৮৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিয়েও খোঁজ মিলছে না রাব্বির

রফিকুল ইসলাম রাব্বি - সংগৃহীত ছবি
পরিবারের স্বচ্ছলতার স্বপ্ন নিয়ে ইতালির পথে যাত্রা করেছিলেন মাদারীপুরের যুবক রফিকুল ইসলাম রাব্বি। কিন্তু সেই স্বপ্ন থেমে যায় লিবিয়ার একটি বন্দিশালায়। সেখানে আটকে রেখে তার ওপর চালানো হয় নির্মম নির্যাতন। নির্যাতনের ভিডিও পাঠানো হয় পরিবারের কাছে। ছেলের এমন অবস্থা দেখে ভেঙে পড়েন বাবা-মা। একপর্যায়ে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মারা যান দুজনই।
এরপরও থামেনি অর্থ আদায়ের খেলা। মুক্তিপণের নামে পরিবারের কাছ থেকে নেওয়া হয় প্রায় ৮৫ লাখ টাকা। তবুও মুক্তি মেলেনি রাব্বির। এক সপ্তাহ ধরে নিখোঁজ। আদৌ বেঁচে আছেন কিনা, সেটিও জানে না পরিবার।
মাদারীপুর সদর উপজেলার মধ্য খাগদী এলাকার বাসিন্দা রাব্বির ঘটনা এখন এলাকায় আলোচনার কেন্দ্রবিন্দু।
স্বজনদের অভিযোগ, মানবপাচারকারী চক্রের ফাঁদে পড়েছেন রফিকুল ইসলাম রাব্বি। বর্তমানে রয়েছেন জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।
পরিবার সূত্রে জানা গেছে, প্রায় দুবছর আগে উন্নত জীবনের আশায় ইতালির উদ্দেশে দেশ ছাড়েন রাব্বি। দালালদের মাধ্যমে তাকে ইতালি পাঠানোর কথা থাকলেও সরাসরি সেখানে না নিয়ে লিবিয়ায় আটকে রাখা হয়। এরপর শুরু হয় অমানবিক নির্যাতন। নির্যাতনের ভিডিও পাঠিয়ে পরিবারের কাছে বারবার দাবি করা হয় মুক্তিপণ।
স্বজনদের ভাষ্য, ছেলের আর্তনাদ ও নির্যাতনের দৃশ্য সহ্য করতে না পেরে প্রায় দেড় বছর আগে মারা যান বাবা জলিল বেপারী। একই কারণে ছয় মাস আগে মৃত্যুবরণ করেন মা মেহেরুন নেছা। এরপরও রাব্বিকে মুক্ত করার আশায় ভিটেমাটি বিক্রি করে এবং চড়া সুদে ঋণ নিয়ে বিভিন্ন সময়ে প্রায় ৮৫ লাখ টাকা পরিশোধ করে পরিবার। কিন্তু মুক্তি তো মেলেনি, গত এক সপ্তাহ ধরে তার কোনো খোঁজও পাওয়া যাচ্ছে না।
পরিবারের অভিযোগ, সদর উপজেলার কেন্দুয়া ইউনিয়নের তালতলা এলাকার আয়ুব আলী মাতুব্বরের ছেলে রিয়াজুল মাতুব্বর, তার শ্বশুর মধ্য খাগদী এলাকার জামাল ফকির এবং শাশুড়ি রোমানা বেগমের সঙ্গে বিদেশে পাঠানোর বিষয়ে চুক্তি হয়েছিল। পরে তাদের মাধ্যমেই রাব্বিকে লিবিয়ায় নিয়ে আটকে রেখে অর্থ আদায় করা হয়।
মঙ্গলবার দুপুরে রাব্বির সন্ধানে অভিযুক্তদের বাড়িতে যান স্বজনরা। সেখানে তারা কোনো সন্তোষজনক উত্তর পাননি বলে অভিযোগ করেছেন। তাদের দাবি, সংশ্লিষ্টরা বিভিন্ন প্রশ্নের জবাব এড়িয়ে গেছেন।
তিন ভাই ও এক বোনের মধ্যে রাব্বি সবার ছোট। তাকে ফিরে পাওয়ার আশায় সর্বস্ব হারিয়ে এখন নিঃস্ব পরিবার। ঋণের বোঝা, পাওনাদারদের চাপ এবং রাব্বির অনিশ্চিত পরিণতি নিয়ে চরম দুর্দশার মধ্যে দিন কাটছে স্বজনদের।
‘আমার ভাইকে জিম্মি করে মোট ৮৫ লাখ টাকা নিয়েছে। ভাইকে জীবিত ফেরত চাই। সেই সঙ্গে এ ঘটনার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক বিচার চাই’— কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলছিলেন রাব্বির বড় বোন তানজিলা আক্তার।
স্থানীয় বাসিন্দা সাগর বেপারী মন্তব্য করেন, বিদেশে লোক পাঠানোর কথা বলে প্রতারণার অভিযোগ দীর্ঘদিনের। এ ধরনের চক্রের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ভবিষ্যতেও অনেক পরিবার সর্বস্বান্ত হবে।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন রোমানা বেগম। তার দাবি, রফিকুল ইসলাম রাব্বি কোথায় এবং কার মাধ্যমে বিদেশে গেছেন, সে বিষয়ে তিনি কিছু জানেন না। অর্থ লেনদেনের বিষয়েও তার কোনো ধারণা নেই। তার জামাতা রিয়াজুল মাতুব্বর বর্তমানে ইতালিতে অবস্থান করছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
লিখিত অভিযোগ পেলে ব্যবস্থার নেওয়ার আশ্বাস দিলেন মাদারীপুরের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ফারিহা রফিক ভাবনা। বললেন, ‘এ বিষয়ে এখনো কোনো অভিযোগ পাইনি। পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে বিষয়টি সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে এবং ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধানে যাচাই-বাছাই চলছে।’







