ্ছেন করেন হাসানুর রহমান।




