কোথায় যাচ্ছে যশোর জেনারেল হাসপাতালের বিনামূল্যের ওষুধ

যশোর ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল। ছবি : সংগৃহীত
যশোর ২৫০ শয্যা জেনারেল হাসপাতালের বহির্বিভাগ। কাউন্টারের সামনে অসংখ্য রোগী ও তাদের স্বজন। ভিড় ঠেলে ঘামে ভেজা মুখ নিয়ে বেরিয়ে এলেন ৭০ বছর বয়সী আবুল হোসেন। থাকেন সদরেই। ডাক্তার দেখাতে আসেন সকাল-সকাল। বহির্বিভাগের ০৮৫১৪৩ নম্বর টিকিট কেটে ১২৩ নম্বর রুমে ডাক্তারও দেখান। চারটি ওষুধ লিখে দিয়েছেন ডাক্তার। কিন্তু হাসপাতালের সরকারি ফার্মেসি থেকে তাকে দেওয়া হয়েছে মাত্র এক পাতা ওষুধ। অন্যগুলো কিনে নিতে বলা হয়েছে বাইরে থেকে।
আবুল হোসেনের কণ্ঠে অসহায়ত্ব, ‘আমরা গরিব মানুষ, আমাদের কথা কে শোনে? আমরা গেলে ফার্মেসি থেকে ওষুধ দিতে চায় না। কিন্তু হাসপাতালের নার্স বা স্টাফরা এলে তাদের সব ওষুধ দেওয়া হয়।’ পাশেই এক নার্সকে দেখিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন, ‘ওই নার্স আমার পরে এসেও অনেক ওষুধ নিয়ে গেলেন।’
একই রকম ক্ষোভ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আসলাম হোসেনের। প্রেসক্রিপশনে পাঁচটি ওষুধ লেখা থাকলেও হাসপাতাল থেকে মিলেছে শুধু প্যারাসিটামল। ‘সরকারি হাসপাতালে নার্স, স্টাফ আর তাদের স্বজনদের কারণেই আমাদের মতো সাধারণ মানুষ ওষুধ পাচ্ছে না’— বললেন আসলাম হোসেন।
শুধু আবুল হোসেন বা আসলাম নন, যশোর ২৫০ শয্যা হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা শত শত সাধারণ রোগীর প্রতিদিনের চিত্র এটি। বিনামূল্যে ওষুধ পাওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে প্রেসক্রিপশন নিয়েই খালি হাতে ফিরতে হচ্ছে তাদের।
হাসপাতালের তথ্য, ২০২৩-২৪ অর্থবছরে এসেনসিয়াল ড্রাগস্ কোম্পানি লিমিটেডের (ইডিসিএল) মাধ্যমে কেনা হয়েছিল ৫ কোটি ৬৬ লাখ ৮৯ হাজার ৯১২ টাকার এবং স্থানীয় দরপত্রের মাধ্যমে ১ কোটি ৮৮ লাখ ৯৭ হাজার ৬৬০ টাকার ওষুধ। ২০২৪-২৫ অর্থবছরে বরাদ্দ আরও বাড়িয়ে ৬ কোটি ৩৩ লাখ ৭৫ হাজার এবং স্থানীয়ভাবে ২ কোটি ১১ লাখ ২৫ হাজার টাকার ওষুধ কেনা হয়। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে ইডিসিএল কিনেছে ৬ কোটি টাকার ওষুধ। এ ছাড়া স্থানীয়ভাবে ২ কোটি টাকার ওষুধ কেনার কথা রয়েছে।
হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ জানায়, সরকারিভাবে সরবরাহ করা হয় ১১২ ধরনের ওষুধ। এর মধ্যে ইডিসিএল থেকে আসে ৮২ ধরনের ওষুধ। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ও স্থানীয় অর্থে টেন্ডারের মাধ্যমে অবশিষ্ট ৩০ ধরনের ওষুধ কেনা হয়। সব মিলিয়ে হাসপাতালটিতে মাত্র ২৩ ধরনের ওষুধ সরবরাহ করা হচ্ছে।
হাসপাতালে প্রতিদিন বহির্বিভাগ থেকে চিকিৎসাসেবা নেয় আড়াই থেকে তিন হাজার রোগী। এক মাস ধরে এখানে চলছে তীব্র ওষুধ সংকট। স্টোরে সব ওষুধ নেই, সরবরাহ নেই সরকারি ফার্মেসিতেও। দ্রুত ওষুধ ফুরিয়ে যাওয়ার মূলে রয়েছে, বরাদ্দের সিংহভাগ চলে যায় ‘ভেতরের’ মানুষের কাছে— অভিযোগ ভুক্তভোগীদের।
অনিয়ন্ত্রিত ওষুধ তুলছেন হাসপাতালের স্টাফ, ইন্টার্ন চিকিৎসক ও নার্সিং স্টুডেন্টরা। হাসপাতালে বর্তমানে ইন্টার্ন চিকিৎসক ও স্টুডেন্ট নার্সের সংখ্যা চার শতাধিক। এ ছাড়া চিকিৎসক, সরকারি নার্স, কর্মচারী ও স্বেচ্ছাসেবক মিলিয়ে কর্মরত আরও ছয় শতাধিক কর্মী। এই এক হাজার কর্মকর্তা-কর্মচারীর বেশিরভাগের নজর থাকে সরকারি ওষুধের দিকে। তারা কোনো স্লিপ বা অনুমোদন ছাড়াই নিজের ও স্বজনদের জন্য প্রয়োজনের বেশি ওষুধ তুলে নিচ্ছেন। ফলে ওষুধ মিলছে না সাধারণ রোগীদের।
এদিকে সরকারি ওষুধের গুণগত মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন খোদ হাসপাতালের তথ্য প্রদানকারী কর্মকর্তা ডা. হাবিবা সিদ্দিকা ফোয়ারা। নার্স ও স্টাফদের অতিরিক্ত ওষুধ নেওয়ার বিষয়টি অস্বীকার করে উল্টো প্রশ্ন করেন, ‘হাসপাতালের ওষুধের মান নিয়েই তো সংশয় রয়েছে, এই ওষুধ কে নেবে?’
ওষুধের মান নেই— এমন কথা মানতে নারাজ হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. হুসাইন শাফায়াত। তবে ওষুধ সংকটের কথা তুলে ধরে তিনি বললেন, ‘প্রতিদিন বহির্বিভাগে আড়াই থেকে তিন হাজার রোগী আসেন। এ বছরের বাজেটের ওষুধ শেষ হয়ে গেছে। নতুন বাজেট না এলে এই সংকট কাটবে না।’ নার্স ও স্টাফদের ওষুধ নেওয়ার বিষয়ে তার স্পষ্ট বক্তব্য, ‘প্রয়োজন ছাড়া নার্স বা স্টাফরা ওষুধ নিলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।






