শৈবাল-গ্রিন মাসেল চাষ
বাজার ব্যবস্থাপনার ঘাটতি ভোগাচ্ছে উদ্যোক্তাদের

ছবিঃ আগামীর সময়
মূল্যবান সামুদ্রিক সম্পদ শৈবাল। বিশ্বব্যাপী খাদ্যপণ্য, ঔষধি ও প্রসাধনী পণ্য, সার, বায়ো ফুয়েল এবং পরিবেশ দূষণরোধক পণ্য উৎপাদন হয় শৈবাল থেকে। লবণাক্ত, আধা লবণাক্ত পানির পরিবেশে এটি জন্মে এবং চাষাবাদ হয় সহজে। বর্তমানে দেশেও দেখা যাচ্ছে শৈবাল চাষের অপার সম্ভাবনা।
কক্সবাজার শহরের কোলাহল ফেলে মাত্র ৪ কিলোমিটার এগোলেই খুরুশকুল-মহেশখালী চ্যানেলের উপকূল। চোখের সামনে যেন অন্য পৃথিবী। জোয়ার-ভাটার ওঠানামা, লোনা বাতাস, আর বিস্তীর্ণ জলরাশি। প্রকৃতি যেন এখানে নিজেই আঁকছে সম্ভাবনার নতুন নকশা।
এই উপকূলেই গড়ে উঠতে পারত সামুদ্রিক শৈবাল (সি-উইড) ও গ্রিন মাসেল চাষভিত্তিক নতুন অর্থনীতি। যা বদলে দিতে পারত হাজারও মানুষের জীবন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সম্ভাবনার এই আলো এখনও ছড়ায়নি পুরোপুরি। বাজার সংকট, পরিকল্পনার অভাব আর অবকাঠামোগত সীমাবদ্ধতায় থমকে আছে এই খাত।
স্বপ্ন, ঝুঁকি আর একজন উদ্যোক্তা
এই সম্ভাবনার গল্পের কেন্দ্রে স্থানীয় উদ্যোক্তা আনোয়ার মিয়া। বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট থেকে প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর ২০১৮ সালে তিনি নিশ্চিত চাকরি ছেড়ে ঝুঁকি নেন। শুরুতে ছিল মাত্র কয়েকটি ভেলা। তাতেই হত শৈবাল চাষ। ধীরে ধীরে যুক্ত হয় গ্রিন মাসেল (সবুজ ঝিনুক) এবং কোরাল মাছ।
একসময় তিনি একই ভেলায় তিন ধরনের উৎপাদনের সমন্বিত মডেল দাঁড় করান, যা দেশের জন্য নতুন এক দৃষ্টান্ত। জোয়ার-ভাটার ছন্দে গড়ে ওঠা এই চাষ পদ্ধতি এখন ভালো ফলন দিচ্ছে।
খরচ কম, পরিবেশবান্ধব, রোগবালাইও তুলনামূলক কম। কিন্তু সমস্যা একটাই, বাজার। আনোয়ার মিয়া হতাশার কণ্ঠে জানান, ‘উৎপাদন হচ্ছে, কিন্তু বিক্রি করা যাচ্ছে না। অনেক সময় শৈবাল আর ঝিনুক নষ্ট হয়ে যায়। এতে বড় লোকসান হয়।’
উৎপাদন নয়, সমস্যা এখন বিক্রি
বিশ্বজুড়ে শৈবাল এখন ‘সুপারফুড’। নানা খাতে এর ব্যবহার বাড়ছে। গ্রিন মাসেলও উচ্চ পুষ্টিগুণের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদাসম্পন্ন। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে দাঁড়িয়েছে ভিন্ন বাস্তবতা। খুরুশকুলে নেই স্থায়ী ক্রেতা, নেই প্রক্রিয়াজাতকরণ কেন্দ্র, নেই সংরক্ষণাগার, নেই রপ্তানি চেইন। ফলে উৎপাদিত পণ্যের বড় অংশই থেকে যায় অবিক্রীত। সময়মতো বিক্রি না হওয়ায় পচে যায় শৈবাল ও ঝিনুক।
উদ্যোক্তাদের ভাষ্যে, ‘উৎপাদনের চেয়ে বড় সমস্যা এখন বিক্রি।’
নারীনির্ভর নতুন অর্থনীতি
এই খাতের সবচেয়ে ইতিবাচক দিক নারীদের ব্যাপক অংশগ্রহণ। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউটের তথ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার জেলায় প্রায় এক হাজার চাষী শৈবাল উৎপাদনের সঙ্গে যুক্ত, যাদের বড় অংশই নারী। নুনিয়াছড়া, রেজুখাল, সোনাদিয়া, শাহপরীর দ্বীপসহ বিভিন্ন এলাকায় শত শত নারী এখন শৈবাল চাষে যুক্ত আছেন।
মরিয়ম, আনোয়ারা, মমতাজদের মতো নারীরা পরিবারে তৈরি করেছেন নতুন আয়ের উৎস। মরিয়ম স্পষ্ট করেন, ‘আগে সংসারে টানাটানি ছিল। শৈবাল চাষে আয় হচ্ছে ঠিকই। কিন্তু দাম না পাওয়ায় লাভ কমে যাচ্ছে।’
কীভাবে চাষবাস: শৈবাল চাষের প্রধান দুই পদ্ধতি। লং লাইন পদ্ধতি: দড়িতে নির্দিষ্ট দূরত্বে চারা বেঁধে পানিতে ভাসিয়ে রাখা। ভাসমান ভেলা পদ্ধতি: বাঁশ বা পাইপের ভেলায় দড়ি ঝুলিয়ে চাষ।
