লাইলির জীবনসংগ্রাম
যার ঘর নেই, আছে শুধু গান

ছবি: আগামীর সময়
ফরিদপুর শহরের অলিগলি, হাট-বাজার, রেলস্টেশন কিংবা নদীর ঘাটে খালি পায়ে হেঁটে বেড়ানো এক নারীর সঙ্গে হয়তো অনেকেরই দেখা হয়েছে। জীর্ণ শাড়ি, কাঁধে ছোট্ট একটি ব্যাগ, এলোমেলো চুল আর উদাস চোখ। তাকে দেখে কেউ ভাবেন ভবঘুরে, কেউ বা মানসিক ভারসাম্যহীন। কিন্তু সেই নারী যখন গান ধরেন, তখন মুহূর্তেই বদলে যায় দৃশ্যপট। তার কণ্ঠের মায়ায় থমকে দাঁড়ায় মানুষ, স্তব্ধ হয়ে শোনে গান।
তিনি ফরিদপুরের পরিচিত মুখ ‘লাইলি খালা’। বাউল দর্শন আর সংগীতকে সঙ্গী করে জীবনের অধিকাংশ সময় কাটিয়ে দেওয়া এই নারীর আজ নেই নিজের কোনো ঘর, নেই স্থায়ী ঠিকানা। আছে শুধু গান, আর মানুষের ভালোবাসা।
লাইলি খালার জীবনটা সবসময় এমন ছিল না। ভালোবেসে ছোট বয়সে বিয়ে করেছিলেন। ধর্মান্তরিত হয়ে সংসারও গড়েছিলেন। স্বামী ছিলেন মাংস ব্যবসায়ী। সংসারে এসেছিল দুই ছেলে ও এক মেয়ে। কিন্তু সুখ বেশিদিন টেকেনি। একসময় স্বামী অন্যত্র বিয়ে করে চলে যান। ভেঙে যায় সংসার, বদলে যায় জীবন।
সেই ভাঙনের পর থেকেই যেন পথই হয়ে ওঠে তার ঠিকানা। মানসিক আঘাত, একাকীত্ব আর বঞ্চনাকে সঙ্গী করে তিনি ঘুরে বেড়াতে শুরু করেন মেলা, জলসা আর সাংস্কৃতিক আয়োজনের পর আয়োজন। যেখানে গান, সেখানেই তার উপস্থিতি। মাইক্রোফোন হাতে পেলেই গেয়ে ওঠেন। আর তার দরদভরা কণ্ঠে মুগ্ধ হয়ে যায় শ্রোতারা।
ফরিদপুরের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে তিনি দীর্ঘদিনের পরিচিত মুখ। শিল্পকলা একাডেমির আঙিনায় তাকে প্রায়ই দেখা যায়। কখনো চুপচাপ বসে অন্যদের গান শুনছেন, আবার কখনো নিজেই গেয়ে উঠছেন। নজরুলসংগীত, বাউল গান, নূরজাহান, লতা মঙ্গেশকর কিংবা মেহেদী হাসানের গানও তিনি এমন আবেগ দিয়ে পরিবেশন করেন, যা শুনলে বিস্মিত হতে হয়।
তবে সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম তাকে নতুনভাবে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে সারা দেশের মানুষের কাছে।
গত ২৫ মে বিকেলে ফরিদপুর সাহিত্য পরিষদের উদ্যোগে ঐতিহাসিক ময়েজ মঞ্জিলে আয়োজিত নজরুল জয়ন্তীর অনুষ্ঠানে গান পরিবেশন করেন লাইলি খালা। জীর্ণ পোশাকে, কোনো আড়ম্বর ছাড়াই তিনি গেয়ে ওঠেন কাজী নজরুল ইসলামের বিখ্যাত গান, ‘নয়নভরা জল গো তোমার…’।
ছিল না কোনো বাদ্যযন্ত্র, ছিল না কোনো জাঁকজমকপূর্ণ মঞ্চসজ্জা। কিন্তু ছিল অসাধারণ আবেগমাখা কণ্ঠ। সেই গান শুনে মুগ্ধ হন উপস্থিত অতিথি, সংস্কৃতিকর্মী ও দর্শকরা। পরে অনুষ্ঠানস্থলে ধারণ করা ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে রাতারাতি ভাইরাল হয়ে যান তিনি।
ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর দেশের নানা প্রান্ত থেকে মানুষ তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ হন। কেউ লিখেছেন, এমন কণ্ঠ অবহেলায় হারিয়ে যেতে বসেছে। কেউ বলেছেন, শিল্প কখনো পোশাক বা পরিচয়ে আটকে থাকে না।
ভাইরাল হওয়ার পরও লাইলি খালার জীবনযাত্রায় তেমন কোনো পরিবর্তন আসেনি। এখনও তার চাওয়া খুবই সামান্য। একটি ছোট ঘর, একটু জমি আর দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা।
লাইলি খালা নিজেই বলেছেন, ‘আমি মানুষ দেখি। দুনিয়ায় কত রকমের মানুষ। কারও সঙ্গে কারও মিল নাই। মানুষ দেখতে আমার খুব ভাল্লাগে।’
তার ভাষ্য, এখন আমার একটা ঘর দরকার, একটু জমি দরকার। আহারের বন্দোবস্ত না হলে জীবন থমকে যাবে। আমি বাঁচতে চাই, গান গেয়ে মানুষকে জাগাতে চাই।
স্থানীয়দের কাছে তাকে ঘিরে নানা গল্প প্রচলিত রয়েছে। অনেকে বলেছেন, মাঝেমধ্যে তিনি হঠাৎ করেই কয়েক দিনের জন্য উধাও হয়ে যান। পরে আবার ফিরে আসেন। কেউ কেউ দাবি করেন, তিনি নাকি পাসপোর্ট-ভিসা ছাড়াই বহুবার হেঁটে আজমীর শরীফ পর্যন্ত গিয়েছেন। যদিও এসব তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।
চলতি বছরের ২ এপ্রিল ফরিদপুর হেরিটেজ স্কুলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে গান গেয়েও প্রশংসা কুড়িয়েছিলেন তিনি। ওই অনুষ্ঠানে বিভিন্ন পর্যায়ের বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন। সেদিনও তার কণ্ঠের আবেগ শ্রোতাদের মুগ্ধ করেছিল।
যুবদলের কেন্দ্রীয় কমিটির সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট মাহবুবুল হাসান ভূঁইয়া পিঙ্কু বলেছেন, ‘ছোটবেলা থেকেই আমরা তাকে চিনি। তার কণ্ঠ আমাদের জন্য সম্পদ। আমরা চাই তিনি ভালো থাকুন, মানুষ আরও তার গান শুনুক।’
ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক মো. মাজহারুল ইসলাম জানিয়েছেন, জেলা প্রশাসন তার খোঁজখবর রাখছে। তার জন্য প্রয়োজনীয় সহায়তা নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
সংস্কৃতিকর্মীদের মতে, লাইলি খালার গল্প শুধু একজন শিল্পীর গল্প নয়; এটি সমাজের অগোচরে পড়ে থাকা অসংখ্য প্রতিভাবান মানুষের গল্প। যারা সুযোগের অভাবে আলোয় আসতে পারেন না, কিন্তু প্রতিভার জোরে মানুষের হৃদয়ে জায়গা করে নেন।
আজও ফরিদপুর শহরের পথে পথে হাঁটেন লাইলি খালা। তার নেই কোনো স্থায়ী ঠিকানা, নেই সাজানো সংসার। কিন্তু আছে একটি অসাধারণ কণ্ঠ, আছে মানুষের অগাধ ভালোবাসা। আর সেই ভালোবাসা নিয়েই তিনি গেয়ে চলেছেন জীবনের গান।
হয়তো এ কারণেই লাইলি খালার জীবনকে এক বাক্যে বলা যায়, যার ঘর নেই, আছে শুধু গান।




