গলার কাঁটা দুই কোটির বুলডোজার

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
দুটি বুলডোজার মেরামতে গত অর্থবছরে ২২ লাখ টাকা ব্যয় করে খুলনা সিটি করপোরেশন (খুসিক)। মোটা অঙ্কের এ অর্থ ব্যয়ের পরও সচল হয়নি গাড়ি দুটি। এখন অকেজো সেই বুলডোজার দুটি ফের মেরামত করা হচ্ছে। করপোরেশন বলছে, গাড়ি দুটি আবার মেরামতে খরচ ধরা হয়েছে আরও অন্তত ১২ লাখ টাকা। তবে এবারও চার মাস আগে গাড়ির যন্ত্রাংশ খুলে মেরামতের কাজ শুরু হলেও এখনো চালু হয়নি গাড়ি। আসলে গাড়ি দুটি মেরামতের নামে দুর্নীতি ও অর্থ লুটপাট হচ্ছে বলে জানিয়েছেন খুসিকের নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কর্মকর্তা।
ঘটনা সবিস্তারে জানতে সরেজমিনে দেখা যায়, সিটি করপোরেশনের ৩১টি ওয়ার্ডে প্রতিদিন ৫০০ টন গৃহস্থালির বর্জ্য উৎপাদন হয়। বাড়ি বাড়ি বা নির্ধারিত স্থান থেকে এসব বর্জ্য সংগ্রহ করে প্রথমে ১২টি সেকেন্ডারি ট্রান্সফার স্টেশনে (এসটিএস) জমা করা হয়। এসটিএস থেকে ময়লা ট্রাকে করে খুলনা-সাতক্ষীরা মহাসড়কসংলগ্ন রাজবাধে স্থায়ী ভাগাড়ে নিয়ে ফেলা হয়। সেখানে ফেলা বর্জ্য বুলডোজার দিয়ে নির্দিষ্ট স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়।
করপোরেশন জানিয়েছে, একসময় রাজবাধ ভাগাড়ে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কাজে চারটি বুলডোজার ব্যবহৃত হতো। এর মধ্যে ২০২১ সালে এক নম্বর বুলডোজার নিলামে বিক্রি করা হয়। দ্বিতীয় বুলডোজারটি ময়লার ভাগাড়ে দীর্ঘকাল পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তৃতীয় নম্বর বুলডোজার ২০১৪ সালে এবং চতুর্থ নম্বরটি ২০১৮ সালে কেনা হয়। এরপর থেকে তৃতীয় ও চতুর্থ বুলডোজার দিয়েই কাজ চলছিল। তবে যান দুটি দেড় বছর ধরে অচল হয়ে পড়েছে। ফলে দীর্ঘদিন ধরে বর্জ্য সরানো সম্ভব হচ্ছে না।
প্রতিষ্ঠানটির যান্ত্রিক শাখা থেকে জানা গেছে, তৃতীয় ও চতুর্থ বুলডোজার মেরামতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ২২ লাখ ১০ হাজার ৭৩২ টাকা ব্যয় হয়। এর মধ্যে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে তৃতীয় নম্বর বুলডোজার মেরামতে ব্যয় হয়েছে ১০ লাখ ৫৪ হাজার ৮৩৯ টাকা। চলতি অর্থবছরে আরও ৫ হাজার ৪০০ টাকা খরচ হয়েছে। এ ছাড়া চতুর্থ নম্বর বুলডোজার মেরামতে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে ব্যয় হয়েছে ১১ লাখ ৫০ হাজার ৪৯৩ টাকা।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কনজারভেন্সি বিভাগ ও ময়লার ভাগাড়ে কর্মরত কয়েকজন কর্মকর্তা-কর্মচারী অভিযোগ করে বলেছেন, মেরামতের নামে বিপুল ব্যয় দেখানো হলেও বাস্তবে গাড়ি দুটি সঠিকভাবে মেরামত হয়নি। যার কারণে দেড় বছর ধরে বুলডোজার দুটি ব্যবহারের অনুপযোগী। ফের গত চার মাস আগে দুটির মধ্যে একটি গাড়ির যন্ত্রাংশ খুলে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু পরে যন্ত্রাংশ লাগানো হয়নি, গাড়িও চালু হয়নি।
তাদের ভাষ্য, বুলডোজারের অভাবে বর্তমানে বর্জ্য দূরে সরানো যাচ্ছে না। লং-বুম বা হুইল ডোজার গাড়ি দিয়ে বর্জ্য ভাগাড়ের সড়কের পাশে পাহাড়ের মতো উঁচু স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। এতে এখন জ্বালানি খরচ হচ্ছে, ওই বর্জ্য ফের সরাতে আবারও জ্বালানি ব্যয় হবে। এ ছাড়া এক কাজে কয়েক ধাপে যন্ত্রের ব্যবহার হচ্ছে।
এদিকে, বর্জ্য ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বর্পূণ খাতে অর্থ ব্যয় হলেও সুফল না পাওয়া উদ্বেগজনক দাবি করেন সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনার সম্পাদক ও পরিবেশবাদী নেতা কুদরত-ই-খুদা।
তিনি বলেছেন, মূলত মেরামতের নামে দুর্নীতি ও অর্থ লুটপাট হচ্ছে। তাই গাড়ি দুটির পুরো মেরামত ব্যয় এবং কাজের মান যাচাইয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। তদন্তে অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ মিললে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। এ ছাড়া বর্জ্যের সঙ্গে স্বাস্থ্য ও পরিবেশ জড়িত। তাই বিষয়টি সমাধানে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি।
বিপুল অর্থ ব্যয়ের পর বুলডোজার দুটি কেন অকেজো— এমন প্রশ্নের জবাবে করপোরেশনের যান্ত্রিক শাখার উপসহকারী প্রকৌশলী সেলিমুল আজাদ জানিয়েছেন, তিনি ২০২৪-২৫ অর্থবছরে যান্ত্রিক শাখায় ছিলেন না। তবে গাড়ি দুটির কেনা মূল্য কমপক্ষে ২ কোটি টাকা। বর্তমানে বুলডোজার দুটির মধ্যে একটির ইঞ্জিন এবং অন্যটির ক্র্যাংক শ্যাপ্ট, রিং-পিস্টনে কাজ করতে হবে। দুটি গাড়ি এখন চালু করতে কমপক্ষে ১২ লাখ টাকা খরচ হবে। কারণ ঢাকা থেকে মালামাল ক্রয় ও করপোরেশনে দক্ষ মিস্ত্রি না থাকায় অন্য মিস্ত্রি দিয়ে কাজ করাতে হচ্ছে।
তবে সার্বিক বিষয় নিয়ে সিটি করপোরেশনের প্রশাসক নজরুল ইসলাম মঞ্জু বলেছেন, ভাগাড়ের বাস্তব অবস্থা পরিদর্শন করেছি। বর্জ্যর ক্ষেত্রে দ্রুত ম্যানেজমেন্টে যাওয়া হবে। এ ছাড়া বুলডোজার নিয়ে করণীয় বিষয়ে প্রকৌশল বিভাগ কাজ করছে। তবে মেরামতের বিষয়টি তার কাছে আসেনি। তবুও বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।




