বালিয়ামারী-কালাইয়েরচর সীমান্ত হাটে তালা, পেশা বদলাচ্ছেন ব্যবসায়ীরা
- বালিয়ামারী-কালাইয়েরচর বর্ডার হাট
- ভ্যানচালক, নৌকার মাঝি ও কুলিদের আয় কমেছে

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘আগে ওপার থেকে জিনিসপত্র এনে ব্যবসা করতাম, আয়ও বেশ ভালো ছিল। কিন্তু হাট বন্ধ থাকায় আয় বন্ধ। সংসার বাঁচাতে বাধ্য হয়ে এখন ছোট দোকান দিয়েছি। হাটটা চালু করলে আমার মতো আরও অনেকেই ভালোভাবে চলতে পারবে’— আক্ষেপের সুরে কথাগুলো আগামীর সময়কে বলছিলেন বালিয়ামারী-কালাইয়েরচর বর্ডার হাটের ক্রেতা কার্ডধারী ব্যবসায়ী মুসলিম উদ্দিন। হাট বন্ধ থাকায় তার মতো শতাধিক ব্যবসায়ী বাধ্য হয়ে বদলাচ্ছেন পেশা।
মূলত ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ঢাকা-দিল্লির সম্পর্কে টানাপড়েনে সীমান্ত বাণিজ্য পুরোপুরি বন্ধ রয়েছে। ফলে কুড়িগ্রামের চর রাজীবপুর উপজেলার অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি এই সীমান্ত হাটের ওপর প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে নির্ভরশীল প্রায় ১০ হাজার মানুষ পড়েছেন বিপাকে।
সংশ্লিষ্টরা জানালেন, হাটে বাংলাদেশের ৫৮৭ জন ক্রেতা ও ২৫ জন বিক্রেতা নিবন্ধিত কার্ডধারী ব্যবসায়ী রয়েছেন। তাদের বেশিরভাগই মূলত ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী; যারা ওপার থেকে পণ্য এনে এপারে বিক্রি করতেন। হাট বন্ধ থাকায় নিবন্ধিত এই ৬১২ জন কার্ডধারীর মধ্যে এরই মধ্যেই শতাধিক ব্যবসায়ী পেশা পরিবর্তন করেছেন। কেউ কৃষিকাজে, কেউ রিকশা চালাচ্ছেন, কেউ বিদেশ পাড়ি দিয়েছেন, আবার কেউ কাজ নিয়েছেন গার্মেন্টসে। আবার ব্যবসা বন্ধ হওয়ায় অনেকে হয়েছেন বেকার।
ব্যবসায়ী আবুল কালাম আগামীর সময়কে বললেন, ‘আমার ক্রেতা কার্ড আছে। ওপার থেকে টুকটাক মালপত্র এনে বিক্রি করে সংসার চালাতাম। হাট চালু থাকার সময় আমরা খুব ভালো ছিলাম। কিন্তু এখন বেকার বসে আছি। না পারছি ব্যবসা করতে, না পারছি ক্ষেতখামারে কাজ করতে। হাটটি দ্রুত চালু করার জন্য সরকারের কাছে আবেদন জানাই।’
হাট ঘুরে দেখা যায়, বাংলাদেশের অংশে অবস্থিত হাটের প্রধান ফটকে ঝুলছে বড় তালা। কাঁটাতারের বেড়ায় মরিচা; বেড়া থাকলেও কিছু জায়গা উন্মুক্ত। ভেতরের শেডগুলো খালি পড়ে আছে। মাঠে গবাদিপশুর বিচরণ। নেই কোলাহল। আগে যেখানে ক্রেতা-বিক্রেতার পদচারণে তুমুল ব্যস্ততা ছিল, সেখানে বিরাজ করছে শুধুই স্থবিরতা।
আরেক ব্যবসায়ী আব্দুল জলিল আগামীর সময়কে বললেন, ‘দুই বছর ধরে হাট বন্ধ থাকায় ছেলেমেয়ে নিয়ে চলা খুব কঠিন হয়ে পড়েছে। সরকারের কাছে আবেদন, হাটটা চালু করে দিলে আমরা গরিব মানুষ একটু ভালোভাবে চলতে পারব।’
