চাঁদপুরে সেবার ঘরে তালা
- মিলছে না ওষুধ, সুফল পাচ্ছে না মানুষ

ছবি: আগামীর সময়
প্রান্তিক মানুষের দোরগোড়ায় বিনামূল্যে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছে দিতে সারা দেশে কমিউনিটি ক্লিনিক গড়ে তুলেছে সরকার। কিন্তু চাঁদপুরের বিভিন্ন উপজেলায় এ উদ্যোগের সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন অনেক মানুষ। নির্ধারিত সময়ে ক্লিনিক বন্ধ থাকা, স্বাস্থ্যকর্মীদের অনুপস্থিতি, ওষুধ সংকট এবং সেবা দিতে টাকা নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে সরকারি এই সেবাকেন্দ্রগুলোর ওপর নির্ভরশীল দরিদ্র ও নিম্ন আয়ের মানুষ পড়েছেন ভোগান্তিতে।
চাঁদপুরের কচুয়া, মতলব উত্তর ও দক্ষিণ, হাজীগঞ্জ, শাহরাস্তি, হাইমচরসহ বিভিন্ন উপজেলার কমিউনিটি ক্লিনিক ঘুরে এবং স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এসব অভিযোগ পাওয়া গেছে। নিয়ম অনুযায়ী, সকাল ৯টা থেকে বেলা ৩টা পর্যন্ত ক্লিনিক খোলা থাকার কথা। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে সেবা নিতে এসে অনেক রোগীকে ক্লিনিক বন্ধ পেয়ে ফিরে যেতে হয়। আবার কোনো কোনো সময় স্বাস্থ্যকর্মীদের না পেয়ে প্রাথমিক চিকিৎসা ও পরামর্শের জন্য তাদের ছুটতে হয় উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স বা বেসরকারি চিকিৎসাকেন্দ্রে। এতে বাড়ছে যাতায়াতের খরচ ও চিকিৎসার ব্যয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মাফিয়া বেগম ও জান্নাতুল ফেরদৌসের ভাষায়, কমিউনিটি ক্লিনিকে গিয়ে অনেক সময় প্রয়োজনীয় ওষুধ পাওয়া যায় না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে সেবা নিতে টাকার কথাও বলা হয়। তাদের অভিযোগ, বিনামূল্যে চিকিৎসা পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে এমন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে রোগীদের।
মতলব উত্তর কমিউনিটি ক্লিনিকে সেবা নিতে গিয়েছিলেন আমান উল্লাহ। তার মতে, শুধু ক্লিনিক স্থাপন করলেই হবে না; সেখানে স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়মিত উপস্থিতি, পর্যাপ্ত ওষুধ সরবরাহ এবং বিনামূল্যে সেবা নিশ্চিত করতে হবে। অনিয়মের অভিযোগ তদন্ত করে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি মাঠপর্যায়ে তদারকি বাড়ানোরও দাবিও জানিয়েছেন তিনি।
রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ কয়েকজন কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) স্বীকার করেছেন। তাদের দাবি, চাহিদার তুলনায় ওষুধ সরবরাহ কম থাকায় রোগীদের প্রত্যাশা অনুযায়ী সেবা দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।
স্বাস্থ্য বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, চাঁদপুরের আটটি উপজেলায় বর্তমানে ২০০টি কমিউনিটি ক্লিনিক চালু রয়েছে। বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দায়িত্ব এসব কেন্দ্রের ওপর থাকলেও জনবল ও তদারকির সীমাবদ্ধতায় সেবার মান নিয়ে প্রশ্ন উঠছে।
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) চাঁদপুর জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক রহিম বাদশা বলেছেন, ‘কমিউনিটি ক্লিনিক প্রান্তিক মানুষের চিকিৎসাসেবার গুরুত্বপূর্ণ অবলম্বন। কিন্তু ক্লিনিক বন্ধ থাকা, অনিয়মিত সেবা ও ওষুধের সংকটে মানুষ সেই সুবিধা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।’ তার মতে, স্বাস্থ্যকর্মীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা, নিয়মিত পরিদর্শন এবং রোগীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগ তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
অভিযোগের বিষয়ে চাঁদপুরের সিভিল সার্জন নুরে আলম দীনের ভাষ্য, কমিউনিটি ক্লিনিকের সেবা কার্যক্রমে তদারকির ঘাটতি রয়েছে। দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা যথাসময়ে ক্লিনিকে আসেন না— এমন অভিযোগ তাদের কাছেও রয়েছে। বিষয়গুলো নিয়ে স্বাস্থ্য সহায়তা ট্রাস্টকে একাধিকবার চিঠি দেওয়া হয়েছে। অনিয়মের ঘটনায় কারও কারও বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন তিনি।
সরকারি উদ্যোগে গড়ে ওঠা ২০০টি কমিউনিটি ক্লিনিককে কার্যকর রাখতে এখন নিয়মিত সেবা, পর্যাপ্ত ওষুধ এবং জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি বলে মনে করছেন সেবাপ্রত্যাশীরা। কারণ, এসব কেন্দ্রে অনিয়মের সরাসরি প্রভাব পড়ে সেই মানুষগুলোর ওপর, যাদের জন্যই এ ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছে।
তবে সিভিল সার্জন বলেছেন, জনবল সংকটের কারণে সব কমিউনিটি ক্লিনিক নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব হচ্ছে না। কিন্তু দায়িত্বে অবহেলা ও অনিয়ম গ্রহণযোগ্য নয়। তার ভাষ্য, বেশ কিছুদিন ওষুধ সরবরাহে ঘাটতি থাকলেও গত মাসে ক্লিনিকগুলোয় ওষুধ এসেছে। বর্তমানে ওষুধের সংকট থাকার কথা নয় বলে তিনি মনে করেন। কোনো ক্লিনিকে টাকা নেওয়া বা ওষুধ না দেওয়ার অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাসও দিয়েছেন তিনি।



