‘বাসা থেকে রিয়া গোপের সব স্মৃতিচিহ্ন সরিয়ে ফেলা হয়েছে’

গণঅভ্যুত্থানে গুলিতে নিহত রিয়া গোপ— সংগৃহীত
নারায়ণগঞ্জ শহরের নয়ামাটির এস.এস রোডে হোসেয়ারি ব্যবসার দরুণ ব্যস্ততা আর কোলাহল মুখর। লোকেলোকারণ্য এলাকার পুরনো একটি ভবনের চারতলায় সন্তান হারানোর বেদনা বুকে নিয়ে অঝোরে কাঁদছেন এক মা।
কাঁদতে কাঁদতে ক্লান্ত হয়ে শান্ত হন হঠাৎ আবার চিৎকার করে কেঁদে ওঠে ঈশ্বরের কাছে সন্তানের ফিরে পাওয়ার আকুতি জানান। সাড়ে চার বছর সাধনার পর ২০১৯ সালে যে সন্তানকে ঈশ্বর বুকে দিয়েছিলেন, এক ঝটকায় চব্বিশে সেই সন্তানকে হারিয়ে পাগলপ্রায় এই মা। কারো কাছে সহযোগিতা চান না, বিচার চান না শুধু একটাই চাওয়া সন্তানকে ফিরে পাওয়া।
বলছিলাম, চব্বিশের বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নারায়ণগঞ্জের নয়ামাটিতে নিজ বাসার ছাদে গুলিতে নিহত ছয় বছর বয়সী রিয়া গোপের মা বিউটি ঘোষের কথা। গত দুই বছর কত কিছুই বদলেছে, কিন্তু সন্তান হারোনোর শোকে এখনো পাগলপ্রায় মা বিউটি ঘোষ। কোনোভাবেই ভুলতে পারছেন না একমাত্র সন্তান রিয়াকে। স্বামী-শ্বাশুড়ি আত্মীয়-স্বজন কেউই তাকে শান্ত করতে পারছেন না। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী বাসা থেকে শিশু রিয়া গোপের খেলনা, বই-ব্যাগ, জামাকাপড় ছবিসহ সব স্মৃতিচিহ্ন সরিয়ে ফেলা হয়েছে শুধুমাত্র মা বিউটি ঘোষকে বাঁচানোর জন্য। সন্তানের কথা মনে হলেই চিৎকার করে কাঁদতে থাকেন, ঈশ্বরের কাছে মিনতি করে নিজের সন্তানকে ফেরত চান।
কেমন আছে রিয়া গোপের মা তা জানতে বাসায় গেলে দেখা যায় সেই মায়ের সেই হৃদয় বিদারক আর্তনাদ। দরজায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে শুধু বললেন, ‘কিচ্ছু চাই না, বিচার চাই না, শুধু আমার সন্তানকে ফেরত চাই। শুধু একা থাকতে চান তিনি, ঈশ্বরের কাছে কাকুতি-মিনতি করে সন্তান রিয়াকে ফেরত পেতে চান।’ বললেন, ‘ভাই কি আর বলবো, আমার মেয়েটাকে কিছুতেই ভুলতে পারি না। কিভাবে ভুলি বলে অঝোরে কেঁদে ওঠেন রিয়ার মা বিউটি ঘোষ।’
রিয়ার দাদী বললেন, ‘রিয়াকে হারানোর পর থেকে সন্তানের শোকে দিশেহারা তাঁর পুত্রবধূ। অনেক সাধনার পর মেয়ে রিয়া জন্মেছিল। এক ঝটকায় সব শেষ হয়ে গেলো। পূত্রবধূকে শান্তনা দেয়ার কোন ভাষা নেই, তাকে বাঁচানোই এখন বড় বিষয়। ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী রিয়ার স্মৃতিচিহ্ন সব সরিয়ে ফেলা হয়েছে। বাসায়ও লোকসমাগম সীমিত করা হয়েছে, কেউ যাতে রিয়ার কথা মনে করিয়ে না দেয়। কিন্তু পারা যাচ্ছে না। কোন না কোনভাবেই রিয়ার বিষয় সামনে চলে আসে, এরপর অঝোরে চিৎকার করে সন্তানের জন্য দিনরাত কান্না করেন তার পূত্রবধূ।’
