৫২ কোটি টাকা বরাদ্দ, তবু বেহাল মানিকগঞ্জের শহর খাল

মানিকগঞ্জ শহর খাল
ব্রিটিশ আমলে খনন করা হয় মানিকগঞ্জ শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত খালটি। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ছয় কিলোমিটার। খালটি সংস্কারে তিন দফায় সরকারি বরাদ্দ হয়েছে ৫২ কোটি ৩৮ লাখ ৪৬ হাজার ৮৭৩ টাকা ৮০ পয়সা।
কোটি কোটি টাকা খরচের পরও খালটির পুরোপুরি সংস্কার হয়নি। বরং এটি এখন দখল, দূষণ ও ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। নতুন সংস্কার প্রকল্পের দুটি স্থানে বাঁধ দেওয়া হয়েছে। এতে খালের পানির স্বাভাবিক প্রবাহও বন্ধ হয়ে গেছে।
নগরবাসীর অভিযোগ, দীর্ঘদিন ধরে খাল সংস্কারের নামে নেওয়া প্রকল্পে অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনা হয়েছে। পৌর কর্তৃপক্ষের নজরদারির ঘাটতি এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাজে অনিয়মের কারণে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও কাঙ্ক্ষিত সুফল মেলেনি। খালের দুই পাশে ময়লা-আবর্জনা জমে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে। কোথাও কোথাও পানি জমে মশার উপদ্রবও বেড়েছে।
মানিকগঞ্জ পৌরসভার প্রকৌশল বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, খালটি সংস্কারে প্রথম দফায় ২০০৭ সালে ৬ কোটি ১৪ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্প নেওয়া হয়। বান্দুটিয়া থেকে শুরুন্ডি পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার অংশে খালের দুই পাড়ে সিসি ব্লক বসানো এবং হাঁটার রাস্তা নির্মাণ করা হয়। তবে এক বছরের মধ্যেই প্রকল্পের কাজের বেহাল দশা দেখা দেয়। নষ্ট হয়ে যায় সিসি ব্লক। হাঁটার রাস্তাটিও ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে।
এরপর ২০০৮ সালে দ্বিতীয় দফায় কালীগঙ্গা নদীর সংযোগস্থল থেকে পৌরসভার বকজুরি সেতু পর্যন্ত খাল খননের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এ সময় খালের দুই পাড়ে অবৈধভাবে গড়ে ওঠা কিছু স্থাপনা উচ্ছেদ করা হয়। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) সহায়তায় ১৮ কোটি ২৫ লাখ ৬৩ হাজার ৬৭৭ টাকা ব্যয়ে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ও পৌরসভা যৌথভাবে প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করে। খালের ১ হাজার ৪৪০ মিটার অংশে নতুন করে ব্লক বসানো হয়। তবে সংস্কারের ছয় মাসের মধ্যেই খালটি আবার ময়লা-আবর্জনার ভাগাড়ে পরিণত হয়।
২০১৬ সালের শেষ দিকে পৌরসভা টাউন লেভেল কো-অর্ডিনেশন কমিটির সঙ্গে সভা করে খালটি পরিবেশবান্ধব করার উদ্যোগ নেয়। খাল পরিষ্কার করে সেখানে মাছ চাষের পরিকল্পনাও করা হয়। তবে তাতেও স্থায়ী সুফল আসেনি।
সর্বশেষ ২০২২ সালের ১৮ মে খালটি পুনঃখনন, শোভাবর্ধন, তিনটি সেতু ও একটি পাবলিক টয়লেট নির্মাণের জন্য নতুন প্রকল্প নেওয়া হয়। প্রকল্পটির প্রাক্কলিত ব্যয় ধরা হয় ২৭ কোটি ৯৮ লাখ ৮৩ হাজার ১৯৬ টাকা ৮০ পয়সা। যৌথভাবে কাজ পায় মেসার্স অ্যাপেক্স এন্টারপ্রাইজ ও মেসার্স কামরুল অ্যান্ড ব্রাদারস। প্রকল্পের চুক্তিমূল্য ছিল ২৫ কোটি ১ লাখ ৫৯ হাজার ৪ টাকা ৩৮ পয়সা।
