২০ টাকা দিয়ে দেখতে হয় সূর্যপুরী আমগাছ

ছবি: আগামীর সময়
পিচঢালা সড়কের দুই পাশে সারি সারি গাছ। কোথাও ঘন ছায়ার শীতলতা, কোথাও বিস্তীর্ণ ফসলের মাঠের সবুজ বিস্তার। প্রকৃতির বুক চিরে আঁকাবাঁকা পথ এগিয়ে গেছে দূর দিগন্তের দিকে। সেই সবুজের রাজ্যে হঠাৎ চোখ আটকে যায় এক বিশাল বৃক্ষের দিকে। দূর থেকে মনে হয়, সবুজ সমুদ্রের মাঝখানে দাঁড়িয়ে থাকা কোনো প্রাচীন প্রহরী। কাছে যেতেই বোঝা যায়, এটি কোনো সাধারণ গাছ নয়, এটি ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীর হরিণমারী মন্ডুমালা গ্রামের দুই শতাব্দীর ইতিহাস বহনকারী সূর্যপুরী আমগাছ।
সময়ের স্রোতে কত মানুষ এসেছে, কত মানুষ চলে গেছে, বদলে গেছে চারপাশের প্রকৃতি ও জনপদ। কিন্তু নীরবে দাঁড়িয়ে থাকা এই বৃক্ষ আজও আগের মতোই ছড়িয়ে দিচ্ছে ছায়া, সৌন্দর্য আর বিস্ময়। এটি শুধু একটি আমগাছ নয়, বরং প্রকৃতি, ঐতিহ্য ও মানুষের স্মৃতির এক অনন্য মিলনস্থল।
অবাক করার মতো বিষয় হলো, এই আমগাছটি দেখতে দর্শনার্থীদের টিকিট কেটে প্রবেশ করতে হয়। জনপ্রতি ২০ টাকা দিয়ে টিকিট সংগ্রহ করে মানুষ প্রবেশ করছেন এক অনন্য প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের ভেতরে। প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে যেমন দর্শনার্থীরা আসছেন, তেমনি বিদেশ থেকেও অনেকেই ছুটে আসছেন এই বিশাল বৃক্ষটি দেখতে।
স্থানীয়দের দাবি, গাছটির বয়স আনুমানিক ২০০ থেকে ২২০ বছর। দীর্ঘ এই সময়ে অসংখ্য ঝড়-ঝঞ্ঝা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলা করেও এটি আজও সুস্থ-সবল অবস্থায় ফল দিয়ে যাচ্ছে। সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকা এই গাছ যেন প্রকৃতির এক বিস্ময়।
প্রায় দুই বিঘা জমি জুড়ে বিস্তৃত এই গাছটির উচ্চতা প্রায় ৯০ ফুট। দূর থেকে দেখলে মনে হয়, বিশাল এক সবুজ ছাতা পুরো এলাকা ঢেকে রেখেছে। এর শাখা-প্রশাখা এতটাই বিস্তৃত যে নিচে দাঁড়িয়ে পুরো গাছকে এক ফ্রেমে ধারণ করা প্রায় অসম্ভব।
গাছটির প্রায় ১৯টি প্রধান মোটা ডাল রয়েছে। প্রতিটি ডালের দৈর্ঘ্য প্রায় ৪০ থেকে ৫০ ফুট। ডালগুলো মাটির দিকে নেমে আবার ওপরের দিকে উঠে গেছে। প্রকৃতির নিজস্ব বিন্যাসে তৈরি এই গঠন যেন এক জীবন্ত স্থাপত্যশিল্প।
গাছের ছায়ায় দাঁড়ালেই অনুভূত হয় এক অন্যরকম প্রশান্তি। পাতার ফাঁক গলে সূর্যের আলো মাটিতে সৃষ্টি করে অপূর্ব আলোর নকশা। বাতাসে পাতার মৃদু দোলায় যেন সময়ও কিছুক্ষণের জন্য থমকে দাঁড়ায়।
এই গাছের সূর্যপুরী আমের স্বাদ নিয়েও রয়েছে বিশেষ খ্যাতি। স্থানীয়দের ভাষ্য, এর ঘ্রাণ, রস এবং মিষ্টতা সাধারণ সূর্যপুরী আমের তুলনায় অনেক বেশি। ফলে এই আমের বাজারমূল্যও তুলনামূলক বেশি। প্রতি বছর গাছটি থেকে প্রায় ১০০ থেকে ২০০ মণ আম উৎপাদিত হয়। প্রতিটি আমের ওজন গড়ে ২০০ থেকে ২৫০ গ্রাম।
বর্তমানে গাছটি লিজ নিয়ে পরিচর্যা করছেন মো. সাদেকুল ইসলাম। তিনি জানিয়েছেন, ২০২৪ সালে তিন বছরের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার টাকায় গাছটি লিজ নিয়েছেন। প্রথম বছরেই প্রায় দেড় লাখ টাকার আম বিক্রি করেছেন। দ্বিতীয় বছর বিক্রি হয়েছে প্রায় এক লাখ টাকার আম। চলতি মৌসুমে তিনি আড়াই লাখ টাকার আম বিক্রির আশা করছেন।
তিনি বলেছেন, ‘আম বাজারে নিয়ে যেতে হয় না। ক্রেতারাই এখানে এসে গাছ থেকে আম কিনে নিয়ে যান।’
দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, গাছ সংরক্ষণ এবং পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখতে প্রত্যেকের কাছ থেকে ২০ টাকা করে প্রবেশমূল্য নেওয়া হয়। এই অর্থ দিয়ে গাছের চারপাশে বেড়া, বসার ব্যবস্থা এবং পরিচ্ছন্নতার কাজ পরিচালিত হচ্ছে।
স্থানীয়ভাবে মো. সাইদুর মোল্লা ও মো. নূর ইসলাম দীর্ঘদিন ধরে গাছটির দেখভাল করছেন। তাদের মতে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছাড়াও বিদেশি পর্যটকদের আগমনও এখন নিয়মিত। বিশাল এই আমগাছ দেখে অধিকাংশ দর্শনার্থী বিস্মিত হন। কারণ, একটি আমগাছ যে এত বড়, এত পুরনো এবং এখনো নিয়মিত ফল দেয়, তা অনেকের কাছেই অবিশ্বাস্য মনে হয়।
হবিগঞ্জের মাধবপুর থেকে আসা দর্শনার্থী মো. ফয়েজ উদ্দিন বলেছেন, ‘নিজ চোখে না দেখলে বিশ্বাস করা যায় না। এত বড় আর এত সুন্দর আকৃতির আমগাছ সত্যিই বিরল।’
দিনাজপুরের চিরিরবন্দর থেকে পরিবার নিয়ে আসা সাবরিনা বলেছেন, ‘জীবনে প্রথম এত বড় আমগাছ দেখলাম। বাস্তবে দেখে সত্যিই অভিভূত হয়েছি।’
স্থানীয়দের অনেকেই মনে করেন, এই গাছকে কেন্দ্র করে একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন কেন্দ্র গড়ে তোলা সম্ভব। শুধু একটি গাছ নয়, এর ইতিহাস, পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যকে ঘিরে একটি সমৃদ্ধ পর্যটন কেন্দ্র গড়ে উঠতে পারে।
বর্তমান মালিক দুই ভাই মো. সাইদুর মোল্লা ও মো. নূর ইসলামও সেই স্বপ্নই দেখছেন। এরই মধ্যে তারা গাছের চারপাশে বেড়া, তথ্যফলক এবং পিকনিক স্পট তৈরির উদ্যোগ নিয়েছেন। ভবিষ্যতে এটিকে একটি পরিচ্ছন্ন, আকর্ষণীয় ও পর্যটনবান্ধব স্থানে পরিণত করতে চান তারা।
গাছটির মালিক মো. নূর ইসলাম বলেছেন, ‘আমাদের দাদার দাদা প্রায় ২২০ বছর আগে এই গাছটি রোপণ করেছিলেন। এখন ২০ টাকার টিকিট কেটে মানুষ গাছটি দেখতে আসেন। এখান থেকে যে আয় হয়, তা দিয়েই আমাদের পরিবারের জীবিকা চলে। তবে আমরা চাই, এটি শুধু আয়ের উৎস নয়, জাতীয় পর্যায়ের একটি পর্যটন ঐতিহ্যে পরিণত হোক।’
বালিয়াডাঙ্গী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অঞ্জন কুমার দাস আগামীর সময়কে বলেছেন, এটি ব্যক্তি মালিকানাধীন একটি ঐতিহ্যবাহী গাছ। সরকারি উদ্যোগের কিছু সীমাবদ্ধতা থাকলেও দর্শনার্থীদের সুবিধার্থে পাশের খাসজমিতে একটি রেস্ট হাউজ নির্মাণ করা হয়েছে। ভবিষ্যতে গাছটির সংরক্ষণ ও উন্নয়নে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে।
তিনি আরও জানিয়েছেন, সূর্যপুরী আমকে ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে নিবন্ধনের কার্যক্রম চলমান রয়েছে। পাশাপাশি দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা বজায় রাখতে প্রশাসন সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছে।
প্রকৃতির সৃষ্টি অনেক সময় মানুষের কল্পনাকেও হার মানায়। বালিয়াডাঙ্গীর এই সূর্যপুরী আমগাছ তারই এক অনন্য উদাহরণ। দুই শতাব্দীর বেশি সময় ধরে দাঁড়িয়ে থাকা এই বৃক্ষ শুধু ফল দিচ্ছে না, সংরক্ষণ করে চলেছে একটি জনপদের স্মৃতি, মানুষের আবেগ এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের এক জীবন্ত দলিল। যথাযথ সংরক্ষণ ও পরিকল্পিত উদ্যোগ নেওয়া গেলে এই গাছ হয়ে উঠতে পারে উত্তরাঞ্চলের অন্যতম প্রধান পর্যটন আকর্ষণ। তখন এটি শুধু একটি বড় আমগাছ হিসেবে নয়, বাংলাদেশের প্রাকৃতিক ঐতিহ্যের এক গর্বিত প্রতীক হিসেবেই পরিচিত হবে।




