ইউরোপের আগেই মুঘলদের ছিল বিস্তৃত সংবাদ নেটওয়ার্ক

১৭৭৫ সালের এই চিত্রকর্মে পালকিতে বহন করা অবস্থায় দেখা যাচ্ছে মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেবকে। ভারতীয় ইতিহাসে তার শাসনকাল এখনো সবচেয়ে আলোচিত ও বিতর্কিত অধ্যায়গুলোর একটি। ছবি: বিবিসি
সপ্তদশ শতাব্দীর মুঘল ভারত। তখনও আধুনিক সংবাদপত্রের স্বপ্ন দেখছে ইউরোপ। অথচ সেসময় দিল্লির দরবার থেকে সুদূর প্রান্তর পর্যন্ত ছড়িয়ে ছিল আখবারাতের জাল। ফারসি ভাষায় নিয়মিত খবর আসত দরবারে। ছোট ছোট প্রতিবেদন—যুদ্ধের খবর, দরবারের ষড়যন্ত্র, নতুন নিয়োগ, এমনকি গুঞ্জনও।
হাজার হাজার লেখক, গুপ্তচর ও সচিব লিখে চলেছেন দিনরাত। তাদের হাতের সেই কাগজগুলোই ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের প্রাণ।
আজ প্রায় চারশ বছর পর, সেই পাতাগুলো খুলে বসেছেন এক ইতিহাসবিদ। আর আবিষ্কার করছেন এক অচেনা ভারতের গল্প।
এই প্রতিবেদনগুলো আছে কলকাতা, লন্ডন, বিকানের ও সিতামউতে। কলকাতার ন্যাশনাল লাইব্রেরিতে রয়েছে সবচেয়ে বড় সংগ্রহ। সেখানে ২১টি খণ্ড রয়েছে আওরঙ্গজেবের আমলের।
আখবারাত ছিল মুঘল আমলের ফারসি ভাষার সরকারি সংবাদ প্রতিবেদন বা নিউজলেটার। এতে রাজদরবারের দৈনন্দিন ঘটনা, প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত, সামরিক অভিযানসহ গুরুত্বপূর্ণ তথ্য লিপিবদ্ধ করা হতো। আখবার বা খবর শব্দের বহুবচন আখবারাত।
ষোড়শ শতকের শেষভাগ থেকে আখবারাত নামে সংক্ষিপ্ত সংবাদ প্রতিবেদন প্রস্তুত করত মুঘল সাম্রাজ্যে লেখক, গুপ্তচর, প্রতিনিধি ও সচিবদের একটি বিশাল নেটওয়ার্ক।
এসব প্রতিবেদনে থাকত রাজদরবারের রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ, সামরিক অভিযান, প্রশাসনিক নিয়োগ, অর্থনৈতিক তথ্য এবং নানা ধরনের গুঞ্জন ও অভ্যন্তরীণ খবর।
ফারসি ভাষায় ভঙ্গুর কাগজে দ্রুত হাতে লেখা এসব প্রতিবেদন ছিল একাধারে গোয়েন্দা তথ্য, সরকারি নির্দেশনা ও সংবাদ বুলেটিনের সমন্বয়।
প্রতিদিন শত শত, এমনকি হাজার হাজার আখবারাত দিল্লির সম্রাটের দরবার থেকে পৌঁছে যেত প্রাদেশিক প্রশাসনের বিভিন্ন কেন্দ্রে। অনেক ক্ষেত্রে সেগুলো কর্মকর্তাদের সামনে উচ্চস্বরে পড়ে শোনানো হতো। যাতে সাম্রাজ্যের প্রত্যন্ত অঞ্চল পর্যন্ত পৌঁছে যায় রাজধানীর খবর।
দীর্ঘদিন ধরে ভারত ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন গ্রন্থাগার ও সংরক্ষণাগারে এসব নথি, প্রশাসনিক আদেশ এবং সংবাদপত্র সংরক্ষিত থাকলেও সেগুলো নিয়ে গভীর গবেষণা করেছেন খুব কম ইতিহাসবিদই।
