অযত্ন-অবহেলায় রোয়াইলবাড়ি দুর্গ

ছবি: আগামীর সময়
বেতাই নদীর তীরে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে মোগল আমলের এক অনন্য কীর্তি—ঐতিহাসিক রোয়াইলবাড়ি দুর্গ। নেত্রকোনার কেন্দুয়া উপজেলার রোয়াইলবাড়ি আমতলা ইউনিয়নের রোয়াইলবাড়ি এলাকায় অবস্থিত এই প্রাচীন স্থাপত্যটি একসময় ছিল মোগল আমলের এক গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক কেন্দ্র। অনেকের কাছে এটি ‘কোটবাড়ি দুর্গ’ নামেও পরিচিত। কিন্তু কালের আবর্তে এবং প্রশাসনের সঠিক উদ্যোগের অভাবে পর্যটনের এই অপার সম্ভাবনা আজ মুখ থুবড়ে পড়েছে। অযত্ন, অবহেলা আর রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে হুমকির মুখে পড়েছে ঐতিহাসিক এই প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন, যার ফলে সরকারও হারাচ্ছে মোটা অঙ্কের রাজস্ব।
দুর্গের নির্মাণকাল নিয়ে প্রত্নতত্ত্ববিদদের মধ্যে রয়েছে নানা মত। কেউ কেউ একে সুলতানী আমলের স্থাপনা মনে করেন। আবার অনেকের মতে, সুলতান আলাউদ্দিন হুসেন শাহের পুত্র নছরত শাহ্ এ অঞ্চলে বসবাসের সময় দুর্গটি তৈরি করেছিলেন। পরবর্তীতে ঈশা খাঁ ও তাঁর পরবর্তী শাসকদের আমলে এখানে ব্যাপক সম্প্রসারণের কাজ করা হয়। তবে দীর্ঘ সময় মাটির নিচে চাপা পড়ে থাকার পর, প্রায় দুই যুগ আগে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খননকাজে এই দুর্গের সন্ধান মেলে। সে সময় মাটির ঢিবি থেকে মোগল আমলের কারুকার্যখচিত ইটের তৈরি একটি বারোদুয়ারি মসজিদ, প্রাসাদের চিহ্ন এবং একটি সুড়ঙ্গ পথ আবিষ্কৃত হয়। সুড়ঙ্গের পাশেই রয়েছে কথিত নিয়ামত বিবির মাজার এবং ১২ হাত লম্বা ডেঙ্গু মালের কবরস্থান।
১৯৮৭ সালে জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে এই ঐতিহাসিক নিদর্শনের ৪৬ একর ভূমিকে ‘পুরাকীর্তি এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তবে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কেবল একটি সাইনবোর্ড টেনেই নিজেদের দায়িত্ব শেষ করেছে; দুর্গের সুরক্ষায় আজও কোনো সীমানা প্রাচীর বা কাঁটাতারের বেড়া নির্মাণ করা হয়নি। ফলে খনন করা পাথরের ও কাঁচের বিভিন্ন পিলার দীর্ঘ দিন ধরে চারদিকে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। সম্প্রতি নতুন করে খননকাজ শুরু হলে বারোদুয়ারি মসজিদের দক্ষিণ দিকে দুর্গের মূল ফটকসহ বেশ কিছু নিদর্শনের সন্ধান মেলে এবং সেখানে কারুকার্যখচিত ইট-পাথরের একটি অস্থায়ী প্রদর্শনী করা হয়। সে সময় সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় থেকে এলাকাটিকে পর্যটন কেন্দ্র হিসেবে ঘোষণা করার আশ্বাস দেওয়া হলেও, খননকাজ বন্ধ হওয়ার এক বছর পেরিয়ে গেলেও কোনো অগ্রগতি দেখা যায়নি।
