হাওরে পাঁচ তরুণের স্বপ্নের তরী

ভোর ৫টা, সুনামগঞ্জের নিয়ামতপুর ঘাটের চারপাশে নীরবতা। হাউজবোটের ইঞ্জিনের গুঞ্জনে ধীরে ধীরে জেগে উঠছে হাওর। জল কেটে সামনে এগিয়ে যাচ্ছে একটি হাউজবোট। গলুইয়ে বড় করে লেখা— ‘বোরাক’। তরীর সঙ্গে যেন এগিয়ে যাচ্ছে পাঁচ তরুণের কয়েক বছরের স্বপ্নও। চারটি কক্ষ ও একটি লবি মিলিয়ে একসঙ্গে থাকতে পারেন ১৫ জন। আছে খোলা ছাদ, হাওরের জল আর প্রকৃতির কাছাকাছি থাকার সুযোগ। তবে এসবের চেয়েও বড় হলো, এর পেছনে থাকা পাঁচ তরুণের গল্প।
সিলেট কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (সিকৃবি) পাঁচ শিক্ষার্থীর উদ্যোগে তৈরি হয়েছে ‘বোরাক’। পুঁজি ছিল সীমিত, ব্যবসার অভিজ্ঞতাও ছিল না। ছিল টিউশনি ও স্টাইপেন্ডের জমানো টাকা, বন্ধুদের কাছ থেকে ধার এবং নিজেদের ওপর বিশ্বাস। প্রায় ১৫ লাখ টাকা জোগাড় করে তারা শুরু করেন হাউজবোট তৈরির কাজ।
গল্পের শুরু ২০২৪ সালের নভেম্বরে। চার বন্ধু তানভীর আহমেদ কনক, আদিব হাসান প্রান্ত, মখসেদুল হক মুমিন ও এমদাদুল্লাহ চৌধুরী ঘুরতে গিয়েছিলেন টাঙ্গুয়ার হাওরে। ফিরে বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যানটিনে চা-শিঙাড়ার আড্ডায় সে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা নিয়ে কথা হচ্ছিল। সেখানেই তাদের মাথায় আসে হাওরে হাউজবোট চালানোর ভাবনা।
ভাবনাটা সহজ ছিল; কিন্তু বাস্তবায়ন ততটা সহজ ছিল না। চার বন্ধুর হাতে ব্যবসা শুরুর মতো পর্যাপ্ত টাকা ছিল না। তখন তাদের সঙ্গে যুক্ত হন আরেক বন্ধু বাঁধন। পাঁচজন মিলে নিজেদের সঞ্চয়, টিউশনি ও স্টাইপেন্ডের টাকা এবং ধার করা অর্থ দিয়ে শুরু করেন ‘বোরাক’ তৈরির কাজ।
নৌকা বানানো থেকে শুরু করে হাওরে সেটি পরিচালনা— সবকিছুতেই অভিজ্ঞতার প্রয়োজন ছিল। তাই তাহিরপুরের একটি মাদ্রাসার এক শিক্ষককে নৌকা নির্মাণ ও পরিচালনার দায়িত্ব দেন তারা। অভিজ্ঞ একজন মানুষ পাশে থাকায় পাঁচ বন্ধুরও ভরসা হয়েছিল। কিন্তু সে ভরসা বেশি দিন টেকেনি। পরে ওই ব্যক্তির বিরুদ্ধে মালিকদের না জানিয়ে ট্রিপ পরিচালনা ও জ্বালানি তেল আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। এতে বড় ধরনের ধাক্কা খান পাঁচ তরুণ।
মখসেদুল হক মুমিন বলেছেন, ‘যাকে ভাইয়ের মতো বিশ্বাস করেছিলাম, শেষ পর্যন্ত তার কাছ থেকেই প্রতারণার শিকার হতে হয়েছে। সময়টা আমাদের জন্য খুব কঠিন ছিল।’
নিজেদের হাতে পুরো ব্যবস্থাপনা নেওয়ার পর নতুন করে কাজ শুরু করেন তারা। প্রায় পাঁচ মাসের প্রস্তুতি শেষে ২০২৬ সালের মাঝামাঝি পানিতে নামে ‘বোরাক’। নৌকা পানিতে নামলেও শুরুটা মসৃণ ছিল না। বুকিং কম, প্রচারের অভিজ্ঞতা নেই, ব্যবসা পরিচালনার বাস্তব জ্ঞানও সীমিত। তবু তারা থামেননি। ধীরে ধীরে পরিচিতি বাড়তে থাকে, বাড়ে পর্যটকদের আগ্রহও।
বর্তমানে সুনামগঞ্জের নিয়ামতপুর ঘাট থেকে নিয়মিত চলছে ‘বোরাক’। দুই দিন এক রাতের ভ্রমণ প্যাকেজে পর্যটকদের জন্য রাখা হয়েছে হাওরে রাত কাটানো, স্থানীয় খাবার, হাঁসের মাংস, নদীর মাছসহ বিভিন্ন আয়োজন।
তবে খাবার বা ভ্রমণের আয়োজনের চেয়েও যাত্রীদের নিরাপত্তাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন উদ্যোক্তারা। এমদাদুল্লাহ চৌধুরীর ভাষায়, ‘আমাদের প্রথম শর্ত যাত্রীদের নিরাপত্তা ও তাদের বিশ্বাস অর্জন। সেই জায়গায় কোনো আপস করতে চাই না।’