নভেম্বর থেকে এপ্রিল মৌসুমে চাষ করা হয়। ১৫-২১ দিনের মধ্যেই পাওয়া যায় প্রথম ফসল। প্রায় ৯ কেজি ভেজা শৈবাল শুকিয়ে ১ কেজি হয়। কেজিপ্রতি বাজারে দাম, তাজা শৈবাল: ১০০ থেকে ১৫০ টাকা। শুকনো শৈবাল: ৩০০ থেকে ১০০০ টাকা। তবে মৌসুমে ফলন বেশি হলে দাম পড়ে যায়, যা চাষীদের বড় ক্ষতির কারণ।
গবেষণা, প্রকল্প আর সীমাবদ্ধতা
২০১৬ সাল থেকে শৈবাল চাষ নিয়ে শুরু হয় পরীক্ষামূলক কার্যক্রম। এতে যুক্ত রয়েছে বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা) ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা। প্রশিক্ষণ, চারা ও উপকরণ সরবরাহ করা হলেও বড় সমস্যা রয়ে গেছে ধারাবাহিকতা ও বাজার সংযোগের অভাব।
কক্সবাজার সামুদ্রিক মৎস্য ও প্রযুক্তি কেন্দ্রের বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা মো. আকতারুজ্জামানের তুলে ধরেন, বীজ উৎপাদনেও ঘাটতি রয়েছে। পর্যাপ্ত ল্যাব সুবিধা না থাকায় চাহিদা অনুযায়ী উৎপাদন সম্ভব হচ্ছে না।
বিশ্বে শৈবালের বাজার এখন বিলিয়ন ডলারের। চীন, ইন্দোনেশিয়া, দক্ষিণ কোরিয়া এই খাতে এগিয়ে। জাতিসংঘের তথ্য অনুযায়ী, বছরে ৩৬ মিলিয়ন টনের বেশি শৈবাল উৎপাদিত হয়। বাংলাদেশের রয়েছে ৭১০ কিলোমিটার উপকূলরেখা ও প্রায় ২৫ হাজার বর্গকিলোমিটার উপকূলীয় এলাকা। সঠিক পরিকল্পনায় বছরে ২০-৩০ হাজার কোটি টাকার রপ্তানি আয় সম্ভব বলে মত দেন এই কর্মকর্তা।
উদ্যোক্তা মারিয়ার পথচলা
কক্সবাজারের উদ্যোক্তা মারিয়া রে শৈবাল দিয়ে তৈরি করছেন সাবান, গুঁড়া এবং স্যুপ ও বিভিন্ন খাবার। ২০২৫ সালে প্রায় দুই লাখ টাকার পণ্য বিক্রি করেছেন। বর্তমানে দেড় একর জমিতে চাষ করছেন এবং ৩০ লাখ টাকার বিক্রির টার্গেট নিয়েছেন। তার খামারে কাজ করছেন স্থানীয় নারীরা, যা এই খাতকে আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক করছে।
দ্বৈত উপকার: বাংলাদেশ ওশানোগ্রাফিক রিসার্চ ইনস্টিটিউটের সায়েন্টিফিক অফিসার মীর কাশেম ব্যাখ্যা করলেন, শৈবাল শুধু অর্থনৈতিক নয়, পরিবেশগত দিক থেকেও গুরুত্বপূর্ণ। প্রতি কেজি শৈবাল প্রায় ০.৭ কেজি কার্বন ডাই-অক্সাইড শোষণ করে, সমুদ্রের পানি পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে এবং জলজ প্রাণীর আবাস তৈরি করে। অর্থাৎ এটি ‘ব্লু কার্বন’ অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
যা দরকার: বিশেষজ্ঞ ও উদ্যোক্তাদের মতে, খাতটি এগিয়ে নিতে জরুরি হলো প্রক্রিয়াজাতকরণ কারখানা, কোল্ড স্টোরেজ ও সংরক্ষণ ব্যবস্থা, সহজ শর্তে ঋণ, রপ্তানি বাজার তৈরি, স্থানীয় বাজারে সচেতনতা বাড়ানো এবং গভীর সমুদ্রে বছরব্যাপী চাষের উদ্যোগ।
বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন (বাপা) কক্সবাজারের সাংগঠনিক সম্পাদক এইচ এম নজরুল ইসলাম বলছিলেন, ‘খুরুশকুলের উপকূলে দাঁড়িয়ে একসঙ্গে দুটি দৃশ্য দেখা যায়। একদিকে উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ, অন্যদিকে বাস্তবতার সীমাবদ্ধতা। আনোয়ার মিয়া, মরিয়ম বা মারিয়ার মতো উদ্যোক্তারা প্রতিদিন জোয়ার-ভাটার সঙ্গে লড়াই করে স্বপ্ন বুনছেন।
তার দাবি, উদ্যোক্তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে দরকার শুধু নীতিগত সহায়তা, পরিকল্পিত বিনিয়োগ এবং নিশ্চিত বাজার। তাহলেই খুরুশকুলের এই উপকূল একদিন হয়ে উঠতে পারে বাংলাদেশের সুনীল অর্থনীতির শক্তিশালী কেন্দ্র। ‘যেখানে সমুদ্রই হবে জীবিকার সবচেয়ে বড় ভরসা।’
















