রোহিঙ্গা ক্যাম্পে ১৯৩ ভূমিধস, সতর্ক প্রশাসন

বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট নিম্নচাপের প্রভাবে টানা ভারী বর্ষণে কক্সবাজার জুড়ে দেখা দিয়েছে পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা ও বন্যা পরিস্থিতির আশঙ্কা। এরই মধ্যে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরে পাহাড়ধসে আটজন এবং কক্সবাজার সদরে নিহত হয়েছেন আরও একজন। একই সঙ্গে বিভিন্ন উপজেলায় জলাবদ্ধতা, সড়ক ক্ষতিগ্রস্ত এবং নতুন করে পাহাড়ধসের ঝুঁকি তৈরি হওয়ায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে জেলা প্রশাসন।
এ পরিস্থিতিতে আজ সোমবার বিকালে জেলা প্রশাসকের সম্মেলন কক্ষে করণীয় নির্ধারণে জেলা দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটির জরুরি সভা অনুষ্ঠিত হয়।
সভায় সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান। এতে জেলার বিভিন্ন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, সরকারি দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।
সভায় জানানো হয়, আজ সোমবার বিকাল ৩টা পর্যন্ত কক্সবাজারে ২৪ ঘণ্টায় ২৭৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর আগের ২৪ ঘণ্টায় বৃষ্টিপাত ছিল ২৪০ মিলিমিটার।
আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী, আগামী আরও তিন দিন ভারী থেকে অতিভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকতে পারে। একই সঙ্গে সমুদ্রবন্দরগুলোকে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্কসংকেত দেখিয়ে যেতে বলা হয়েছে।
দুর্যোগ পরিস্থিতির সর্বশেষ চিত্র তুলে ধরে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারা জানালেন, সবচেয়ে ভয়াবহ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে উখিয়ার রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরে। গতকাল থেকে সেখানে ১৯৩টি ভূমিধসের ঘটনা ঘটেছে। পৃথক তিনটি পাহাড়ধসে আটজন রোহিঙ্গার মৃত্যু হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং চালিয়ে বাসিন্দাদের নিরাপদ স্থানে সরে যেতে বলা হচ্ছে। অনেক পরিবার এরই মধ্যে আশ্রয়কেন্দ্রে উঠেছে। হলদিয়াপালং ও পালংখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে এবং নতুন করে পাহাড়ধসের আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। কক্সবাজার সদর উপজেলায় পাহাড়ধসে ছাত্তারঘোনা এলাকায় একজন নিহত এবং তিনজন আহত হয়েছেন। পাশাপাশি সদর উপজেলার বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং অব্যাহত রয়েছে। পিএমখালী ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হওয়ায় স্থানীয় প্রশাসন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে।
টেকনাফ উপজেলার হোয়াইক্যং, হ্নীলা ও বাহারছড়া ইউনিয়নকে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। টেকনাফ পৌরসভার কয়েকটি সড়কে ভাঙন এবং বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। তবে টেকনাফ-উখিয়া মহাসড়কে বৃষ্টির কারণে সাময়িক জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও অল্প সময়ের মধ্যেই পানি নেমে যাচ্ছে। সড়কে ধসেপড়া পাহাড়ের মাটি দ্রুত অপসারণের জন্য সংশ্লিষ্ট বিভাগকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
রামু ও ঈদগাঁও উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। তবে ঈদগাঁও উপজেলা প্রশাসন জানিয়েছে, যেকোনো পরিস্থিতি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি সম্পন্ন রয়েছে। চকরিয়া উপজেলায় পাহাড়ধসের আশঙ্কা থাকায় ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা থেকে মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে। পেকুয়ায় সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় সব সাইক্লোন শেল্টার প্রস্তুত রাখা হয়েছে। কুতুবদিয়ায় ভারী বৃষ্টির কারণে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হলেও সচেতনতা বৃদ্ধিতে প্রচারণা চালানো হচ্ছে। মহেশখালীতে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় মাইকিং অব্যাহত রয়েছে। একই সঙ্গে ধলঘাটা বেড়িবাঁধ দ্রুত সংস্কারের দাবি জানানো হয়েছে, অন্যথায় জোয়ার ও অতিবৃষ্টিতে নতুন এলাকা প্লাবিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
সভায় বিভিন্ন সদস্য জানতে চান, জেলার কত মানুষ পানিবন্দি হয়েছেন, কতটি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে, কতজন স্বেচ্ছাসেবক মাঠে কাজ করছেন এবং জেলা প্রশাসনের প্রস্তুতির বর্তমান অবস্থা কী। এ ছাড়া কক্সবাজার পৌরসভার ৫ ও ৬ নম্বর ওয়ার্ডে সৃষ্ট জলাবদ্ধতা নিরসনে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে— সে বিষয়েও বিস্তারিত জানতে চান তারা। জেলা প্রশাসন এসব তথ্য দ্রুত হালনাগাদ করে সমন্বিতভাবে প্রকাশের উদ্যোগ নেওয়ার কথা জানায়।
সভায় জানানো হয়, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। জরুরি প্রয়োজনে বিতরণের জন্য ৪৫০ প্যাকেট শুকনো খাবার মজুদ রয়েছে এবং অতিরিক্ত এক হাজার প্যাকেট শুকনো খাবারের চাহিদা পাঠানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের জন্য ৭৭ বান্ডিল ঢেউটিনও প্রস্তুত রাখা হয়েছে। পরিস্থিতির অবনতি হলে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সার্বক্ষণিক কন্ট্রোল রুম চালু করা হবে এবং সব উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় জোরদার করা হবে।
সভায় রোহিঙ্গা ক্যাম্পের বর্তমান পরিস্থিতি, পাহাড়ধসের ঝুঁকি, জলাবদ্ধতা, খাদ্য ও আশ্রয় ব্যবস্থাপনা এবং সম্ভাব্য দুর্যোগ মোকাবিলায় সরকারি বিভিন্ন দপ্তরের প্রস্তুতি তুলে ধরেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। চলমান পরিস্থিতি নিয়ে মতামত দেন কক্সবাজার প্রেস ক্লাবের সভাপতি মাহবুবুর রহমানও।
সভাপতির বক্তব্যে জেলা প্রশাসক মো. আবদুল মান্নান বলেছেন, আবহাওয়া পরিস্থিতি বিবেচনায় কোনো ধরনের আত্মতুষ্টির সুযোগ নেই। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বসবাসকারী মানুষকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নিতে হবে। আশ্রয়কেন্দ্রগুলো প্রস্তুত রাখতে হবে এবং সুপেয় পানি, শুকনো খাবার ও প্রয়োজনীয় ত্রাণসামগ্রী নিশ্চিত করতে হবে।
পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা কিংবা অন্য যেকোনো দুর্যোগ মোকাবিলায় সংশ্লিষ্ট সব সরকারি দপ্তর, জনপ্রতিনিধি এবং স্বেচ্ছাসেবীদের সমন্বিতভাবে কাজ করার নির্দেশ দেন তিনি।
জেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, আগামী কয়েক দিন ভারী বর্ষণ অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা থাকায় কক্সবাজারবাসীকে অপ্রয়োজনে পাহাড়ের ঢাল ও পাদদেশে অবস্থান না করার পাশাপাশি প্রশাসনের নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানানো হয়েছে। কারণ, টানা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটি এরই মধ্যে নরম হয়ে গেছে। যেকোনো সময় নতুন করে পাহাড়ধস, জলাবদ্ধতা কিংবা আকস্মিক দুর্যোগের ঘটনা ঘটতে পারে।