প্রায় দুই দশক ধরে সেই কাজই করে চলেছেন যুক্তরাষ্ট্রের ক্যালিফোর্নিয়া বিশ্ববিদ্যালয়, বার্কলির ইতিহাসবিদ মুনিস ডি. ফারুকি।
২০০৭ সালে তিনি ‘আখবারাত-ই দরবার-ই মুয়াল্লা’ বা সম্রাটের দরবারের সংবাদপত্র নামে পরিচিত বিশাল সংগ্রহ নিয়ে শুরু করেন গবেষণা। ভারত ও যুক্তরাজ্যের বিভিন্ন সংরক্ষণাগারে ছড়িয়ে থাকা এই নথির মধ্যে কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে সংরক্ষিত ৬ হাজার ৫০০ পৃষ্ঠারও বেশি দলিল পর্যালোচনা করেন তিনি।
গবেষণার সময় তিনি রাজপুত্র, সেনাপতি, দরবারি, রাজপরিবারের নারী সদস্য, খোজা কর্মকর্তা এবং সাম্রাজ্যের বহু গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তির কর্মকাণ্ড অনুসরণ করেন হাজার হাজার প্রতিবেদনের মাধ্যমে।
এই দীর্ঘ গবেষণার ফল হিসেবে তিনি মুঘল সম্রাট আওরঙ্গজেব এবং সপ্তদশ শতকের শেষভাগের মুঘল সাম্রাজ্য নিয়ে একটি নতুন ইতিহাসগ্রন্থ প্রকাশ করতে যাচ্ছেন।
বইটি শুধু আওরঙ্গজেবের নতুন মূল্যায়নই নয়, বরং বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ প্রাক-আধুনিক সাম্রাজ্যের প্রশাসনিক কাঠামো ও কার্যপ্রণালিরও বিরল চিত্র তুলে ধরবে।
আখবারাতের অন্তত চারটি বড় সংগ্রহের অস্তিত্ব জানা গেছে। সেগুলো সংরক্ষিত রয়েছে লন্ডন, বিকানের, সিতামাউ এবং কলকাতায়। গবেষকদের ধারণা, ব্যক্তিগত সংগ্রহেও থাকতে পারে আরও কিছু নথি।
একটি সংগ্রহ দীর্ঘদিন সংরক্ষিত ছিল জয়পুর দুর্গের শীতল ও শুষ্ক ভূগর্ভস্থ কক্ষে। উনিশ শতকের শুরুতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির কর্মকর্তা ও প্রাচ্যবিদ জেমস টড এসব নথির একটি বড় অংশ ধার নিয়ে ১৮২৩ সালে ইংল্যান্ডে চলে যান এবং আর ফেরত দেননি। পরে তিনি সেগুলো দান করেন রয়্যাল এশিয়াটিক সোসাইটির গ্রন্থাগারে।
সবচেয়ে সমৃদ্ধ সংগ্রহটি রয়েছে কলকাতার জাতীয় গ্রন্থাগারে। এতে সংরক্ষিত আছে আওরঙ্গজেবের ১৬৫৮ থেকে ১৭০৭ সাল পর্যন্ত শাসনামলের ২১ খণ্ড নথি। এগুলো একসময় ছিল ভারতের প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ স্যার যদুনাথ সরকারের ব্যক্তিগত সংগ্রহের অংশ। যদুনাথ সরকারকে বিবেচনা করা হয় আওরঙ্গজেবের সবচেয়ে প্রভাবশালী জীবনীকারদের একজন হিসেবে।
প্রথম দেখায় খুব সাধারণ মনে হয় এসব নথির অনেক তথ্যই। নিয়োগ, বিরোধ, সামরিক চলাচল, উপহার, অসুস্থতাসহ সেখানে বেশি স্থান পেয়েছে প্রশাসনিক খুঁটিনাটি বিষয়ই।
