হাতিয়ার দুর্গম চরে নেই চিকিৎসাব্যবস্থা

হাতিয়ার চর আতাউর। ছবি: আগামীর সময়
নদী ও সাগরবেষ্টিত নোয়াখালীর হাতিয়ার দুর্গম দ্বীপ ও চরাঞ্চলে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের বসবাস। অথচ এসব এলাকার অধিকাংশ মানুষের জন্য নেই ন্যূনতম চিকিৎসাসেবার ব্যবস্থা। অন্তঃসত্ত্বা ও প্রসূতি নারী, নবজাতক এবং গুরুতর অসুস্থ রোগীদের চিকিৎসা নিতে পাড়ি দিতে হয় দীর্ঘ পথ। অনেক ক্ষেত্রে সময়মতো হাসপাতালে পৌঁছাতে না পারায় পথে বা জলযানে মৃত্যুর ঘটনাও ঘটছে। দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা ও চিকিৎসাকেন্দ্রের অভাবে বছরের পর বছর ধরে স্বাস্থ্যসেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন এসব এলাকার বাসিন্দারা।
হাতিয়ার প্রায় ২ হাজার ১০০ বর্গকিলোমিটার আয়তনের বিস্তীর্ণ এলাকায় আছে অসংখ্য ছোট-বড় দ্বীপ ও চর। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য নিঝুমদ্বীপ, চর আতাউর, ঢালচর ও চর গাসিয়া। কয়েক যুগ ধরে এসব এলাকায় বসতি গড়ে উঠেছে নদী ভাঙনে বাস্তুচ্যুত ও বাস্তুহারা মানুষের। ক্রমবর্ধমান জনবসতির কারণে এসব দ্বীপ ও চরাঞ্চলে প্রায় ৬৫ হাজার মানুষের বসবাস। তবে কম জনবসতিপূর্ণ চরাঞ্চল বাদ দিলেও জনবহুল এলাকাগুলোয় এখনো কার্যকর কোনো হাসপাতাল বা ক্লিনিক গড়ে ওঠেনি।
সম্প্রতি নিঝুমদ্বীপসহ এসব চরাঞ্চল ঘুরে স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নিরাপদ প্রসবপূর্ব ও প্রসবোত্তর চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন নারীরা। হঠাৎ অসুস্থ হওয়া রোগীদেরও দুর্গম এলাকা থেকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিতে দীর্ঘ সময় লাগে। অনেক ক্ষেত্রে যথাসময়ে চিকিৎসা না পাওয়ায় রোগীর মৃত্যু হচ্ছে। সাধারণ অসুস্থতা কিংবা দুর্ঘটনার চিকিৎসার জন্যও চরবাসীকে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জেলা বা উপজেলা সদরে যেতে হয়। মৎস্যজীবী, কৃষক ও দরিদ্র পরিবারের অনেকের পক্ষেই এই ব্যয় ও ভোগান্তি সামাল দেওয়া কঠিন।
সরেজমিন দেখা গেছে, নিঝুমদ্বীপের একটি সাইক্লোন শেল্টারে স্বাস্থ্য ও পরিবারকল্যাণ কেন্দ্র থাকলেও সেখানে নেই কোনো মেডিকেল অফিসার। নেই পরিবারকল্যাণ পরিদর্শিকা ও উপসহকারী কমিউনিটি মেডিকেল অফিসারও। কয়েক বছর আগে সেখানে চালু ছিল পরিবার পরিকল্পনা অধিদপ্তরের অধীনে ইউএসএআইডির সহযোগিতায় কেন্দ্রটিতে ‘মা-মণি’ প্রকল্প। এখন ইউএনএফপিএর সহযোগিতায় একজন মিডওয়াইফের মাধ্যমে সীমিত পরিসরে স্বাভাবিক প্রসবসেবা দেওয়া হচ্ছে। তবে প্রয়োজনীয় অক্সিজেন সিলিন্ডার, গ্লাভসসহ অভাব আছে আনুষঙ্গিক সরঞ্জামেরও।
অন্যদিকে প্রায় ৪০ হাজার মানুষের বসবাসের এই দ্বীপে সাধারণ স্বাস্থ্যসেবার জন্য আছে তিনটি কমিউনিটি ক্লিনিক। তবে সেখানেও নিয়মিত সেবা পাওয়া কঠিন। অনুন্নত যোগাযোগব্যবস্থার পাশাপাশি সভা ও কর্মশালার কথা উল্লেখ করে কমিউনিটি হেলথ কেয়ার প্রোভাইডারদের (সিএইচসিপি) নিয়মিত অনুপস্থিতির অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। ফলে প্রাথমিক স্বাস্থ্যসেবার জন্য স্থানীয় ফার্মেসি কিংবা কবিরাজি চিকিৎসার ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অনেককে।