প্রকল্পের কাজ শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয়েছিল ২০২৪ সালের ১০ মে। পরে প্রকল্পের মেয়াদ ও ব্যয় বাড়ানো হয়। সর্বশেষ কাজ শেষ করার সময় নির্ধারণ করা হয় গত বছরের ১০ জুন। তবে এরপরও প্রকল্পের কাজ পুরোপুরি শেষ হয়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর প্রকল্পের ঠিকাদার কাজ ফেলে চলে যান। পরে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার গঠনের পর পৌরসভায় প্রশাসক নিয়োগ দেওয়া হলে কাজ আবার শুরু হয়। তবে পুনরায় শুরু হওয়া কাজে জোড়াতালি দেওয়া হচ্ছে এবং নিম্নমানের ব্লক ব্যবহার করা হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা।
মানিকগঞ্জ পৌরসভার গঙ্গাধরপট্টি এলাকার বাসিন্দা তারিকুল হাসান বলেছেন, ‘খালের দুই পাশের বাসাবাড়ি ও হোটেল-রেস্টুরেন্টের ময়লা-আবর্জনা এই খালে ফেলা হয়। খালটি এখন শহরবাসীর গলার কাঁটা হয়ে গেছে। নোংরা পানি জমে মশার উৎপত্তি হচ্ছে। এতে নানা ধরনের রোগজীবাণু ছড়ানোর পাশাপাশি নগরবাসীর স্বাস্থ্যঝুঁকিও বাড়ছে। কয়েকবার সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া হলেও তেমন সুফল আসেনি। নতুন করে সৌন্দর্যবর্ধনের কাজ শুরু হয়েছে প্রায় চার বছর আগে, এখনো পুরোপুরি শেষ হয়নি।’
খালপাড় এলাকার ব্যবসায়ী মো. রাব্বি হোসেন বলেছেন, ‘জেলা শহরের এই খালে দীর্ঘদিন ধরেই সংস্কারকাজ চলছে। তবে এখনো খালের কোনো সৌন্দর্য ফিরে আসেনি। বছরের পর বছর সরকারের অর্থই অপচয় হয়েছে।’
সুশাসনের জন্য নাগরিকের (সুজন) মানিকগঞ্জ শাখার সাধারণ সম্পাদক জাহাঙ্গীর আলম বিশ্বাস বলেছেন, ‘মানিকগঞ্জ শহরের মধ্য দিয়ে প্রবাহিত খালটি আমাদের ঐতিহ্যের প্রতীক। একসময় সারা বছরই খালে পানি থাকত, নৌকা চলত। এখন দখল, দূষণ আর ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হয়েছে। কয়েক দফায় কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়ার পরও পৌর কর্তৃপক্ষের গাফিলতির কারণে প্রকল্পের কাজ সঠিকভাবে হয়নি।’
তিনি জানান, ‘বর্তমান সৌন্দর্যবর্ধন কাজ নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে কাজের মান নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। সরকারের অর্থ সঠিকভাবে ব্যবহার করা হলে খালের সৌন্দর্য ফিরিয়ে আনা সম্ভব এবং এতে শহরবাসীও উপকৃত হবে।’
তবে মানিকগঞ্জ পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী মোহাম্মদ জহিরুল ইসলাম বলেছেন, খালের শোভাবর্ধন প্রকল্পের দুটি স্থানে দেওয়া বাঁধ দ্রুত অপসারণ করা হবে। এতে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরবে।
তিনি জানান, প্রকল্পের মেয়াদ কয়েক দফা বাড়ানো হয়েছে। সর্বশেষ বাড়ানো মেয়াদও শেষ হয়েছে। প্রকল্পের প্রায় ৯৬ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে।




