বর্ষায় বৈঠায় ঘুরে সংসারের চাকা

ছবি: আগামীর সময়
হবিগঞ্জের আজমিরীগঞ্জ উপজেলার কাকাইলছেও ইউনিয়নের সৌলরী গ্রামে বর্ষা এলেই ব্যস্ততা বেড়ে যায় বৈঠা তৈরির কারিগরদের। কালনী নদীঘেঁষা এ গ্রামের অন্তত ২০টি পরিবার এখনও কাঠের বৈঠা তৈরি এবং বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করছে। তবে সময়ের পরিবর্তনে একসময়ের সমৃদ্ধ এ পেশা এখন টিকে আছে সীমিত পরিসরে।
গ্রামের প্রবীণ কারিগর সিরাজ মিয়া (৬৫) কৈশোরে বাবার কাছ থেকে বৈঠা তৈরির কাজ শিখেছিলেন। প্রায় পাঁচ দশক ধরে তিনি এ পেশার সঙ্গে যুক্ত। কৃষিকাজ শেষ হয়ে বর্ষা মৌসুম শুরু হওয়ার আগেই তিনি বৈঠা তৈরিতে ব্যস্ত হয়ে পড়েন।
সিরাজ মিয়ার ভাষ্য, ‘বাবার কাছ থেকে শিখেছিলাম এই কাজ। প্রায় ৪০ বছর ধরে করছি। আগে কম দামে কাঠ কিনতাম, কম দামে বিক্রিও করতাম। তখন মোটামুটি লাভ হতো। এখন বেশি দামে কাঠ কিনে এনে প্রক্রিয়াজাত করতে অনেক খরচ হয়। বেশি দামে বিক্রি করলেও লাভের পরিমাণ খুবই কম।’
সৌলরী গ্রামের তৈরি বিভিন্ন ধরনের কাঠের বৈঠা সিলেট বিভাগের বিভিন্ন জেলা-উপজেলাসহ দেশের নানা অঞ্চলে বিক্রি হয়। একসময় গ্রামের প্রায় ৮০টি পরিবারের প্রধান মৌসুমি জীবিকা ছিল এ পেশা। বর্তমানে অনেকে পেশা পরিবর্তন করে প্রবাসে গেছেন বা শহরে বসতি গড়েছেন।
কারিগর মিলন মিয়া জানান, কৃষিকাজ শেষ হওয়ার পরই তারা বৈঠা তৈরি শুরু করেন। বিশেষ করে জ্যৈষ্ঠ ও আষাঢ় মাসে বৈঠার চাহিদা সবচেয়ে বেশি থাকে।
আরেক কারিগর আব্দুল হেকিম বলছিলেন, প্রতি ২০টি কাঠের ফালি কিনতে দেড় হাজার থেকে দুই হাজার টাকা খরচ হয়। পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ ও তৈরিসহ মোট ব্যয় দাঁড়ায় প্রায় তিন হাজার টাকা। পরে সাড়ে তিন হাজার টাকায় বিক্রি করা হয়। তার মন্তব্য, ‘আগের মতো লাভ এখন আর নেই। তবে বর্ষায় বসে থাকার চেয়ে এই কাজ করেই কিছু আয় হয়।’
স্থানীয় প্রবীণ বাসিন্দা শেখ মুহিত মিয়া উল্লেখ করেন, আগে গ্রামের প্রায় প্রতিটি ঘরেই বৈঠা তৈরি হতো। এখন পেশাটি ছেড়ে দিয়েছেন অনেকেই। বর্তমানে মাত্র ১৫ থেকে ২০টি পরিবার এ কাজে যুক্ত রয়েছে।
আজমিরীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম রেজাউল করিম বলেন, ‘হাওড়বেষ্টিত এ অঞ্চলে বর্ষাকালে নৌকার ব্যবহার বেশি হওয়ায় বৈঠা তৈরির পেশাটি গুরুত্বপূর্ণ। কাঠের বৈঠা হাওড় অঞ্চলের ঐতিহ্যেরও অংশ। কালের বিবর্তনে পেশাটি বিলুপ্তির পথে চলে গেলেও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সম্ভাব্য সহযোগিতা দেওয়া হবে।’