কিন্তু ফারুকির মতে, সবগুলো একসঙ্গে বিশ্লেষণ করলে এগুলো এমন একটি সাম্রাজ্যের ধারাবাহিক দলিল হয়ে ওঠে, যা প্রতিনিয়ত পর্যবেক্ষণ করছিল নিজেকেই।
আওরঙ্গজেবের শাসনের প্রথম দুই দশকের নথি তুলনামূলকভাবে কম পাওয়া গেলেও ১৬৮০-এর দশকের শুরু থেকে প্রায় প্রতিদিনের ধারাবাহিক প্রতিবেদন আছে সংরক্ষিত। ফলে তার প্রায় অর্ধশতকের শাসনামলের এক-তৃতীয়াংশ সময় সম্পর্কে প্রায় প্রতিদিনের তথ্য পাচ্ছেন গবেষকরা।
দীর্ঘদিন ধরেই মুঘল সাম্রাজ্যের শেষ পর্যায়ের ইতিহাস নিয়ে গবেষণা করছেন ফারুকি। তখন সাম্রাজ্য ভৌগোলিকভাবে সর্বোচ্চ বিস্তার লাভ করলেও ধীরে ধীরে এগোচ্ছিল পতনের দিকেও। যা পরে তৈরি করে দেয় ব্রিটিশ শাসনের পথ।
তার ভাষায়, ‘আখবারাত নিয়ে কাজ করার পুরো অভিজ্ঞতাই ছিল একের পর এক বিস্ময়ের। সেই সময়ের তথ্য সংগ্রহ ও আদান-প্রদানের নেটওয়ার্ক কতটা বিস্তৃত ছিল, তা আজও আমাকে মুগ্ধ করে।’
তিনি যে আখবারাত নিয়ে কাজ করেছেন, সেগুলো মূলত প্রস্তুত করা হতো জয়পুরের রাজার জন্য। তবে তার ধারণা, সাম্রাজ্যের শত শত অভিজাত, রাজপুত্র ও কর্মকর্তা নিয়মিত পেতেন একই ধরনের সংবাদ প্রতিবেদন। ফলে এটি ছিল প্রাক-আধুনিক বিশ্বের অন্যতম উন্নত তথ্য বিনিময় ব্যবস্থা।
ফারুকির মতে, মুঘল প্রশাসন তার বিশাল সাম্রাজ্য সম্পর্কে সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিল বিস্ময়কর পরিমাণ তথ্য। যদিও সেই তথ্য কতটা কার্যকরভাবে ব্যবহার করা হয়েছে, তা ভিন্ন প্রশ্ন। তবে এই তথ্যব্যবস্থা প্রভাব ফেলেছিল কোটি কোটি মানুষের জীবনে ইতিবাচক ও নেতিবাচক দুধরনের।
গবেষণার সময় আখবারাতের তথ্য বদলে দেয় তার বহু প্রচলিত ধারণাও।
তিনি জানান, আওরঙ্গজেবের আমলে ব্যাপক ধর্মান্তরের যে ধারণা প্রচলিত, তার পক্ষে খুব বেশি প্রমাণ পাওয়া যায়নি এসব নথিতে। একইভাবে রাজপ্রাসাদের হারেম ও খোজা কর্মকর্তাদের রাজনৈতিক প্রভাবও ইতিহাসে যতটা গুরুত্ব পেয়েছে, বাস্তবে তা ছিল আরও বেশি।
ফারুকির পর্যবেক্ষণে, আওরঙ্গজেব প্রচলিত ধারণার তুলনায় অনেক কম দূরত্ব বজায় রাখা ও কম কঠোর স্বভাবের শাসক ছিলেন।
এ ছাড়া শিখ সম্প্রদায় সম্পর্কে তার দরবারে প্রত্যাশিত মাত্রায় পাওয়া যায়নি বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যও। যদিও শিখ ঐতিহ্যে দীর্ঘদিন ধরে আওরঙ্গজেবকে দায়ী করা হয়ে থাকে তাদের ধর্মীয় নেতাদের ওপর নির্যাতনের জন্য।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আবিষ্কারগুলোর একটি ছিল আওরঙ্গজেবের কন্যা জিনাত-উন-নিসাকে ঘিরে।