ব্যবসায়ীদের পাশাপাশি পণ্য পরিবহন ও সরবরাহ ব্যবস্থার সঙ্গে জড়িত নৌকার মাঝি, ভ্যানচালক এবং কুলিদের আর্থিক অবস্থাও শোচনীয়। হাট সচল থাকাকালে তাদের আয়ও ছিল বেশ ভালো। স্থানীয় ভ্যানচালক হাফিজুর রহমানের ভাষ্য, ‘আগে হাটের দিনে পা ফেলানোর জায়গা পাওয়া যেত না। এক ট্রিপেই ১৫০০-২০০০ টাকা আয় হতো। আর এখন সারা দিনে ৫০০ টাকাও হয় না।’
হাট বন্ধ থাকায় ব্যবসায়ী ও স্থানীয় মানুষের সমস্যার বিষয়ে কথা হয়, হাট কমিটির সদস্য ও ১ নম্বর রাজীবপুর সদর ইউনিয়নের চেয়ারম্যান মিরন মো. ইলিয়াসের সঙ্গে। তিনিও চান হাট দ্রুত চালু করা হোক। আগামীর সময়কে তিনি বললেন, ‘এই হাটের আয়ের ওপর আমাদের উপজেলার প্রায় ১০ হাজার মানুষের সংসার চলে। হাট বন্ধ থাকায় তাদের অনেকেই অন্য পেশায় চলে গেছেন। দীর্ঘদিন এই অবস্থা চলতে থাকলে অভাবের তাড়নায় এলাকায় আবারও চোরাচালান ও অপরাধ বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা বাঁচাতে অবিলম্বে হাটটি চালু করা জরুরি।’
আশার বিষয় হলো, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্পর্ক জোরদার ও বর্ডার হাট চালুর বিষয়ে সম্প্রতি বাণিজ্যমন্ত্রী খন্দকার আব্দুল মুক্তাদিরের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদী। ওই বৈঠকে বন্ধ থাকা সীমান্ত হাটগুলো আবার চালু করা, স্থলবন্দরগুলোকে পূর্ণ সচল করাসহ আলোচনা হয়েছে বিভিন্ন বিষয়ে।
সার্বিক বিষয়ে চর রাজীবপুর উপজেলার ভারপ্রাপ্ত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সায়েকুল হাসান খান আগামীর সময়কে বললেন, ‘দীর্ঘদিন বর্ডার হাট বন্ধ থাকায় স্থানীয় অর্থনীতিতে বিরূপ প্রভাব পড়েছে এবং এর ওপর নির্ভরশীল ব্যবসায়ী, কার্ডধারী, পরিবহন শ্রমিক ও মজুররা ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। সংকট লাঘবে হাটটি দ্রুত খুলে দিলে এলাকার অর্থনৈতিক প্রাণচাঞ্চল্য আবারও ফিরে আসবে।’
দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অর্থনৈতিক সংকট কাটাতে এবং প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর জীবনমান রক্ষায় অবিলম্বে বালিয়ামারী-কালাইয়েরচর বর্ডার হাটটি আবার চালুর উদ্যোগ নেওয়া হোক— এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয়দের। তারা মনে করছেন, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দ্রুত ও কার্যকর পদক্ষেপে আবারও এই হাটে কর্মচাঞ্চল্য ফিরবে এবং স্থানীয় ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীদের বাধ্য হয়ে পেশা বদলের মতো হতাশাজনক পরিস্থিতির অবসান ঘটবে।
২০১১ সালের ২৩ জুলাই বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ সিদ্ধান্তে প্রথম এই সীমান্ত হাটটি চালু হয়। হাট বসত সপ্তাহে দুদিন— সোম ও বুধবার। সীমান্ত এলাকার কৃষি, ফলমূল, মসলা, গৃহস্থালি পণ্য ও প্রসাধনসামগ্রী বিক্রি হতো এই হাটে।



