এবার অপেক্ষা যশোরের খেজুরের রসের
- যশোরের যশ রক্ষায় নেই সরকারি উদ্যোগ

বেজে উঠছে শীতের আগমনী সুর। যশোরে গাছিদের হাতে প্রস্তুত হচ্ছে খেজুরগাছ। কয়েক দিন পরই সকালে গাছ থেকে নামবে রসের হাঁড়ি। তৈরি হবে সুস্বাদু গুড়। গ্রামবাংলার সেই চিরচেনা দৃশ্য ফিরে আসার অপেক্ষাতেই এখন দিন গুনছেন তারা। যশোরের যশ, খেজুরের রস— প্রবাদটি এখনো টিকে থাকলেও অস্তিত্ব সংকটে পড়েছে এই জনপদের হাজার বছরের পুরনো ঐতিহ্য। ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি মিললেও খেজুর গুড়ের উৎপাদন ও বাগান সম্প্রসারণে দৃশ্যমান কোনো সরকারি উদ্যোগ নেই। গত বছর যশোর জেলায় প্রায় ১২০ কোটি টাকার গুড় উৎপাদন হলেও পর্যাপ্ত গাছির অভাবে তা হুমকির মুখে। আছে নিপাহ ভাইরাসের আতঙ্ক। একদিকে গাছ উজাড় হওয়া, অন্যদিকে নতুন গাছি তৈরি না হওয়ায় ঐতিহ্যের এই রসাল শিল্প এখন সংকটে।
চৌগাছার দক্ষ গাছি আব্দুল আলীম। তিনি বাপ-দাদার পেশার হাল ধরেছেন। গত বছর ১১৭টি খেজুরগাছের রস থেকে তিনি গুড়-পাটালি তৈরি করেছিলেন। ৯০ হাজার টাকার গুড়-পাটালি বিক্রি করেছেন। গুড়ের মান ভালো হওয়ায় অর্ডারও পেতেন ভালো।
একই উপজেলার চাকলা গ্রামের মোস্তফা মণ্ডলের ছেলে তরুণ আবদুল কুদ্দুস বলছিলেন, দাদা হবিবর মণ্ডল খেজুরগাছের রস থেকে গুড়-পাটালি বিক্রি করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। একসময় দাদার সঙ্গে বাবাও যুক্ত ছিলেন। এখন দাদা বেঁচে নেই। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাবার পেশায় আমিও যুক্ত হয়েছি। আমরা মান ধরে রেখে ভোক্তার চাহিদা পূরণের চেষ্টা করি সবসময়।
যশোরে একমাত্র বাণিজ্যিক খেজুর বাগানের মালিক মামুন কাউছার জানিয়েছেন, এ খাতের উন্নয়নে সরকারি কোনো ভূমিকা নেই। এমনকি খেজুরগাছের জন্য কোনো প্রদর্শনী প্লট বা বাগান করা হয় না। ব্যক্তি ও প্রাকৃতিকভাবে এ বাগান গড়ে ওঠে। আর তা থেকে গাছিরা রস সংগ্রহ ও গুড় তৈরি করছেন। যশোরের খেজুরের গুড় বাংলাদেশের ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পাওয়ায় এই শিল্পে ভিন্নমাত্রা যোগ হয়েছে। অর্থনৈতিক সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হয়েছে। তবে বাজারে যে গুড় পাওয়া যায়, তা আদৌ ভেজালমুক্ত কি না, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। কারণ হিসেবে তিনি ব্যাখ্যা দেন— এক কেজি গুড় তৈরি করতে ১০ লিটার রসের প্রয়োজন। সে হিসাবে প্রতি কেজি গুড়ের বাণিজ্যিক খরচ প্রায় ১ হাজার ৩০০ টাকা। গত বছর তিনি প্রতি কেজি গুড় বিক্রি করেন ২ হাজার টাকা দরে। অথচ বাজারে ২৫০ টাকা কেজি দরেও গুড় পাওয়া যায়! এগুলো আদৌ খেজুরের গুড় না। ভেজালের ভিড়ে আসল গুড় উৎপাদনকারীরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন। সরকারও কোনো উদ্যোগ নেয় না। তা ছাড়া খেজুরের গুড় রপ্তানির কোনো অনুমোদন নেই।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য মতে, যশোরে রস আহরণ উপযোগী গাছের সংখ্যা ৩ লাখ ১২ হাজার ৯৬১টি। এসব গাছ থেকে এবার ৩ কোটি ৮৮ লাখ ৬ হাজার ৫৬৫ লিটার রস ও ৩ হাজার ৯০ টন গুড় উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা রয়েছে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের উপপরিচালক মোশাররফ হোসেন বললেন, খেজুর গুড়ের যেমন ঐতিহ্য রয়েছে, তেমনি অর্থনৈতিক সম্ভাবনাও রয়েছে। জিআই পণ্য হিসেবে নিরাপদ খেজুর রস ও গুড় উৎপাদনে গাছিদের পরামর্শ, প্রশিক্ষণও উঠান বৈঠকে উদ্বুদ্ধ করেছি। তবে গাছিদের কোনো অর্থ সহায়তা করা সম্ভব হয়নি।



