কালীগঞ্জ
কফিনে ফিরল স্বপ্ন

কোলাজ : আগামীর সময়
যে তরুণকে দুই মাস আগে স্বপ্ন পূরণের আশায় স্পেনের পথে বিদায় জানিয়েছিল পরিবার, শুক্রবার সেই তরুণই ফিরলেন কফিনবন্দি হয়ে। বিমানবন্দর থেকে গ্রামের বাড়ি- পথ জুড়ে ছিল স্বজনদের কান্না। আর উত্তরগাঁওয়ে পৌঁছানোর পর শেষবারের মতো তাকে দেখতে ভিড় করেন প্রতিবেশী ও পরিচিতজনরা।
স্পেনের মাদ্রিদে অগ্নিকাণ্ডে নিহত বাংলাদেশি যুবক ইউসুফ হাসান আলিফের মরদেহ শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকালে দেশে পৌঁছেছে। সকাল ৬টা ৫৭ মিনিটে ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে তার মরদেহবাহী বিমান অবতরণ করে। নির্ধারিত সময়ের ২৩ মিনিট পর বিমানটি ঢাকায় পৌঁছায়।
বিমানবন্দরে স্বজনদের কাছে মরদেহ হস্তান্তরের পর সকাল সাড়ে ১০টার দিকে কফিন পৌঁছে যায় গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার ৭ নম্বর ওয়ার্ডের উত্তরগাঁও গ্রামের বাড়িতে। পরে বাদ জুমা উত্তরগাঁও উত্তরপাড়া জামে মসজিদে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয় ২৫ বছর বয়সী আলিফকে।
আলিফ কালীগঞ্জের উত্তরগাঁও এলাকার আব্দুল মোতালিব ও রহিমা খাতুন দম্পতির ছেলে। পরিবারের সচ্ছলতার স্বপ্নে মাত্র দুই মাস আগে পাড়ি দিয়েছিলেন স্পেনে। সেখানে ফুড ডেলিভারি রাইডার হিসেবে কাজ করছিলেন তিনি। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পর মৃত্যুর মাত্র দুই দিন আগে পেয়েছিলেন কাজের অনুমতিও।
কিন্তু কাজের অনুমতি পাওয়ার সেই আনন্দ স্থায়ী হয়নি। নতুন দেশে পা রাখার দুই মাসের মধ্যেই জীবনের শেষ অধ্যায় লিখে ফেলতে হয় মাদ্রিদের একটি সাইকেল গ্যারেজে।
গত ৩০ আগস্ট (রবিবার) স্থানীয় সময় সন্ধ্যা ৭টা ৩৭ মিনিটে মাদ্রিদের আরগানসুয়েলা এলাকার পালোস দে লা ফ্রন্তেরা এলাকার কাইয়ে কানারিয়াস সড়কের একটি সাইকেল গ্যারেজে ভয়াবহ আগুন লাগে।
আগুনের একপর্যায়ে গ্যারেজের ভেতরে আটকা পড়েন আলিফ। চারপাশে বিষাক্ত ধোঁয়া। শ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছিল। সেই অবস্থায় সহকর্মীদের সঙ্গে থাকা হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে তিনি লিখেছিলেন- আমাদের বাঁচান ভাই, দম বন্ধ হয়ে আসছে।
খবর পেয়ে মাদ্রিদ সিটি কাউন্সিলের ফায়ার সার্ভিসের ১৩টি ইউনিট ঘটনাস্থলে ছুটে যায়। দীর্ঘ চেষ্টায় আগুন নিয়ন্ত্রণে আনার পাশাপাশি গ্যারেজে জমে থাকা বিষাক্ত গ্যাস অপসারণ করা হয়। আগুন পুনরায় ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কায় সেখানে থাকা অন্যান্য ইলেকট্রিক বাইসাইকেলও বাইরে সরিয়ে নেওয়া হয়। পরে ঘটনাস্থলেই চিকিৎসকরা আলিফকে মৃত ঘোষণা করেন।
তার শরীরে বিষাক্ত ধোঁয়ার প্রভাব ও শ্বাসনালিতে মারাত্মক দাহ্য ক্ষত হয়েছিল বলে পারিবারিক ও স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে।
আলিফের মৃত্যুর পর প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটিতে নেমে আসে শোকের ছায়া। গত ৪ সেপ্টেম্বর মাদ্রিদের বায়তুল মোকাররম জামে মসজিদে প্রবাসী বাংলাদেশি কমিউনিটির উদ্যোগে তার জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। সেদিন স্বদেশি প্রবাসীরা কাঁধে তুলে নেন আলিফের নিথর দেহ।
এরপর আইনি সব প্রক্রিয়া ও আনুষ্ঠানিকতা শেষ করে ১০ সেপ্টেম্বর মাদ্রিদের স্থানীয় সময় সকাল ৭টা ৪০ মিনিটে টার্কিশ এয়ারলাইনসের টিকে-১৩৬০ ফ্লাইটে তার কফিনবন্দি মরদেহ ইস্তাম্বুলের উদ্দেশে রওনা হয়। ইস্তাম্বুল থেকে টিকে-৭৪২ ফ্লাইটে করে মরদেহ আসে বাংলাদেশের পথে।
শুক্রবার উত্তরগাঁওয়ে তার মরদেহ পৌঁছানোর পর স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। প্রতিবেশী ও পরিচিতদের চোখে ভাসছিল সদ্য বিদেশে পাড়ি দেওয়া তরুণটির মুখ। যে বাড়ি থেকে কয়েক মাস আগেই স্বপ্নের পথে বিদায় নিয়েছিলেন আলিফ, সেই বাড়িতেই এবার ফিরলেন শেষবারের মতো।
কালীগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাকির হোসেন বলেন, সকালে প্রবাসী বাংলাদেশি ইউসুফ হাসান আলিফের মরদেহ বাড়িতে পৌঁছেছে। জানাজা শেষে তাকে পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।



