গৌরবের ভবনে অবহেলার ছাপ

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
যাদের আত্মত্যাগে স্বাধীন হয়েছে বাংলাদেশ, তাদের সম্মানে নির্মিত ভবনটিই পড়ে আছে চরম অবহেলায়। গায়ে বয়ে বেড়াচ্ছে ভাঙচুরের ক্ষত। কুমিল্লার মনোহরগঞ্জ উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স। বীর মুক্তিযোদ্ধাদের পদচারণে মুখর হওয়ার কথা ছিল ভবনটি। তবে বাস্তবে জানালার কাচ ভাঙা, লোহার গ্রিল ক্ষতিগ্রস্ত, উদ্বোধনী ফলক বিকৃত। দেয়ালে শেওলা, এমনকি খসে পড়ছে প্লাস্টার। আগাছায় ঢেকে আছে চারপাশ। উদ্বোধনের মাত্র তিন বছরের মধ্যেই জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য নির্মিত এ ভবনটি।
মুক্তিযোদ্ধারা বলছেন, নিয়মিত রক্ষণাবেক্ষণের অভাব ও ভাঙচুরের কারণে ভবনটির এমন দশা। বিশেষ করে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট দুষ্কৃতকারীরা কমপ্লেক্সটিতে ব্যাপক ভাঙচুর করে। ভেঙে ফেলে ভবনের বিভিন্ন তলার লোহার গ্রিল ও জানালার কাচ। অনেক স্থানে জানালার অ্যালুমিনিয়াম ফ্রেম আলগা হয়ে ঝুলছে, যা নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক হুমকি সৃষ্টি করছে। নিয়মিত দেখভাল ও রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে ভবনের বাইরের দেয়ালে জমেছে শেওলার স্তর, প্লাস্টার খসে পড়ছে এবং রঙের উজ্জ্বলতা হারিয়ে ভবনে নেমে এসেছে ভুতুড়ে পরিবেশ। চারপাশের সীমানাপ্রাচীর ও প্রবেশপথ জঙ্গল ও লতাপাতায় ঢেকে গেছে।
সরেজমিন দেখা গেছে, ভবনের প্রবেশদ্বারে স্থাপিত মার্বেল পাথরের উদ্বোধনী ফলকে কালো কালি লেপে বিকৃত করা হয়েছে। ফলকের চারপাশের অংশও ক্ষতিগ্রস্ত। ভবনের বিভিন্ন তলার জানালার কাচ ও সুরক্ষামূলক লোহার গ্রিল ভাঙা। কোথাও কোথাও জানালার অ্যালুমিনিয়ামের ফ্রেম আলগা হয়ে ঝুলছে। এতে ভবনটির নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, শুধু জানালা ও নামফলক নয়, ভবনের সার্বিক অবকাঠামোর অবস্থাও নাজুক। দীর্ঘদিন নিয়মিত পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা ও রক্ষণাবেক্ষণ না করায় বাইরের দেয়ালে শেওলা জমেছে, বিভিন্ন স্থানে প্লাস্টার খসে পড়েছে এবং রঙ বিবর্ণ হয়ে গেছে। সরকারি অর্থে নির্মিত গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাটি তার স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও ব্যবহার উপযোগিতা হারাচ্ছে।
মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ভবনটি নির্মাণ করে। ২০২৩ সালের ২৬ অক্টোবর আনুষ্ঠানিকভাবে এর উদ্বোধন করা হয়।
তবে বীর মুক্তিযোদ্ধাদের স্মৃতি সংরক্ষণ, তাদের কল্যাণমূলক কার্যক্রম পরিচালনা এবং তাদের জন্য একটি উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার উদ্দেশ্যে নির্মিত ভবনটির এমন অবস্থা স্থানীয়দের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। উদ্বোধনের কয়েক বছরের মধ্যেই ভবনটির বিভিন্ন অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় এর যথাযথ তদারকি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
ভবনটির এমন অবস্থা দেখে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন মুক্তিযোদ্ধারাও। বীর মুক্তিযোদ্ধা মোখলেছুর রহমান মজুমদারের ভাষায়, যাদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে বাংলাদেশ স্বাধীন হয়েছে, তাদের স্মরণে নির্মিত ভবনের এমন দুরবস্থা অত্যন্ত বেদনাদায়ক। উদ্বোধনের অল্প কয়েক বছরের মধ্যেই ভবনটি অবহেলা ও ভাঙচুরে ধ্বংসের মুখে পড়েছে। তিনি ভাঙচুরের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের শনাক্ত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি দ্রুত সংস্কারের দাবি জানিয়েছেন।
ভবনটির ক্ষয়ক্ষতি ও সংস্কারের বিষয়ে মনোহরগঞ্জ উপজেলা প্রকৌশলী (এলজিইডি) মো. কামাল উদ্দিন বললেন, ‘মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনটি এলজিইডির তত্ত্বাবধানে নির্মিত হলেও হস্তান্তরের পর নিয়মিত দেখভালের অভাবে জানালার কাচ, গ্রিল ও সীমানাপ্রাচীর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ক্ষয়ক্ষতির বর্তমান অবস্থা সরেজমিনে পরিদর্শন করে সংস্কারের প্রাক্কলন তৈরি করা হচ্ছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় বাজেট বরাদ্দ পাওয়া গেলে দ্রুত সংস্কারকাজ শুরু করা হবে।
বীর মুক্তিযোদ্ধারাও ভবনটি দ্রুত সংস্কার করে ব্যবহার উপযোগী করার দাবি জানিয়েছেন। তাদের মতে, শুধু এককালীন সংস্কার নয়, ভবনটির নিয়মিত পরিচর্যা, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা ও দায়িত্বশীল তদারকি নিশ্চিত করাও জরুরি। অন্যথায় সরকারি অর্থে নির্মিত এই গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা আবারও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকবে।
যদিও ভবনটির সুরক্ষা ও জরাজীর্ণ অবস্থা নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে উপজেলা প্রশাসন। মনোহরগঞ্জ উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) উম্মে সালমা বলেছেন, ‘উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করে মুক্তিযোদ্ধা কমপ্লেক্স ভবনটির সংস্কার ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’




