হাসপাতালই ঠিকানা হলো নাম-পরিচয়হীন নবজাতকের

হাসপাতালে ভর্তি শিশুটির পরিচর্যা করছেন এক নার্স
জন্মের পরেই নিজের সব পরিচয় হারিয়ে ফেলেছে ছোট্ট এক কন্যাশিশু। কে তার বাবা আর কে মা, কোথায় তার বাড়িঘর জানে না কেউ। তবে নাম-পরিচয়হীন শিশুটির আশ্রয় হয়েছে জামালপুর জেনারেল হাসপাতালে।
বাবা-মা না থাকলেও নবজাতকের পরিবার-পরিজন সবকিছুই এখন হাসপাতালের কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। চিকিৎসক, নার্সরাই এখন তার সব। তারাও আপনজনের মতো যত্ন করছেন শিশুটির।
স্থানীয় ও হাসপাতাল সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, জামালপুর-শেরপুর সেতুর নিচে বেশকিছু দোকান রয়েছে। ১৪ দিন আগে সেই দোকানের পাশ থেকে ভেসে আসে শিশুর কান্নার শব্দ। শব্দ শুনে এগিয়ে যান স্থানীয় এক ব্যক্তি। ঝোপের আড়াল থেকে শিশুটিকে উদ্ধার করে তিনি হাসপাতালে ভর্তি করেন। কিন্তু ভর্তি করেই চলে যান ওই ব্যক্তি। নিজের কোনো পরিচয় রেখে যাননি উদ্ধারকারী।
ভর্তির সময় শিশুটির অবস্থা ছিল সংকটাপন্ন। এতটাই দুর্বল ছিল যে, স্বাভাবিকভাবে নড়াচড়াও করতে পারছিল না। চিকিৎসকদের নিবিড় পরিচর্যা আর হাসপাতালের কর্মীদের যত্নে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠেছে শিশুটি। তাকে খাওয়ানোর দায়িত্ব নেন শিশু ওয়ার্ডের দায়িত্বে থাকা আয়া মনিরা বেগম।
মনিরা বেগম জানান, আমার নিজেরও দেড় বছরের একটি সন্তান আছে। নবজাতককে দেখে আমার খুব খারাপ লাগে। ডাক্তাররা বলার পর গত কয়েকদিন ধরে তাকে খাওয়াচ্ছি। শুরুতে খুব খারাপ অবস্থায় ছিল। এখন অনেকটাই ভালো আছে। আমি ডিউটি শেষ হলে অন্য সিস্টাররা ওর দেখাশোনা করেন। আমরা চাই সুস্থ হয়ে একটা ভালো পরিবারের কাছে যাক শিশুটি।
সিনিয়র স্টাফ নার্স হাবিবা আক্তার জানান, গত ৮ তারিখে শিশুটিকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তার বাবা-মা নেই, নেই কোনো স্বজন। মানুষ এমন হতে পারে! এক দিনের সন্তানকে রাস্তায় ফেলে চলে যায়! আমরা তাকে দেখাশোনা করছি।
মানবাধিকার কর্মী জাহাঙ্গীর সেলিম জানান, ঘটনা জানার পরে হাসপাতালে গিয়ে শিশুটিকে দেখে এসেছি। বিষয়টি অত্যন্ত দুঃখজনক। এখন পর্যন্ত তার পরিবারের কাউকে পাওয়া যায়নি। পরিবারকে খোঁজে বের করার চেষ্টা করছি। যদি না পাওয়া যায়, কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে ভালো একটা পরিবারের কাছে দায়িত্ব দেওয়া হবে।
এদিকে পাশের বিছানার শিশুদের কান্নায় ছুটে আসেন বাবা-মা, ছুটে আসেন স্বজন। ঠিক তখনই একই সুরে কেঁদে ওঠা এই কন্যাশিশুটির পাশে দাঁড়ানোর মতো থাকে না কোনো আপনজন। তার কান্না যেন নিঃশব্দেই হারিয়ে যায় হাসপাতালের দেয়াল জুড়ে। ১৪ দিন যাবৎ হাসপাতালে ১৮ নম্বর বেডে নাম-পরিচয়হীন শিশুটি বড় হচ্ছে সবার স্নেহে। তার কান্না আর নিঃসঙ্গতার জায়গা দখল করে নিয়েছে মানুষের ভালোবাসা। চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে শিশুটি। এরপর কোনো একদিন হয়তো সে খুঁজে পাবে নিজের একটি নাম, একটি ঠিকানা। খুঁজে পাবে ভালোবাসায় ভরা কোনো পরিবার।

