কুয়াকাটার শহর রক্ষা বাঁধে ভাঙনের শঙ্কা

পর্যটননগরী কুয়াকাটার শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানে কংক্রিটের (সিসি) ব্লক সরে যাওয়া ও দেবে যাওয়ায় আশঙ্কা দেখা দিয়েছে ভাঙনের। কুয়াকাটা চৌরাস্তা থেকে লেম্বুর বন পর্যন্ত প্রায় পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় একাধিক স্থানে ব্লকের নিচ থেকে সরে গেছে বালি ও মাটি। এতে দুর্বল হয়ে পড়েছে বাঁধের সুরক্ষা ব্যবস্থা।
স্থানীয় বাসিন্দা, ব্যবসায়ী ও পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মধ্যে বাড়ছে উদ্বেগ। বর্ষা, জোয়ার কিংবা ঘূর্ণিঝড়ের সময় দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে বলে তাদের আশঙ্কা।
সরেজমিনে দেখা গেছে, কুয়াকাটা পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ডের ইসলামপুর দাখিল মাদ্রাসাসংলগ্ন সানসেট পয়েন্ট এবং ১ নম্বর ওয়ার্ডের আশিঘরসংলগ্ন অর্কা পল্লি এলাকায় সিসি ব্লক সরে গেছে অন্তত দুটি স্থানে। কোথাও কোথাও ব্লক দেবে গিয়ে বড় ফাটল ও ফাঁকা অংশের সৃষ্টি হয়েছে। এতে শহর রক্ষা বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়ে তৈরি হয়েছে নতুন শঙ্কা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো আরও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে ওঠে ঝড়, জলোচ্ছ্বাস ও বর্ষা মৌসুমে। এরই মধ্যে ব্লকের নিচ থেকে বালি ও মাটি সরে যাওয়ায় ব্লক দেবে গেছে একাধিক স্থানে। দ্রুত সংস্কার না হলে যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।
কুয়াকাটা পৌরসভার ১ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা জেলে মোহাম্মদ হানিফ বলেছেন, ‘আমরা খুবই চিন্তায় আছি। যেকোনো সময় বড় ধরনের দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই জরুরি ভিত্তিতে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। গত বছর একটি স্থানে ব্লক সরে গিয়েছিল। এ বছর নতুন করে পাশাপাশি আরও দুটি বড় স্থানে একই সমস্যা দেখা দিয়েছে।’
পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তারা জানায়, ২০১০ সালের দিকে জিও ব্যাগে বালি ভরে কুয়াকাটা শহর রক্ষা বাঁধ নির্মাণের প্রাথমিক কাজ শুরু হয়। পরে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে পাউবোর তত্ত্বাবধানে কোস্টাল এমব্যাংকমেন্ট ইমপ্রুভমেন্ট প্রজেক্ট (সিইআইপি-১) প্রকল্পের আওতায় ২০১৭ থেকে ২০২৩ সালের মধ্যে বাঁধটি পুনর্নির্মাণ করা হয়।
পোল্ডার-৪৮-এর আওতায় বাস্তবায়িত এ প্রকল্পে প্রায় ৪৩ কিলোমিটার বাঁধ-কাম-সড়ক, স্লোপ প্রটেকশন এবং আধুনিক প্রযুক্তির একাধিক স্লুইস গেট নির্মাণ করা হয়। শতকোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত প্রকল্পটির কাজ সম্পন্ন করে আন্তর্জাতিক ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সিকো।
উপকূলীয় জনগণকে জলোচ্ছ্বাস, ঘূর্ণিঝড় ও নদীভাঙন থেকে সুরক্ষা দেওয়া এবং পর্যটননগরী কুয়াকাটার নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই ছিল প্রকল্পটির মূল উদ্দেশ্য। তবে নির্মাণকাজ শেষ হওয়ার কয়েক বছরের মধ্যে বিভিন্ন স্থানে সিসি ব্লক সরে যাওয়া ও বাঁধের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ায় নির্মাণমান এবং রক্ষণাবেক্ষণ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সচেতন মহল।
তাদের দাবি, দ্রুত কারিগরি তদন্ত করে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো টেকসইভাবে সংস্কার করা না হলে আসন্ন বর্ষা মৌসুমে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হতে পারে।
কুয়াকাটা ইসলামপুর দাখিল মাদ্রাসার সুপার সৈয়দ মো. ফারুক বলেছেন, অতীতে সমুদ্রের ভাঙনে বিলীন হয়ে গেছে বাঁধের বাইরের অন্তত ১০টি স্থান। এখন বাঁধের ভেতরের স্কুল, মাদ্রাসা, বসতবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানও ঝুঁকির মুখে। তাই দ্রুত কার্যকর সংস্কারকাজ শুরু করা জরুরি।
কুয়াকাটা হোটেল-মোটেল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের অর্থ সম্পাদক রাসেল খান আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, শহর রক্ষা বাঁধের ভেতরে শত শত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, হোটেল-মোটেল, বসতবাড়িসহ রয়েছে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা। বর্ষা ও বৈরী আবহাওয়ার আগে ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলো টেকসইভাবে সংস্কার করা না হলে রয়েছে বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতির আশঙ্কা।
কলাপাড়া পানি উন্নয়ন বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. শাহ আলম জানিয়েছেন, কুয়াকাটা সৈকতের ১১ দশমিক ২ কিলোমিটার এলাকায় দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের লক্ষ্যে প্রায় ৭৫৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্প ২০২৪ সালে প্রস্তাব করা হয়েছে। এটি পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। পাশাপাশি সৈকত রক্ষায় প্রস্তুত করা হচ্ছে বিকল্প আরেকটি প্রস্তাবও। শহর রক্ষা বাঁধের ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোর বিষয়টি জানানো হয়েছে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে। দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা চলছে।
কলাপাড়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইয়াসীন সাদেক সময়কে জানিয়েছেন, শহর রক্ষা বাঁধের বিভিন্ন স্থানে সিসি ব্লক সরে যাওয়ার বিষয়টি নজরে এসেছে প্রশাসনের। পানি উন্নয়ন বোর্ডসহ সংশ্লিষ্ট দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।





