লাকসামে রেলের জমিতে পৌরসভার মার্কেট

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
কুমিল্লার লাকসামে দৌলতগঞ্জ রেলওয়ে স্টেশনের জমিতে গড়ে উঠেছে হকার্স মার্কেট, মাছের আড়ত, সিএনজিচালিত অটোরিকশা, পিকআপ ভ্যানস্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন স্থাপনা। রেলওয়ের দাবি, এসব স্থাপনা তাদের জমি দখল করে নির্মাণ করা হয়েছে। অথচ সেই জমিই প্রতি বছর ইজারা দিচ্ছে লাকসাম পৌরসভা। শুধু ইজারা নয়, রেলওয়ের জমিতে গড়ে ওঠা পৌর হকার্স মার্কেটের ৫২৪টি দোকানের ভিটি (পজিশন) একসময় বিক্রি করা হয়েছে। ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, পৌরসভার উদ্যোগে দোকানগুলো ৭০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত দামে পজিশন হিসেবে বিক্রি করা হয়েছিল।
রেলওয়ের তথ্য বলছে, একসময় দৌলতগঞ্জ স্টেশনে রেল ক্রসিংয়ের ব্যবস্থা ছিল। ২০১৪ সালেও লুপলাইনটি ব্যবহৃত হতো। কিন্তু দখল ও ভরাটের পর লুপলাইনটির আর কোনো অস্তিত্ব নেই। ২০১৭ সালে লোকবল সংকটের কথা বলে স্টেশনের কার্যক্রম বন্ধ হলেও লাকসাম-নোয়াখালী রেলপথে ট্রেন চলাচল এখনো অব্যাহত আছে। লুপলাইন হারিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি স্টেশনের দুই পাশেও দখল বিস্তৃত হয়েছে।
রেলওয়ের হিসাব অনুযায়ী, দক্ষিণের সিগন্যাল পয়েন্ট থেকে উত্তরের হোম সিগন্যাল পর্যন্ত অন্তত পৌনে এক কিলোমিটার এলাকায় রেলওয়ের জমি দখল হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে মাছের আড়ত, সিএনজিচালিত অটোরিকশা স্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন স্থাপনা। তবে এসব স্থাপনা শুধু দখল হয়ে পড়ে নেই; এগুলো থেকেই নিয়মিত অর্থ আদায় হচ্ছে।
পৌরসভার তথ্য অনুযায়ী, চলতি বাংলা সনে দৌলতগঞ্জের মাছের আড়ত ৩৩ লাখ ৫১ হাজার টাকায়, হকার্স মার্কেট ৩০ লাখ এবং লাকসাম-শ্রীয়াং সিএনজি স্ট্যান্ড ১ লাখ ৩৫ হাজার টাকায় ইজারা দেওয়া হয়েছে।
হকার্স মার্কেটের বর্তমান ইজারাদার মো. ইদ্রিস মিয়ার ভাষায়, ‘পৌরসভাকে ৩০ লাখ টাকা দিয়ে চলতি বছরের জন্য মার্কেটটি ইজারা নিয়েছি। স্থানীয় প্রশাসনের নির্দেশনা অনুযায়ী প্রতিটি পজিশন থেকে দৈনিক ৫০ টাকা করে খাজনা নেওয়া হচ্ছে।’ তার দাবি, এ ইজারায় তার খরচও পুরোপুরি উঠবে না।
ব্যবসায়ী মোহাম্মদ শাহজাহান জানালেন, তিনি চারটি পজিশন ৭০ হাজার টাকা করে কিনেছিলেন। এখন প্রতিটির জন্য দৈনিক ৫০ টাকা করে খাজনা দেন। আরেক ব্যবসায়ী সাদ্দাম হোসেনের দাবি, আটটি ভিটি নিয়ে দোকান চালিয়ে প্রতিদিন ৪০০ টাকা ভাড়া ও ৪০০ টাকা খাজনা দিচ্ছেন তিনি।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, ২০১৫ সালে দৌলতগঞ্জ স্টেশনের পাশে থাকা একটি জলাশয় ও লুপলাইন ভরাট করে সেখানে মার্কেট নির্মাণ করা হয়। পরে এর নাম দেওয়া হয় পৌর হকার্স মার্কেট। ২০১৬ সালের ১৬ ডিসেম্বর তৎকালীন স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মো. তাজুল ইসলাম মার্কেটটির উদ্বোধন করেন বলে স্থানীয় সূত্রে জানা যায়।
মার্কেট নির্মাণ ও দোকান বরাদ্দের সঙ্গে তৎকালীন পৌর মেয়রসহ স্থানীয় আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার সম্পৃক্ততার অভিযোগও রয়েছে। ব্যবসায়ীদের কয়েকজনের দাবি, তাদের কাছ থেকে টোকেনের মাধ্যমে ৭০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত নিয়ে দোকানের পজিশন বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছিল। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কয়েকজন বর্তমানে এলাকায় না থাকায় তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দখলের বিষয়ে পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মো. মোস্তাফিজুর রহমানের ভাষ্য, ‘দৌলতগঞ্জ স্টেশনের দখল পূর্বাঞ্চল রেলের সবচেয়ে বড় দখলগুলোর একটি।’ তার দাবি, লুপলাইনসহ রেলওয়ের সম্পত্তি উদ্ধারে কয়েকবার চেষ্টা করা হলেও রাজনৈতিক কারণে এবং স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতার অভাবে তা সম্ভব হয়নি।
সম্প্রতি বিষয়টি আবারও রেলওয়ের নজরে এসেছে। গত ১০ জুন পূর্বাঞ্চল রেলের মহাব্যবস্থাপক দৌলতগঞ্জ স্টেশন পরিদর্শনের সময় অবৈধ স্থাপনাগুলো দেখতে পান। পরে রেলওয়ের প্রধান ভূসম্পত্তি কর্মকর্তাসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়। ‘প্রথমে দখলদারদের নোটিস দেওয়া হবে; এরপরও স্থাপনা সরানো না হলে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হবে’— বললেন মোস্তাফিজুর রহমান।
রেলওয়ের জমি পৌরসভা কীভাবে ইজারা দিল— এমন প্রশ্নে লাকসাম পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নার্গিস সুলতানা বললেন, জায়গাটি যে রেলওয়ের, তা তিনি জানেন। তার ভাষ্য, পৌরসভার আওতাধীন হাট-বাজার ইজারা দেওয়ার এখতিয়ার পৌরসভার রয়েছে এবং এই মার্কেটও অনেক আগে থেকে ইজারা দেওয়া হচ্ছে। তিনি আশ্বস্ত করেন, রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ সম্পত্তি উদ্ধার করতে চাইলে স্থানীয় প্রশাসন আইনগত সহযোগিতা করবে।
রেলওয়ের বিভাগীয় ভূ-সম্পত্তি কর্মকর্তা মো. খোরশেদ আলমও দৌলতগঞ্জে জলাশয় ও লুপলাইন ভরাট করে মার্কেট নির্মাণের বিষয়টি জানেন বলে জানিয়েছেন। তবে দখল উচ্ছেদে সাম্প্রতিক সময়ে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না, সে বিষয়ে তিনি স্পষ্ট বক্তব্য দেননি।