তিনি জানালেন, ছেলে দীপক কুমার ঘোষ একটা ছোট হোসেয়ারিতে চাকরি করেন, কাজে বাইরে থাকলে পূত্রবধূকে নিয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েন তিনি। আমরা কোন কিছুই চাই না, মেয়েটা (পূত্রবধূ) যেই অবস্থায় আছে, সেখান থেকে তাকে স্বাভাবিক করতে পারলেই আমরা খুশি। আমার পূত্রবধূকে স্বাভাবিক করে তোলার জন্য ডাক্তারের পরামর্শ মোতাবেক বাসা থেকে রিয়ার সব স্মৃতিচিহ্ন সরিয়ে রাখা হয়েছে।’
রিয়ার বাবা দীপক কুমার গোপ জানান, মেয়ের মা শোক কাটিয়ে উঠতে পারছে না, তাকে চিকিৎসা করানো হচ্ছে। তদন্ত, বিচার এসব নিয়ে কথা বলতে ইচ্ছা হয় না।
এদিকে রিয়া গোপ হত্যা মামলার তদন্ত ও অভিযোগপত্র দাখিলের কাজ সিআইডির ফরেনসিক রিপোর্টের জন্য থেমে আছে। কোন ধরনের অস্ত্রে ও গুলিতে শিশু রিয়া মারা গেছে সেটিও তদন্ত করা যায়নি। ২০২৪ সালের ১৯ জুলাই বৈষম্যবিরোধী ছাত্র-আন্দোলন চলার সময় নারায়ণগঞ্জ-৪ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য একেএম শামীম ওসমানের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীরা অস্ত্র হাতে মহড়া দিয়ে চাষাঢ়া থেকে দুই নম্বর রেলগেট এবং গুলশান সিনেমা হল পর্যন্ত এলোপাথাড়ি গুলি ছোঁড়ে। ওই সময় গুলশান সিনেমা হলের পেছনে বাসার ছাদে খেলতে গিয়ে মাথায় গুলিবিদ্ধ হন রিয়া।
গুরুতর আহত রিয়া ২০২৪ সালের ২৪ জুলাই চিকিৎসাধীন অবস্থায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যায়। পরিবারের কেউ মামলা না করায় এই ঘটনার ১২ মাস পর সদর মডেল থানার এসআই আবু রায়হান নূর বাদী হয়ে ২০২৫ সালের ১ জুলাই আওয়ামী লীগ ও এর অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মীসহ অজ্ঞাতনামা ১৫০-২০০ জনকে আসামি করে হত্যা মামলা দায়ের করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সদর মডেল থানার উপ-পরিদর্শক (এসআই) বিনয় বাড়ৈ জানান, সিআইডির ফরেনসিক রিপোর্টের জন্য চিঠি দেওয়া হয়েছে, এটি পেতে সময় লাগছে। রিয়ার মাথায় যে বুলেটটি বিদ্ধ হয়েছে সেটি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে (ঢামেক) সংরক্ষণ করা আছে। সেটি মামলার আলামত হিসেবে জব্দ করার জন্য ঢামেক কর্তৃপক্ষকেও চিঠি দেওয়া হয়েছে, বোর্ড বসেছে, দ্রুত সেটি পেয়ে যাব। ফরেনসিক রিপোর্ট পেলেই বোঝা যাবে, ঠিক কোন ধরনের অস্ত্র থেকে গুলি ছোঁড়া হয়েছে। মামলাটি অত্যন্ত সংবেদনশীল হওয়ায় প্রতিটি বিষয় আমরা পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখছি।’
নারায়ণগঞ্জের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (অপরাধ) তারেক আল মেহেদী জানান, গুরুত্বের সাথে এই মামলাটি আমরা তদন্ত করছি। ইতিমধ্যে এই মামলায় আমরা ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছি। ঘটনার ওই দিনের যেসকল ভিডিও ফুটেজ আমরা পেয়েছি, সেগুলো সিআইডিতে ফরেনসিক রিপোর্টের জন্য পাঠানো হয়েছে। সেটি পাওয়ার পর তদন্ত শেষে দ্রুত মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করতে পারবো।