অবকাঠামোগত কোনো সুযোগ-সুবিধা না থাকলেও ঐতিহ্যবাহী এই দুর্গটি দেখতে প্রতিদিনই দূর-দূরান্ত থেকে পর্যটকরা ভিড় করছেন। জেলা পরিষদের উদ্যোগে এখানে কেবল দুটি ছাতাকৃতির পাকা বিশ্রামাগার তৈরি করা হলেও তা পর্যাপ্ত নয়। কোনো ভালো হোটেল, রেস্টুরেন্ট বা আধুনিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকায় পর্যটকদের পোহাতে হচ্ছে চরম বিড়ম্বনা।
কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলা থেকে ঘুরতে আসা তরুণ রাসেল আহমেদ বললেন, 'জায়গাটি খুবই সুন্দর এবং স্থাপনাগুলো দৃষ্টিনন্দন। কিন্তু এখানে থাকার বা খাওয়ার কোনো ভালো ব্যবস্থা নেই, এমনকি নিরাপত্তাও নেই। সুযোগ-সুবিধা বাড়ালে এখানে দর্শনার্থী আরও বাড়বে।'
চর আমতলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সাবেক প্রধান শিক্ষক মো. রফিকুল ইসলামের আক্ষেপ, 'প্রতি বছরই সরকারের উচ্চপর্যায়ের লোকজন এটি পরিদর্শন ও পরীক্ষা-নিরীক্ষা করতে আসেন। কিন্তু আজ অবধি উন্নয়নের কোনো বাস্তব কাজ হয়নি। সুযোগ-সুবিধার অভাবে পর্যটকদের আগমন দিন দিন কমে যাচ্ছে।' একই সুর শোনা গেল রোয়াইলবাড়ী ফাজিল মাদ্রাসার সহকারী অধ্যাপক সিদ্দিকুর রহমানের কণ্ঠেও। তিনি জানান, প্রতিদিন অনেক মানুষ পরিবার-পরিজন নিয়ে এখানে আসেন। অবকাঠামোগত উন্নয়ন করতে পারলে দর্শনার্থী বাড়ার পাশাপাশি সরকারের রাজস্বও বহুগুণ বৃদ্ধি পাবে।
ঐতিহাসিক এই দুর্গটিকে দর্শনীয় ও আকর্ষণীয় করে গড়ে তুলতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর ও মন্ত্রণালয় থেকে প্রয়োজনীয় বরাদ্দ ও পরিকল্পনা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন রোয়াইলবাড়ী ইউনিয়ন পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান লুৎফর রহমান ভূঁইয়া। আর কেন্দুয়া প্রেসক্লাবের সাবেক সাংস্কৃতিক সম্পাদক ও ইতিহাস সংগ্রাহক রাখাল বিশ্বাস মনে করেন, 'সরকারি সহযোগিতা পেলে বেতাই নদীর তীরের এই মোগল স্থাপত্যটি হতে পারে এই অঞ্চলের সবচেয়ে বিখ্যাত পর্যটন কেন্দ্র।'
কেন্দুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. রিফাতুল ইসলাম জানান, নেত্রকোনার বর্তমান জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান কিছুদিন আগে দুর্গটি পরিদর্শন করেছেন এবং তাঁর নির্দেশেই দুর্গের ইতিহাসসংবলিত সাইনবোর্ড টানানো হয়েছে। তিনি আরও আশ্বস্ত করেন, 'আগামী অর্থবছরে রোয়াইলবাড়ি বাজার থেকে দুর্গ পর্যন্ত একটি দৃষ্টিনন্দন রাস্তা নির্মাণ করা হবে। দুর্গটির সৌন্দর্য ও পর্যটকদের সুবিধা বাড়াতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর একটি সামগ্রিক পরিকল্পনা গ্রহণ করবে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে আমরা সরকারের উচ্চপর্যায়ে যোগাযোগ রক্ষা করছি এবং এই ঐতিহাসিক নিদর্শনের উন্নয়নে কেন্দুয়া উপজেলা প্রশাসন সর্বদা প্রস্তুত রয়েছে।'




