বিলে বুলেট ট্রেন কাজে শম্বুকগতি

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
পাইকগাছা উপজেলার শিবসা নদীর ওপর নির্মিত হচ্ছে ৭৪৮ মিটার দৈর্ঘ্যের সেতু। ১২০ কোটি টাকা ব্যয়ের সেতুটির কাজ শুরু হয় ২০২৩ সালের ২১ সেপ্টেম্বর। কাজ শেষ হওয়ার কথা চলতি বছর ২০ সেপ্টেম্বর। কিন্তু মেয়াদ শেষ হতে প্রায় দুই মাস বাকি থাকলেও ভৌত অগ্রগতি ৭০ শতাংশ। অথচ এই অগ্রগতির বিপরীতে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ করা হয়েছে ৭৫ শতাংশ। অর্থাৎ কাজের তুলনায় বিল দেওয়া হয়েছে ৫ শতাংশ বেশি।
শুধু এই প্রকল্পে নয়; শিবসাসহ চার নদীতে চারটি সেতু নির্মাণ প্রকল্পেই চলছে কমবেশি একই অবস্থা। ‘পল্লী সড়কে গুরুত্বপূর্ণ সেতু নির্মাণ’ শীর্ষক প্রকল্পের আওতায় ৩৩২ কোটি টাকা ব্যয়ে এই চারটি সেতু নির্মাণ করছে খুলনা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর। অভিযোগ রয়েছে, চারটি সেতুর নির্মাণকাজই চলছে ধীরগতিতে।
গত ৩০ জুন পর্যন্ত কাজগুলোর ভৌত অগ্রগতির হিসাব বলছে, কোনোটির মেয়াদ প্রায় শেষ হয়ে এলেও প্রত্যাশিত অগ্রগতি নেই, আবার কোনোটির মেয়াদ ফুরালে কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়েও নির্মাণকাজ সমাপ্ত হয়নি। অথচ এলজিইডির তথ্য বলছে, কাজের অগ্রগতির তুলনায় বেশি এবং প্রায় সমপরিমাণ বিল তুলে নিয়েছে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদাররা।
শিবসা নদীর ওপর সেতু নির্মাণ প্রকল্পের মতোই বিল তোলায় গতি দেখা গেছে পাইকগাছা উপজেলায় নড়া নদীর ওপর সেতু নির্মাণ প্রকল্পেও। এ নদীর ওপর ২৬ কোটি ৪৪ লাখ টাকা ব্যয়ে ১৭৫ মিটার সেতু নির্মাণকাজ শুরু হয় ২০২৫ সালের ১৯ মার্চ। কাজ শেষ হওয়ার কথা ২০২৭ সালের ১৮ মার্চ। অর্থাৎ ১৬ মাসে ভৌত অগ্রগতি মাত্র ১২ শতাংশ। কিন্তু ঠিকাদার ইকবাল জমাদ্দারকে বিল দেওয়া হয়েছে ১৫ শতাংশ।
পাইকগাছার এ দুটি সেতুর ব্যাপারে উপজেলা প্রকৌশলী মো. শাফিন শোয়েব বলেছেন, ‘জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় শিবসা সেতুর কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ হবে না। সময় বাড়ানো হবে। এ ছাড়া কাজ চলমান থাকায় কাজের সমান বিল বা কিছু বেশি বিল গেলেও অসুবিধা নেই। ঠিকাদার যদি পালিয়েও যান, কাজে ব্যবহৃত তাদের ইকুইপমেন্ট থেকে বাড়তি বিলের চেয়েও বেশি টাকা পাওয়া যাবে।’
অন্যদিকে, নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হওয়া নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে ডুমুরিয়া উপজেলার শরাফপুরে ভদ্রা নদীর ওপর ৭৫৫ মিটার সেতু নির্মাণে। ১১৯ কোটি ৫২ লাখ টাকা ব্যয়ে প্রকল্পের কাজ শুরু হয় ২০২৪ সালের ১১ মার্চ। চলতি বছর ২ নভেম্বর শেষ হওয়ার কথা। মেয়াদ শেষ হতে মাত্র সাড়ে ৩ মাস বাকি থাকলেও ভৌত অগ্রগতি মাত্র ২৬ শতাংশ। তবে সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে বিল দেওয়া হয়েছে ২৫ শতাংশ। কাজটি বাস্তবায়ন করছে এমএম বিল্ডার্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ার্স লিমিটেড।
এ ছাড়া মেয়াদ বাড়িয়ে উপজেলার কদমতলা নদীতে ৬৭ কোটি ৫৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৪৬১ মিটার সেতু নির্মাণকাজ এখনো শেষ হয়নি। ২০২২ সালের ৮ জুন শুরু হওয়া প্রকল্পটির মেয়াদ ছিল গত বছর ১৪ জুন। নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ না হওয়ায় চলতি বছর জুন পর্যন্ত সময় বৃদ্ধি করা হয়। তবে বর্ধিত মেয়াদেও কাজ শেষ হয়নি। বর্তমানে প্রকল্পটির ভৌত অগ্রগতি ৪৫ শতাংশ। ঠিকাদার এরই মধ্যে বিল পেয়েছেন ৪০ শতাংশ। তৃতীয় দফায় মেয়াদ বাড়ানো হয়েছে ২০২৭ সালের নভেম্বর পর্যন্ত।
এ প্রসঙ্গে এলজিইডির ডুমুরিয়া উপজেলা প্রকৌশলী মুহাম্মদ দারুল হুদা বলেছেন, ‘যেহেতু কাজ চলমান রয়েছে, তাই কাজের সমান বিল দেওয়ায় অসুবিধা নেই।’ তবে জমি অধিগ্রহণ জটিলতায় সেতুর কাজে দীর্ঘসূত্রতা দেখা দিয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
বিষয়টি নিয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনার সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা বলছিলেন, বিভাগীয় শহর খুলনার সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলের কয়েকটি উপজেলার যোগাযোগ সহজ করতে সেতুগুলো নির্মিত হচ্ছে। কাজ শেষ হলে উপজেলাগুলোতে কৃষিপণ্য পরিবহন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। কিন্তু বছরের পর বছর প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়া বা ধীরগতিতে চলায় মানুষ প্রত্যাশিত সুফল থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।’