ইতিহাসবিদরা তার নাম জানলেও খুব কমই লিখেছেন দরবারে তার প্রকৃত রাজনৈতিক ভূমিকা সম্পর্কে। কিন্তু আখবারাতের পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা জুড়ে বারবার উঠে এসেছে তার নাম।
অল্প সময়ের মধ্যেই ফারুকি বুঝতে পারেন, তিনি কোনো সাধারণ রাজকন্যা নন। বরং জীবনের শেষদিকে বয়সী ও রাজনৈতিকভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে থাকা আওরঙ্গজেবের অন্যতম শক্তিশালী সহায়ক ছিলেন তিনি। পরে মুঘল হারেম নিয়ে নিজের গবেষণায় জিনাত-উন-নিসাকে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দেন ফারুকি।
তিনি জানান, আখবারাতের প্রতিটি নতুন তথ্য তাকে বাধ্য করেছে মুঘল ইতিহাস সম্পর্কে নিজের বহু পুরোনো ধারণা নতুন করে ভাবতে। তার মতে, এসব নথি শুধু আওরঙ্গজেব নয়, পুরো মুঘল সাম্রাজ্যকে নতুনভাবে মূল্যায়নের সুযোগ এনে দিয়েছে।
তাহলে এত গুরুত্বপূর্ণ নথি নিয়ে এতদিন গবেষণা কম হয়েছে কেন?
ফারুকির মতে, কারণটি সহজ। বিশাল এই সংরক্ষণাগারে নেই কোনো সূচিপত্র। হাজার হাজার প্রতিবেদনের মধ্যে প্রয়োজনীয় তথ্য খুঁজে বের করা অনেকটা খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজার মতো কঠিন।
তিনি নিজেও কর্মজীবনের শুরুতে আরেকটি বিশাল মুঘল সংরক্ষণাগারে সাত সপ্তাহ কাজ করে ফিরে এসেছিলেন হতাশ হয়ে। সেই অভিজ্ঞতার কারণে প্রায় এক দশক দূরে ছিলেন এমন বিশাল নথিপত্র থেকে।
ফারুকির মতে, আওরঙ্গজেবকে ঘিরে এখনো নতুন নতুন বিতর্কের অন্যতম কারণ হলো বিপুল পরিমাণ দলিল সংরক্ষিত রয়েছে তার শাসনামল সম্পর্কে।
আগের মুঘল সম্রাটদের তুলনায় আওরঙ্গজেবের সময় প্রশাসনিক নথি, ব্যক্তিগত চিঠিপত্র, আঞ্চলিক ইতিহাস, জীবনী, কবিতা, ইউরোপীয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের দলিল এবং অনেক বেশি পাওয়া যায় বিদেশি ভ্রমণকারীদের বিবরণও।
তার ভাষায়, আখবারাত এই বিশাল ভাণ্ডারের মাত্র একটি অংশ। এখনো অসংখ্য মূল্যবান দলিল অপেক্ষায় রয়েছে গবেষণার।
ফারুকি স্মরণ করেন, কলকাতায় প্রথম খণ্ডের প্রথম পৃষ্ঠা খুলেই তিনি বুঝেছিলেন, এটি একটি অসাধারণ ঐতিহাসিক সম্পদ। প্রথম পৃষ্ঠাতেই এমন অনেক ঘটনার সূত্র খুঁজে পান, যেগুলো দীর্ঘদিন ইতিহাসে উপেক্ষিত ছিল কিংবা আলোচিত হয়েছে খুব সামান্য।
তিনি মনে করেন, তার আসন্ন বইয়ে তুলে ধরা সম্ভব হয়েছে সেই সম্ভাবনার খুব অল্প অংশই। এই বিশাল সংরক্ষণাগারে এখনো লুকিয়ে আছে অসংখ্য গল্প ও নতুন ইতিহাস। যা অপেক্ষা করছে ভবিষ্যতের গবেষকদের জন্য।
সূত্র: বিবিসি








