বন উজাড়ের হুমকিতে নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যান

ছবি: আগামীর সময়
নোয়াখালীর হাতিয়ার নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যানে অব্যাহতভাবে বনভূমি উজাড় ও দখলের উঠেছে অভিযোগ। স্থানীয়দের দাবি, বন বিভাগের দায়িত্বহীনতা এবং প্রভাবশালী চক্রের দৌরাত্ম্যে দ্রুত ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে সংরক্ষিত বনাঞ্চল। এতে দেশের গুরুত্বপূর্ণ এই জাতীয় উদ্যান পড়েছে পরিবেশগত ঝুঁকির মুখে।
সম্প্রতি সরেজমিনে দেখা যায়, জাহাজমারা রেঞ্জের চর ওসমান বিটের ছোঁয়াখালি বন এলাকায় গাছ কাটা হচ্ছে ব্যাপক হারে। নিম্নমাধ্যমিক হাইস্কুলের উত্তর পাশ ও বাধারখালের আগা এলাকায় বনভূমি পরিষ্কার করে করা হয়েছে চাষাবাদ, নির্মাণ করা হয়েছে ঘরবাড়ি।
এ ছাড়া পাওয়া গেছে ডুবাই খালের বস্তাখালি, গামছাখালি, হরিণ বাজার, চৌধুরী খালের আগা ও ইসলামপুরের মোড়খালি এলাকায় ধাপে ধাপে বনভূমি দখল ও বিক্রির অভিযোগ। স্থানীয়দের ভাষ্য, প্রভাবশালী চক্র বিভিন্ন দাগে বিক্রি করছে এসব জমি।
ক্ষতিগ্রস্ত এলাকার অন্তত ১৫ জন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের পর এবং ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর থেকে উজাড় করা হয়েছে শত শত হেক্টর বনভূমি। দিন-রাত গাছ কেটে জমি পরিষ্কার করছে দখলকারীরা। তাদের কাছে রয়েছে গাছ কাটার যন্ত্রও।
স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের কিছু অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীর যোগসাজশে চলছে এসব কর্মকাণ্ড। প্রকৃত দখলদারদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিয়ে মাঝে মধ্যে করা হয় দায়সারা মামলা। প্রায়ই কর্মস্থলের বাইরে থাকতেন বন রক্ষক জাহিদ প্রামানিক এবং দায়িত্ব পালনে ছিলেন উদাসীন— বলেও রয়েছে অভিযোগ।
নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়নের সদস্য ও এনসিপি নেতা ছালাউদ্দিন জানান, বর্তমান ক্ষমতাধরদের একটি অংশ বন কাটার সঙ্গে জড়িত। কৃষকদের কাছ থেকে ফসলের ভাগ নেয়, ভূমি ও নদী দখল করে এবং ভয়ভীতি দেখিয়ে চাঁদাবাজি চালায় তারা। তার ভাষ্য, রেঞ্জ কর্মকর্তাদের অবহেলা ও অপরাধীদের সঙ্গে সখ্যতার কারণেই বাড়ছে বন ধ্বংস। তবে নিজে বা তার অনুসারীরা এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত নন বলে দাবি করেন তিনি।
নিঝুম দ্বীপ ইউনিয়ন যুবদলের সভাপতি আশরাফ বলেন, থানা রোডের পাশে খানাখন্দ ভরাটের সময় কাটা হয়েছে কিছু গাছ। তবে বন রক্ষকদের গাফিলতি নেই।
বিএনপি নেতা শাহেদ মেম্বার ও ইব্রাহিম পার্টির বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও ফোন রিসিভ করেননি কেউ।
এর আগে চর ইউনুসের আমতলী প্রজেক্ট ও রাস্তার চর এলাকায় মাইলের পর মাইল বনভূমি উজাড়ের ঘটনা ঘটে। স্থানীয় ও বন বিভাগ সূত্রে জানা যায়, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে জাতীয় নির্বাচন পর্যন্ত এ ধ্বংসযজ্ঞ ব্যাপক আকার নেয়। এতে আমতলী বাজার কমিটির দুজন সদস্যসহ জাহাজমারা ইউনিয়নের ৩ ও ৯ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তত ৫৫ থেকে ৬০ জন নারী-পুরুষ জড়িত ছিলেন। তবে এখন পর্যন্ত তাদের বিরুদ্ধে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
জাহাজমারা রেঞ্জ কর্মকর্তা ও চর ওসমান বিট কর্মকর্তা মো. জাহিদ প্রামানিকের দাবি, এত বড় এলাকায় সবদিকে নজর রাখা সম্ভব হয় না। যারা নতুন করে গাছ কাটছে, তাদের বিষয়ে অনুসন্ধান করে পরে জানানো হবে। তবে দায়িত্বে গাফিলতির অভিযোগ অস্বীকার করেন তিনি।
উপকূলীয় অঞ্চল বন সংরক্ষক মোল্যা রেজাউল করিম জানান, সংরক্ষিত বনের গাছ কাটার সঙ্গে জড়িতদের বিরুদ্ধে নেওয়া হবে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা। পাশাপাশি খতিয়ে দেখা হবে দায়িত্বে গাফিলতি বা অনিয়মের অভিযোগও।
বন বিভাগ বলছে, জাহাজমারা রেঞ্জের চারটি বিটের আওতায় ১৩টি চরে রয়েছে প্রায় ২১ হাজার ৪৪ একর সংরক্ষিত বনভূমি। এছাড়া ১১টি চরে ৪০ হাজার ৩৯০ একর এলাকা নিয়ে গঠিত নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যান। ২০০১ সালের ৮ এপ্রিল সরকার এলাকাটিকে ঘোষণা করে জাতীয় উদ্যান।
হাইকোর্টের নির্দেশনার পর ২০১৮ সালের ৩০ এপ্রিল নিঝুম দ্বীপ জাতীয় উদ্যানের রক্ষণাবেক্ষণ ও মূল্যায়নের জন্য জেলা প্রশাসককে সভাপতি করে গঠন করা হয় একটি টাস্কফোর্স। তবে স্থানীয়দের অভিযোগ, এ কমিটির কার্যক্রমে নেই দৃশ্যমান অগ্রগতি।
অভিযোগ রয়েছে, সরকারি গেজেটভুক্ত বিভিন্ন চর নতুন নামে চিহ্নিত করে ভূমি অফিস বন্দোবস্ত দেওয়ায় তৈরি হয়েছে বনভূমি দখলের সুযোগ। রয়েছে চর ইউনুস এলাকায় অসংখ্য খতিয়ান খুলে বন্দোবস্ত দেওয়ার অভিযোগও।
টাস্কফোর্স কমিটির সর্বশেষ সভা হয় ২০২৫ সালের ২৭ এপ্রিল। সভায় দখলদারদের তালিকা প্রস্তুত, দখলকৃত ভূমির পরিমাণ নির্ধারণ এবং নতুন বন্দোবস্ত বন্ধ রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। তবে সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব সিদ্ধান্ত বাস্তবে কার্যকর হয়নি।






