সংস্কৃতি আঙিনা যেন ‘ভূতের বাড়ি’
- ব্যয় ৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা
- ৮ বছরেও দেখেনি আলোর মুখ
- অযত্নে নষ্ট হচ্ছে ভবন-সরঞ্জাম
- মেলেনি বরাদ্দ, হয়নি নিয়োগও

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
উত্তরের জেলা দিনাজপুরে বসবাস সাঁওতাল, ওড়াওঁ, রাজবংশীসহ বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর। জেলার ইতিহাস-ঐতিহ্যের সঙ্গে এসব সম্প্রদায়ের মানুষের রয়েছে নিবিড় সম্পর্ক। তাই সময়ের সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে এ জনগোষ্ঠীর সংখ্যা। ২০২২ সালে হওয়া জনশুমারি অনুযায়ী জেলায় ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংখ্যা ৫২ হাজার ৯৩৯ জন। তবে খাতা-কলমের হিসাব পেরিয়ে এ সংখ্যা বেড়েছে কয়েক গুণ।
বৃহৎ এই গোষ্ঠীর মানুষের ইতিহাস-ঐতিহ্য লালন এবং সংস্কৃতি ও ভাষাচর্চায় ২০১৮ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ‘দিনাজপুর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমি’। এতে সরকারের ব্যয় হয়েছে ৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা। এত টাকা ব্যয়ে নির্মিত একাডেমিটি আলোর মুখ দেখেনি উদ্বোধনের আট বছরেও। দৃষ্টিনন্দন অবকাঠামো থাকলেও নেই কোনো কার্যক্রম। অস্থায়ী ভিত্তিতে দুজন কর্মচারী থাকলেও সেখানে গিয়ে দেখা মেলেনি তাদের।
যেখানে সাংস্কৃতিককর্মীদের পদচারণায় মুখরিত থাকার কথা, সেখানে এখন বিরাজ করছে সুনসান নীরবতা। প্রতিষ্ঠানের এমন দশায় ক্ষোভ জানিয়েছেন আদিবাসী সংগঠনের নেতারা।
সম্প্রতি সদর উপজেলার মীর্জাপুর সুইহারী সরকারি কলেজ মোড়ের এই সাংস্কৃতিক একাডেমিতে গিয়ে দেখা যায়, পুরো একাডেমি ভরে গেছে ঝোপঝাড়ে। ভবনের অনেক জায়গায় ধরেছে ফাটল। নষ্ট হয়েছে লাইট, ভেঙে গেছে জানালার কাচ। মরিচা পড়েছে ভবনে। দীর্ঘদিন ঝোপঝাড় পরিষ্কার না করায় তৈরি হয়েছে ভুতুড়ে পরিবেশ। গত বছরের জুলাইতে চুক্তিভিত্তিক পরিচালক নিয়োগ পেলেও কয়েক দিন গিয়েও দেখা মেলেনি তার।
জানা যায়, সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে দেশের সমতলে বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সম্প্রদায়ের সংস্কৃতির প্রচার, প্রসার, ভাষা এবং তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের উন্নয়ন ও সংরক্ষণের লক্ষ্যে ২০১৫ সালের ১৬ এপ্রিল দিনাজপুর ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী সাংস্কৃতিক একাডেমির ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়। ২০১৮ সালের ১ নভেম্বর ৭ কোটি ৮১ লাখ টাকা ব্যয়ে সদর উপজেলার মীর্জাপুর সুইহারী সরকারি কলেজ মোড়ে উদ্বোধন করা হয় এই সাংস্কৃতিক একাডেমি। একাডেমিতে রয়েছে আধুনিক মঞ্চায়ন উপযোগী শব্দ, আলোক এবং অ্যাকোস্টিক ব্যবস্থাসহ ৩০০ আসনবিশিষ্ট একটি মিলনায়তন।
এ ছাড়া আছে ৫০০ আসনবিশিষ্ট মুক্তমঞ্চ ও একটি প্রশিক্ষণ ভবন। তবে উদ্বোধনের পর কোনোরকম কার্যক্রম না হওয়ায় নষ্ট হয়ে গেছে অনেক কিছুই। চুরি হয়ে গেছে পানির টিউবওয়েলটিও। উদ্বোধনের কিছুদিন পর সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় এটি হস্তান্তর করে শিল্পকলা একাডেমির কাছে। এরপর আর আলোর মুখ দেখেনি। বর্তমানে সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় অধীনে রয়েছে এটি। তবে উদ্বোধনের আট বছরেও নিয়োগ করা হয়নি কোনো স্থায়ী জনবল। গত বছরের জুলাইয়ে চুক্তিভিত্তিক পরিচালক নিয়োগ দেওয়া হলেও ফেরেনি গতি।
দিনাজপুর আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির সভাপতি লুকাস সরেণ হতাশা ব্যক্ত করে আগামীর সময়কে বলেছেন, ‘উদ্বোধনের পর এখন পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি পরিত্যক্ত। অনেক সময় আমরা নিজেদের অর্থায়নে একাডেমির ঝোপঝাড় পরিষ্কার করেছি। তবে অর্থ সংকটে এখন ভুতুড়ে অবস্থা। আশা করি, নতুন সরকার ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর কল্যাণে
একাডেমিটি চালু করবে। এতে আমাদের জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ভাষাচর্চাসহ নানা কর্মকাণ্ডে মুখরিত হবে।’
সার্বিক বিষয়ে কথা হয় সাংস্কৃতিক একাডেমির পরিচালক (চুক্তিভিত্তিক) মো. মামুনের সঙ্গে। তিনি আগামীর সময়কে বললেন, ‘গত বছরের জুলাইতে নিয়োগ পেয়েও এখন পর্যন্ত কোনো বেতন পাইনি। এমনকি একাডেমি চালুর জন্য কোনো অর্থও বরাদ্দ হয়নি। এজন্য বেহাল হয়ে পড়েছে। তবে নতুন অর্থবছরে একাডেমির জন্য ৩০ লাখ টাকা বরাদ্দ রাখা হয়েছে, এমনটিই জেনেছি। এই টাকা পেলে একাডেমিটি চালু করা যাবে।’
এই কর্মকর্তার মন্তব্য, ‘এটি চালু করা গেলে জেলায় বসবাসরত ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও ভাষাচর্চার দ্বার উন্মোচিত হবে। এর মাধ্যমে উপকৃত হবে দেশ ও জাতি।’