নিঝুমদ্বীপের এমন সীমিত চিকিৎসাসুবিধাও নেই চর আতাউর, ঢালচর ও চর গাসিয়ায়। হাতিয়া উপজেলা পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা মেহেদী হাসান জানালেন, নিঝুমদ্বীপসহ চরাঞ্চলগুলোতে প্রয়োজনীয় জনবল নেই। একটি কেন্দ্র থেকে মূল ভূখণ্ডে যতটুকু সেবা দেওয়া সম্ভব, সেটুকুই দেওয়া হচ্ছে।
আধুনিক চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে নিঝুমদ্বীপে হাসপাতাল স্থাপনের দাবিতে এর আগে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করেছেন স্থানীয়রা। নিঝুমদ্বীপ ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান লাভলী আক্তার জানিয়েছেন, একদিকে রাস্তাঘাটের বেহাল অবস্থা, অন্যদিকে উপজেলা ও জেলা সদরের হাসপাতালের দূরত্ব বেশি হওয়ায় দরিদ্র ও অসহায় গর্ভবতী নারীদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হয়। এ কারণে নিঝুমদ্বীপে ৩০ শয্যার একটি হাসপাতাল স্থাপন জরুরি।
উপজেলার সোনাদিয়া ইউনিয়নসংলগ্ন চর আতাউর আশ্রয়ণ প্রকল্পের বাসিন্দা হাসান উদ্দিন জানিয়েছেন, আশ্রয়ণ প্রকল্পসহ ওই এলাকায় ২২০টি পরিবারের প্রায় ৫০০ মানুষের বসবাস। সেখানে কোনো স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র নেই। এমনকি শিশুদের পড়াশোনার জন্যও কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠেনি।
সুখচর ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের ঢালচরে চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার মানুষ। স্থানীয় বাসিন্দা আমজাদ ও আমির হোসেনসহ অনেকে জানিয়েছেন, সেখানে কোনো চিকিৎসাকেন্দ্র নেই। কোনো নারীর প্রসবজনিত সমস্যা দেখা দিলে গ্রাম্য ধাত্রীর সহায়তায় কোনোমতে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া হয়।
স্থানীয় মসজিদ মার্কেটের জামসেদ জানিয়েছেন, চিকিৎসাসেবার পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় প্রায় দেড় হাজার শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
একই চিত্র হরনী ইউনিয়নের চর গাসিয়ায়। স্থানীয়দের তথ্য অনুযায়ী, প্রায় ১৯ হাজার মানুষের বসবাসের এই চরেও নেই কোনো চিকিৎসাকেন্দ্র বা ক্লিনিক। ফলে অসুস্থ হলে চিকিৎসা নিতে চরম ভোগান্তিতে পড়তে হয় বাসিন্দাদের। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অভাবে অনেক শিশু শিক্ষার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।
চর গাসিয়ার বাসিন্দা তৈমুর আলম জানিয়েছেন, কাছাকাছি কোনো চিকিৎসাকেন্দ্র না থাকায় তাদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়। গত ২৪ অক্টোবর বারো আউলিয়া বাজারসংলগ্ন এলাকায় হঠাৎ অসুস্থ হয়ে রহিমা নামে এক শিশু মারা যায়। সে স্থানীয় বাসিন্দা মৃত রাকিবের মেয়ে।
চরাঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার এই দুরবস্থা সম্পর্কে হাতিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. সাঈদ এজাজুর রহমান জানিয়েছেন, নিঝুমদ্বীপে হাসপাতাল স্থাপনের বিষয়ে কাজ চলমান রয়েছে। ঢালচর, চর গাসিয়াসহ অন্যান্য চরাঞ্চলের মানুষের স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট ও ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
নোয়াখালীর সিভিল সার্জন ডা. আনোয়ার হোসেনও জানিয়েছেন, নিঝুমদ্বীপ, ঢালচর ও চর গাসিয়াসহ হাতিয়ার জনবহুল দুর্গম চরাঞ্চলে স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা চলছে। এ বিষয়ে যাচাই-বাছাই কার্যক্রমও এগিয়ে নেওয়া হচ্ছে।







