কাপাসিয়া-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কের ৪৫ বাঁক যেন মৃত্যুফাঁদ

ছবি: আগামীর সময়
গাজীপুরের কাপাসিয়ায় একের পর এক ঝুঁকিপূর্ণ বাঁক দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে তুলেছে। বাঁকের মুখে গতি কমানোর পরিবর্তে বেপরোয়া ওভারটেকিং, বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহনকে পর্যাপ্ত জায়গা না দেওয়া এবং সরু দুই লেনের সড়কে অতিরিক্ত যানবাহনের চাপ সব মিলিয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে সড়কটি। বিশেষ করে কিশোরগঞ্জ থেকে ঢাকাগামী সিএনজি অটোরিকশার চালকদের দ্রুতগতিতে চালানো ও ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিংয়ের অভিযোগ করছেন স্থানীয়রা।
টোক থানার ঘাট থেকে রাজেন্দ্রপুর চৌরাস্তা পর্যন্ত প্রায় ৪৫ কিলোমিটার সড়কে স্থানীয়ভাবে গণনা করে ছোট-বড় মিলিয়ে ৪৫টি বাঁক চিহ্নিত করা হয়েছে। এর মধ্যে কয়েকটি বাঁকে বিপরীত দিক থেকে আসা যানবাহন আগে থেকে দেখা যায় না। ফলে বাঁকের মুখে ওভারটেকিং করলে মুহূর্তেই মুখোমুখি সংঘর্ষের আশঙ্কা তৈরি হয়।
তবে সব বাঁককে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেনি সড়ক ও জনপথ বিভাগ (সওজ)। গাজীপুর সড়ক বিভাগের লাগানো বিশেষ চিহ্নে কাপাসিয়া-টোক অংশে ২৫টি বাঁককে উচ্চঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। গত আগস্টে সড়ক সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের সময় এসব বাঁকে ঝোপঝাড় পরিষ্কার, রোড রিফ্লেক্টর পুনর্চিত্রায়ন ও গর্ত সংস্কারের কাজ করা হয়। পাশাপাশি ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতে সতর্কতামূলক চিহ্নও স্থাপন করা হয়েছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, অনেক চালক বাঁকের কাছে এসেও গতি কমান না। বরং সামনে থাকা ধীরগতির যানবাহনকে অতিক্রম করতে গিয়ে বিপরীত লেনে ঢুকে পড়েন। একই সময়ে বিপরীত দিক থেকে দ্রুতগতির বাস, ট্রাক কিংবা সিএনজি এলে চালকের হাতে নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার সময় থাকে না।
কাপাসিয়া-টোক-কিশোরগঞ্জ সড়কটি দীর্ঘদিন ধরেই সরু ও অতিরিক্ত যানবাহনের চাপের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে আলোচিত। ২০১৭ সালের একটি প্রতিবেদনে রাজেন্দ্রপুর-কাপাসিয়া-কিশোরগঞ্জ সড়ককে মাত্র ১৮ ফুট প্রশস্ত বলে উল্লেখ করে বিভিন্ন স্থানে তীব্র বাঁক ও দুর্ঘটনার ঝুঁকির কথা বলা হয়েছিল।
সাম্প্রতিক সময়েও সড়কটি প্রশস্ত করার উদ্যোগের কথা এসেছে। চলতি বছরের আগস্টে কটিয়াদী-পাকুন্দিয়া-টোক-কাপাসিয়া-রাজেন্দ্রপুর সড়ক চার লেনে উন্নীত করার বিষয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে নির্দেশ দেওয়ার খবর প্রকাশিত হয়েছে।
ঝুঁকির বাস্তব চিত্র দেখা গেছে শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকালেও। কাপাসিয়ার টোক ইউনিয়নের বীরউজলী বাজার এলাকায় ঢাকা-কিশোরগঞ্জ মহাসড়কে ডাম্পট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিকশার মুখোমুখি সংঘর্ষে আহত অবস্থায় অবস্থায় ছয়জনকে কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হলে দুজন নিহত হয়েছেন। আহত হয়েছেন আরও চারজন।
নিহতদের একজন শামীম মিয়া (৪৫)। তিনি সিএনজি অটোরিকশার চালক ছিলেন। অন্য নিহত ব্যক্তির পরিচয় তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি। দুর্ঘটনায় আহতদের কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় একজনের মৃত্যু হয়।
