চিকিৎসক কম সেবা দেন স্বাস্থ্যকর্মী

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ঢাকার নবাবগঞ্জের প্রত্যন্ত মানুষের স্বাস্থ্যসেবার ভরসা ইউনিয়ন পর্যায়ের পরিবার পরিকল্পনা ও স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলো। কিন্তু জনবল ও ওষুধ সংকটে সে ভরসার জায়গাগুলোই এখন ধুঁকছে। এসব কেন্দ্রে ১৭০টি অনুমোদিত পদের মধ্যে ৮৩টিই শূন্য। কোথাও চিকিৎসক নেই, কোথাও ফার্মাসিস্ট বা পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা নেই। ফলে কেন্দ্র খোলা থাকলেও কাঙ্ক্ষিত সেবা মিলছে না। কমে গেছে রোগীর উপস্থিতিও। কোনো কোনো কেন্দ্র প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে একসময় বন্ধ হয়ে যেতে পারে এসব সেবাকেন্দ্র— এমন আশঙ্কা সংশ্লিষ্টদের।
উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কার্যালয়ের তথ্য বলছে, নবাবগঞ্জের ১৪টি ইউনিয়নের মধ্যে ১১টিতে রয়েছে স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কেন্দ্র। কিন্তু এসব কেন্দ্রে প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় মাঠকর্মীদের দিয়েই কোনোরকমে সেবা চালু রাখা হচ্ছে। উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারের ১১টি পদের ৯টি এবং ফার্মাসিস্টের ১১টির মধ্যে ১০টি পদ শূন্য। পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকার ১৪টি পদের ১০টি খালি। এ ছাড়া পরিবার পরিকল্পনা সহকারী, এমসিএস অফিস সহকারী, সহকারী নিরাপত্তাপ্রহরী ও আয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ পদেও জনবল সংকট রয়েছে।
বান্দুরা ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রের মাঠকর্মী রোশনারা বেগমের ভাষ্য, তাদের মূল দায়িত্ব মাঠপর্যায়ে। কিন্তু কেন্দ্রে জনবল না থাকায় ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে অন্তঃসত্ত্বা নারী ও অন্য রোগীদেরও সেবা দিতে কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করছেন।
একই কথা জানালেন মাঠকর্মী শুভ্রা রানী হালদার। তার ভাষায়, পাঁচজন মাঠকর্মী পালাক্রমে প্রতিদিন কেন্দ্রে দায়িত্ব পালন করেন। তবে অন্যান্য পদে জনবল না থাকায় তাদের পক্ষে সব ধরনের স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না।
জনবল সংকটের সঙ্গে যোগ হয়েছে ওষুধের ঘাটতি। মাঠকর্মী উম্মে কুলসুম বললেন, ‘চাহিদা অনুযায়ী ওষুধ না থাকায় সেবা দিতে সমস্যা হচ্ছে। এ কারণে আগের তুলনায় রোগীর সংখ্যাও কমেছে।’
সকাল ৯টা থেকে বেলা সাড়ে ৩টা পর্যন্ত স্বাস্থ্যকেন্দ্রে থাকেন বান্দুরা ইউনিয়ন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক লিংকন হাওলাদার। তবে ওষুধ ও জনবল সংকটের কারণে রোগীর উপস্থিতি কমেছে। তার ভাষ্য, আগে ওষুধ থাকলে প্রতিদিন গড়ে ২০-৩০ জনের বেশি সেবাগ্রহীতা আসতেন। এখন গড়ে চার-পাঁচজন আসেন। এভাবে চলতে থাকলে কেন্দ্রগুলোর কার্যক্রম একসময় বন্ধ হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
একই অবস্থা দেখা গেছে বক্সনগর ইউনিয়ন স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্রেও। সেখানে সেবা নিতে আসা রুমা বেগম বললেন, ‘ওষুধ না থাকায় শুধু রক্তচাপ ও ওজন মাপা হয়েছে। প্রাথমিক কিছু সেবা ছাড়া অন্য চিকিৎসা পাওয়া যায়নি।
কেন্দ্রটির আবাসিক পরিদর্শিকা আকলিমা আক্তার জানিয়েছেন, জন্মনিয়ন্ত্রণ সামগ্রী ও প্রয়োজনীয় ওষুধ নেই। ফলে সেবাগ্রহীতাদের চাহিদা অনুযায়ী সেবা দেওয়া যাচ্ছে না। কেন্দ্রে অন্তঃসত্ত্বা নারীদের পরামর্শ ও প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া হলেও রোগীর সংখ্যা কমছে। তার তথ্য অনুযায়ী, ওষুধ সরবরাহ স্বাভাবিক থাকলে প্রতিদিন গড়ে ৩০-৪০ জন রোগী আসতেন। এখন আসেন ৮-১০ জন।
জনবল সংকট সবচেয়ে প্রকট কৈলাইল মা ও শিশুকল্যাণ কেন্দ্রে। সেখানে মেডিকেল অফিসারের দুটি পদই শূন্য। পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকার চারটি এবং অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার অপারেটরের একটি পদও খালি।
শিকারীপাড়া, জয়কৃষ্ণপুর, নয়নশ্রী, বান্দুরা ও শোল্লা ইউনিয়নের কয়েকটি স্বাস্থ্যকেন্দ্র দীর্ঘদিন ধরে সীমিত কার্যক্রমে চলছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। কোথাও কোথাও কেন্দ্রগুলো প্রায় পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। জনবল না থাকায় এসব কেন্দ্রে রাতে মাদকসেবীদের আড্ডা ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের কথাও জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
জনবল সংকটে কার্যক্রমও সীমিত হওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেছেন নবাবগঞ্জ উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা কানিজ ফাতেমা। তিনি বলেছেন, ‘এসব স্বাস্থ্যকেন্দ্রে ১৭০টি পদের মধ্যে ৮৩টি শূন্য রয়েছে। এ কারণে বিভিন্ন এলাকার রোগীদের কাঙ্ক্ষিত স্বাস্থ্যসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। জনবল না থাকায় অধিকাংশ স্বাস্থ্যকেন্দ্রের কার্যক্রমও সীমিত হয়ে পড়েছে।’



