সোনালি মুরগির আঁতুড়ঘরেই অন্ধকার

জয়পুরহাটের সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামারেই জন্ম নিয়েছিল সোনালি মুরগি। সেই মুরগির হাত ধরে বদলে গিয়েছিল জয়পুরহাটসহ উত্তরাঞ্চলের পোলট্রি শিল্পের চেহারা। অথচ সোনালি মুরগির সেই আঁতুড়ঘরেই এখন অন্ধকার। ভাঙা সীমানাপ্রাচীর, জরাজীর্ণ শেড, আগাছায় ঢাকা প্রাঙ্গণ আর জনবল সংকটে ধুঁকছে প্রায় ৯ দশকের পুরনো খামারটি। যে প্রতিষ্ঠান একসময় অন্যদের স্বাবলম্বী হওয়ার পথ দেখিয়েছিল, আজ তার নিজের উৎপাদনই নেমে এসেছে তলানিতে।
খামারটিতে দেখা গেছে, সীমানাপ্রাচীরের বিভিন্ন অংশ ভাঙা। পুরো প্রাঙ্গণে আগাছা। শেডগুলোর অবস্থাও নাজুক। কোথাও ছাদের পলেস্তারা খসে রড বেরিয়ে গেছে। কোনো কোনো জায়গায় ধস ঠেকাতে দিয়ে রাখা হয়েছে বাঁশের খুঁটি। ১২টি শেডের মধ্যে চারটির ছাদ নষ্ট হয়ে যাওয়ায় সেগুলো পরিত্যক্ত। বাকি আটটি শেডে ঝুঁকি নিয়েই চলছে মুরগি পালন ও অন্যান্য কার্যক্রম।
অবকাঠামোর এই দুরবস্থার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তীব্র জনবল সংকট। খামারের অনুমোদিত ২০টি পদের বিপরীতে কর্মরত মাত্র সাতজন। মুরগির শেডে কাজ করার জন্য নেই কোনো শ্রমিকও। ফলে সীমিত জনবল দিয়ে কার্যক্রম চালাতে গিয়ে একদিকে যেমন চাপ বাড়ছে, অন্যদিকে কমছে উৎপাদন।
এর প্রভাব সবচেয়ে স্পষ্ট মুরগি পালনের লক্ষ্যমাত্রায়। ২০ হাজার বাচ্চা ও ২ হাজার লেয়ার মুরগি পালনের সক্ষমতা থাকলেও বর্তমানে রয়েছে মাত্র ২ হাজার বাচ্চা ও ১ হাজার ৮০০ লেয়ার। ২০০৮ সালে আধুনিক হ্যাচারি স্থাপন করা হলেও সেখান থেকে উৎপাদন হচ্ছে না লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী। বর্তমানে বছরে এক দিন বয়সী বাচ্চা খামারিদের সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ লাখ।
খামারসংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, ১৯৩৭ সালে জয়পুরহাটের আক্কেলপুর উপজেলার জামালগঞ্জে ৩০ বিঘা জমির ওপর সরকারি মুরগি প্রজনন ও উন্নয়ন খামারটি প্রতিষ্ঠিত হয়। দীর্ঘ পথ পেরিয়ে প্রতিষ্ঠানটি একসময় উত্তরাঞ্চলের পোলট্রি শিল্পের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে ওঠে। ২০০০ সালের পর তৎকালীন সহকারী পরিচালক মো. শাহ জামালের নেতৃত্বে এই খামারেই উদ্ভাবন করা হয় সোনালি মুরগির জাত। পরে পাশের শাহাপুর গ্রামের ১০টি খামারে পরীক্ষামূলকভাবে পালন করা হয় এই মুরগি। স্বাদ ও রঙের কারণে অল্প সময়ের মধ্যেই সোনালি মুরগি সবার জনপ্রিয় হয়ে ওঠে। সেখান থেকেই ছড়িয়ে পড়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায়। সোনালি মুরগির জনপ্রিয়তার সঙ্গে সঙ্গে বদলে যেতে থাকে এ অঞ্চলের পোলট্রি অর্থনীতিও। ২০১০ সালের পর জয়পুরহাট, বগুড়া ও নওগাঁয় পোলট্রি শিল্পের ব্যাপক প্রসার ঘটে। বর্তমানে শুধু জয়পুরহাটেই ১১টি ফিড মিল ও ৬৩টি হ্যাচারি রয়েছে। একসময় এই অঞ্চল থেকে প্রতিদিন প্রায় ৩ লাখ বাচ্চা, বছরে ২ লাখ টন মাংস এবং ৪০ কোটি ডিম উৎপাদনের তথ্যও পাওয়া গেছে।
খামারি আরিফ ইফতেখার আহম্মেদ রানার ভাষায়, ‘একসময় উন্নত বাচ্চা ও পরামর্শের জন্য সরকারি খামারটিই তাদের ভরসা ছিল। এখন খামারটির বেহাল অবস্থার কারণে তারা সে সুবিধা থেকে বঞ্চিত।’
খামারের উপপরিচালক ডা. মো. ওয়ালী-উল-ইসলামের ভাষ্য, ‘পরিত্যক্ত শেড ও শ্রমিক সংকটের কারণে কমেছে উৎপাদন।’




