ইতালিতে ট্রিপল মার্ডার
একমাত্র ছেলে বেঁচে নেই, জানেন না মা

ছবি: আগামীর সময়
নোয়াখালীর কোম্পানীগঞ্জের বিজয়নগর গ্রামের জাহানারা বেগমের একমাত্র ছেলে কামাল উদ্দিন বাবুল। ইতালির রাজধানী রোমে এক নৃশংস হামলায় স্ত্রী ও পাঁচ বছরের মেয়েসহ নিহত হয়েছেন তিনি।
কিন্তু ৬০ বছর বয়সী জাহানারা বেগম এখনো জানেন না ছেলের মৃত্যুর খবর। তার শারীরিক অবস্থার কথা বিবেচনা করে সত্যটি গোপন রেখেছেন পরিবারের সদস্যরা।
তাকে বলা হয়েছে, ছেলে গুরুতর অসুস্থ হয়ে হাসপাতালে ভর্তি। তিনি এখনো প্রতীক্ষায়, তার বাবুল একদিন ফিরে আসবে।
গতকাল শনিবার বিকালে বিজয়নগর গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, শোকে স্তব্ধ পুরো পরিবার। ঘরে বসে বিলাপ করছেন জাহানারা বেগম। চোখের পানি মুছতে মুছতে তিনি বারবার বলছেন, ‘আমার বাবুল আবার আইবো, আমার বাবুলের কিছু হইব না।’
তার এই আকুতি শুনে কান্নায় ভেঙে পড়েন উপস্থিত আত্মীয়-স্বজনও। পরিবারের সদস্যরা জানিয়েছেন, সত্য জানালে মানসিকভাবে ভেঙে পড়তে পারেন বলেই এখনো মৃত্যুর খবর জানানো হয়নি তাকে।
স্থানীয়রা জানিয়েছে, ২০১০ সালে জীবিকার সন্ধানে ফুফাতো বোনের স্বামী আমিন উল্যার সহায়তায় ইতালিতে যান কামাল উদ্দিন বাবুল। বিদেশ যাওয়ার আগে বিয়ে করেন একই ইউনিয়নের মমতাজ বেগম আরজুকে। পরে তাদের সংসারে জন্ম হয় ছেলে অয়ন ও মেয়ে আরোয়া ইসলাম আরিশার।
দীর্ঘ প্রবাসজীবনের সংগ্রামে স্ত্রী-সন্তানদের নিয়ে ইতালিতে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন তিনি। পরিবারের আশা ছিল, কয়েক বছরের মধ্যে দেশে ফিরে বসবাস করবেন স্থায়ীভাবে। কিন্তু সেই স্বপ্ন ভেঙে যায় শুক্রবার রাতের মর্মান্তিক ঘটনায়।
ইতালির স্থানীয় সময় শুক্রবার রাত ৮টার দিকে রোমের পার্শ্ববর্তী ক্যাসালোত্তির ভিয়া মন্তিলিও এলাকায় হামলার ঘটনায় নিহত হন কামাল উদ্দিন বাবুল, তার স্ত্রী আরজু বেগম এবং পাঁচ বছর বয়সী কন্যা আরোয়া ইসলাম আরিশা। গুরুতর আহত হয় তাদের ছেলে অয়ন। সে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।
স্বজনদের দাবি, একই গ্রামের শাহাদাত হোসেনের সঙ্গে বাবুলের স্ত্রীকে কেন্দ্র করে দীর্ঘদিনের বিরোধের জেরেই এ হত্যাকাণ্ড ঘটে। দেশে থাকাকালীন সময় থেকেই আরজুর সঙ্গে শাহাদাতের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে পারিবারিক বিরোধ ছিল। পরে পরিস্থিতি সামাল দিতে বাবুল স্ত্রী-সন্তানদের ইতালিতে নিয়ে যান।
অন্যদিকে প্রায় চার বছর আগে যুক্তরাজ্যে যান শাহাদাত পরিবারসহ। পারিবারিক বিচ্ছেদের পর তিনি ইতালিতে যান বলে স্বজনদের দাবি।
স্বজনদের ভাষ্য, ঘটনার দিন পারিবারিক বিরোধ মীমাংসার উদ্দেশ্যে বাবুল, তার স্ত্রী ও সন্তানদের উপস্থিতিতে শাহাদাতের সঙ্গে একটি বৈঠক হয়। একপর্যায়ে তর্ক-বিতর্কের জেরে শাহাদাত ধারালো অস্ত্র নিয়ে হামলা চালান। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন বাবুল, তার স্ত্রী ও কন্যা। আহত অয়ন প্রাণ বাঁচাতে পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়।
স্বজনদের অভিযোগ, ঘটনার পর শাহাদাত হোসেন তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি স্ট্যাটাস দেন। সেখানে লেখা ছিল, ‘একজন মানুষ শুধু নিজে একা মরে না, নিজেও মরে অন্যকেও মরার মতো করে রেখে যায়। তাই মরার সময় প্রিয়জনদেরও সঙ্গে নিয়ে মরা উচিত। তাতে কারও জন্য কাউকে কষ্ট পেতে হয় না।’
গতকাল শনিবার শাহাদাতের ছবি প্রকাশ করেছে ইতালির আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। ট্রিপল মার্ডার মামলার প্রধান সন্দেহভাজন হিসেবে চিহ্নিতও করা হয়েছে তাকে। অবস্থান সম্পর্কে তথ্য দিতে আহ্বান জানানো হয়েছে জনসাধারণের প্রতি।
শাহাদাতের বড় ভাই, সৌদি আরবপ্রবাসী ইসমাইল হোসেন হারুন জানিয়েছেন, প্রায় চার বছর আগে সব সম্পত্তি বিক্রি করে পরিবারসহ যুক্তরাজ্যে চলে যান শাহাদাত। এরপর থেকে পরিবারের সঙ্গে তার তেমন যোগাযোগ ছিল না। দুই মাস আগে দেশে এলেও কোনো কথা হয়নি তার সঙ্গে।
নিহত বাবুলের বাবা সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, প্রায় এক বছর আগে দেশে এলে তার ছেলেকে হত্যার হুমকি দিয়ে পাঠানো হয়েছিল একটি উড়ো চিঠি। বিষয়টি মৌখিকভাবে জানানো হয়েছিল কোম্পানীগঞ্জ থানাকে।
তার ভাষ্য, ‘আমরা তখনও ভয় পেয়েছিলাম। কিন্তু ভাবিনি, আমার ছেলেকে এভাবে হারাতে হবে।’
ইতালীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, শুক্রবার রাতে পার্কসংলগ্ন এলাকা থেকে চিৎকারের শব্দ শুনে স্থানীয়রা পুলিশে খবর দেন। পরে পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে তিনটি মরদেহ উদ্ধার করে। তদন্ত কর্মকর্তাদের প্রাথমিক ধারণা, ধারালো অস্ত্রের আঘাতে তাদের হত্যা করা হয়েছে।
কোম্পানীগঞ্জ থানার ওসি মো. নুরুল হাকিম আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, তৎকালীন সময়ে ভুক্তভোগী পরিবার মৌখিকভাবে বিষয়টি পুলিশকে জানিয়েছিল। এরপর নিয়মিত টহলের মাধ্যমে তাদের নিরাপত্তার বিষয়টি পর্যবেক্ষণ করা হয়েছিল।