প্রাথমিকভাবে একজন নিহত ও পাঁচজন আহত হওয়ার তথ্য পাওয়া গেলেও পরে আহতদের একজনের মৃত্যু হওয়ায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে দুইজনে দাঁড়ায়।
সালনা হাইওয়ে থানার ওসি জানিয়েছেন, আগস্ট মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় সাতজন আহত ও দুজন নিহত হয়েছেন। এ সময়ে নিয়মিত মামলা হয়েছে দুটি।
সেপ্টেম্বর মাসে এ পর্যন্ত সড়ক দুর্ঘটনায় তিনজন নিহত ও ছয়জন আহত হয়েছেন। এ সময়ে নিয়মিত মামলা হয়েছে দুটি।
কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. হাবিবুর রহমান জানিয়েছেন, গত আগস্ট মাসে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে কাপাসিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ১৬০ জন ভর্তি হয়েছেন। এ সময়ে মারা গেছেন দুজন।
হাসপাতালের এই সংখ্যা পুলিশের হিসাবের সঙ্গে সরাসরি যোগ করার সুযোগ নেই। কারণ একটি দুর্ঘটনায় আহত একাধিক ব্যক্তি হাসপাতালে ভর্তি হতে পারেন। আবার কেউ কেউ অন্য হাসপাতালেও চিকিৎসা নিতে পারেন।
কাপাসিয়া ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স স্টেশনের ওয়ারহাউস ইন্সপেক্টর মাহফুজুর রহমান জানিয়েছেন, আগস্ট মাসে সড়কের দুটি পৃথক দুর্ঘটনায় দুজন আহত হয়েছেন। সেপ্টেম্বর মাসে দুটি পৃথক দুর্ঘটনায় নয়জন আহত হয়েছেন।
ঢাকা-কিশোরগঞ্জ রুটে নিয়মিত চলাচল করছে উজানভাটি, অনন্য, অনন্য ক্লাসিক ও জলসিঁড়ি পরিবহনের বাস। এ ছাড়া টোক থেকে গাজীপুর রুটে রাজদূত ও পথের সাথী এবং কাপাসিয়া থেকে সম্রাট পরিবহনের যানবাহন চলাচল করে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দুই লেনের এই সড়কে যাত্রীবাহী বাস, সিএনজি, ট্রাক, কাভার্ডভ্যান, মোটরসাইকেলসহ নানা ধরনের যানবাহন একসঙ্গে চলাচল করায় বাঁকগুলোতে ঝুঁকি আরও বেড়ে যায়। বিশেষ করে দ্রুতগতির বাস ও ছোট যানবাহন একই সময়ে বাঁকে প্রবেশ করলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের আগস্টের জাতীয় প্রতিবেদনে অতিরিক্ত গতি, যানবাহনের নিয়ন্ত্রণ হারানো, বেপরোয়া চালনা, চালকের অদক্ষতা, ত্রুটিপূর্ণ সড়ক ও দুর্বল ট্রাফিক ব্যবস্থাপনাকে দুর্ঘটনার অন্যতম কারণ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আগস্টে সারাদেশে ৫১৩টি সড়ক দুর্ঘটনায় ৪৮১ জন নিহত ও ৬৬৪ জন আহত হন।
কাপাসিয়ার এই সড়কের ক্ষেত্রেও স্থানীয়দের অভিযোগ বাঁকের আগে পর্যাপ্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা, গতি নিয়ন্ত্রণ, দৃশ্যমান সাইনবোর্ড ও ওভারটেকিং নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা না থাকায় ঝুঁকি থেকে যাচ্ছে।
গত এক মাসে কাপাসিয়া অংশে ঠিক কতটি দুর্ঘটনা ঘটেছে, কতজন নিহত ও আহত হয়েছেন—এর পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত সরকারি হিসাব প্রকাশ্যে পাওয়া যায়নি। অনলাইনে প্রকাশিত প্রতিবেদনগুলোতে বিচ্ছিন্নভাবে কয়েকটি দুর্ঘটনার তথ্য পাওয়া গেলেও সেগুলো দিয়ে এক মাসের মোট সংখ্যা নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।
স্থানীয় বাসিন্দারা ঝুঁকিপূর্ণ বাঁকগুলোতে সতর্কতামূলক সাইনবোর্ড স্থাপন, রোড মার্কিং ও রিফ্লেক্টর বসানো, বাঁকের মুখে গতি নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা, অতিরিক্ত ওভারটেকিং বন্ধে কার্যকর নজরদারি এবং সড়কের প্রয়োজনীয় অংশ প্রশস্ত করার দাবি জানিয়েছেন।




