রাজশাহীতে ‘সুস্থ শিশু’ প্রতিযোগিতা!

ছবি: আগামীর সময়
শিশুর সুস্থ বেড়ে ওঠা শুধু তার শারীরিক গঠনের ওপর নির্ভর করে না। বয়স অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার, সময়মতো টিকাদান, নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা, পরিচ্ছন্নতার অভ্যাস এবং এসব বিষয়ে মায়ের সচেতনতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। পরিবারে শিশুর এই স্বাস্থ্যচর্চাগুলো কতটা নিশ্চিত হচ্ছে, তা যাচাই ও অভিভাবকদের সচেতন করতে রাজশাহীতে অনুষ্ঠিত হয়েছে ‘সুস্থ শিশু’ প্রতিযোগিতা (Healthy Baby Competition)। পাঁচ বছরের নিচের শিশু ও তাদের অভিভাবকদের অংশগ্রহণে আয়োজিত এ প্রতিযোগিতায় শিশুর শারীরিক বৃদ্ধি ও পুষ্টির পাশাপাশি মায়ের স্বাস্থ্যবিষয়ক জ্ঞান ও সচেতনতাকেও গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। রবিবার বেলা ১২টায় রাজশাহী নগরের সিটি চার্চ হলরুমে অনুষ্ঠিত হয় এ প্রতিযোগিতা। ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ রাজশাহী শহর এডিপি এ আয়োজন করে।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন রাজশাহীর সিভিল সার্জন ডা. এসআইএম রাজিউল করিম। তিনি বলেছেন, জন্মের পর থেকেই শিশুর পুষ্টি, টিকাদান ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের দিকে অভিভাবকদের নজর দিতে হবে। প্রথম ছয় মাস শুধু মায়ের বুকের দুধ এবং এরপর বয়স অনুযায়ী সুষম ও পুষ্টিকর খাবার শিশুর স্বাভাবিক বিকাশের জন্য জরুরি। ‘সুস্থ শিশু’ প্রতিযোগিতার মতো উদ্যোগ অভিভাবকদের সচেতন করার পাশাপাশি শিশুদের স্বাস্থ্যকরভাবে বেড়ে ওঠার পরিবেশ তৈরিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।’
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ রাজশাহীর প্রোগ্রাম অফিসার রিপন হালদারের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন রাজশাহী প্রেসক্লাবের সাধারণ সম্পাদক গোলাম মোস্তফা মামুন। তিনি বলেছেন, একটি শিশুর সুস্থতা শুধু পরিবারের বিষয় নয়; এর সঙ্গে পুরো সমাজের ভবিষ্যৎ জড়িত। শিশুর সঠিক পুষ্টি ও পরিচর্যার বিষয়ে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। এ ধরনের আয়োজন পরিবারকে সচেতন করার পাশাপাশি শিশুদের প্রতি সমাজের দায়িত্ববোধও বাড়াবে।
ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ রাজশাহীর সিনিয়র ম্যানেজার লোটাস চিসিম বলেন, শিশুর সুস্থতার জন্য চিকিৎসার পাশাপাশি পুষ্টি, পরিচ্ছন্নতা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করা প্রয়োজন। শিশুর যত্নে মায়ের জ্ঞান ও পরিবারের সচেতনতার বড় ভূমিকা রয়েছে। ‘সুস্থ শিশু’ প্রতিযোগিতার মাধ্যমে অভিভাবকদের বাস্তবভিত্তিক স্বাস্থ্য ও পুষ্টিবিষয়ক জ্ঞান অর্জনে উৎসাহিত করা হচ্ছে।
অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন ওয়ার্ল্ড ভিশন বাংলাদেশ রাজশাহীর সিনিয়র প্রোগ্রাম অফিসার নিলু বেগম। তিনি বলেছেন, শিশুর বয়স অনুযায়ী ওজন ও শারীরিক বৃদ্ধি পর্যবেক্ষণে জিএমপি কার্ড গুরুত্বপূর্ণ একটি উপকরণ। বুকের দুধ, বয়স অনুযায়ী পুষ্টিকর খাবার, টিকাদান ও পরিচ্ছন্নতার মতো বিষয়গুলো শিশুর সুস্থ বেড়ে ওঠার গুরুত্বপূর্ণ সূচক। এসব বিষয়ে মায়ের জ্ঞান ও তা বাস্তবে প্রয়োগের সক্ষমতাকেও প্রতিযোগিতায় গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
আয়োজকেরা জানান, ‘সুস্থ শিশু’ প্রতিযোগিতায় মোট ৮ হাজার শিশু অংশ নেয়। প্রাথমিক পর্যায়ে ১ হাজার ২০০ শিশুকে চূড়ান্ত বাছাইয়ের জন্য নির্বাচন করা হয়। পরে সেখান থেকে ১৮০ শিশুকে চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত করা হয়। তাদের মধ্যে ১৮ জনকে বিশেষ পুরস্কার এবং ১৬২ জনকে সাধারণ পুরস্কার দেওয়া হয়। সুস্থ শিশু নির্বাচনের ক্ষেত্রে শিশুর জিএমপি কার্ড থাকা, টানা তিন মাস ওজন বৃদ্ধি, জিএমপি কার্ড অনুযায়ী শিশুর স্বাভাবিক অবস্থান, মায়ের জিএমপি কার্ড ব্যাখ্যা করার সক্ষমতা এবং ইপিআই কার্ড থাকার বিষয়গুলো বিবেচনায় নেওয়া হয়।
পাশাপাশি বয়স অনুযায়ী শিশুর খাবারের অভ্যাসও মূল্যায়ন করা হয়। ছয় মাস বয়স পর্যন্ত শুধু মায়ের বুকের দুধ, ছয় থেকে আট মাসে বুকের দুধের পাশাপাশি দিনে দুইবার পুষ্টিকর খাবার, নয় থেকে ১১ মাসে দিনে তিনবার এবং ১২ থেকে ২৩ মাসে দিনে তিনবার পূর্ণ বাটি খাবার দেওয়া হচ্ছে কি না- এসব বিষয়ও দেখা হয়। শিশুর হাত ধোয়ার জন্য সাবান ও পানির ব্যবস্থা এবং অসুস্থ হলে কোথায় চিকিৎসা নিতে হবে- এসব বিষয়ও ছিল মূল্যায়নের অংশ।
কাশিয়াডাঙ্গা এলাকার প্রতিযোগী শিশু সায়ানের মা স্বপ্না খাতুন বলেন, প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে শিশুর পুষ্টি ও পরিচর্যার বিষয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় জানতে পেরেছেন। বয়স অনুযায়ী শিশুকে কী ধরনের ও কতটা খাবার দিতে হবে, সে বিষয়ে এখন তিনি আগের চেয়ে বেশি সচেতন। শিশুর ওজন, খাবার ও পরিচ্ছন্নতার বিষয়েও নিয়মিত নজর রাখবেন বলে জানান তিনি।
নগরীর মতিহার এলাকার শিশু রাফার মা সুপ্তা আক্তার বললেন, শিশুকে শুধু পেট ভরে খাওয়ালেই হবে না; বয়স অনুযায়ী সঠিক ও পুষ্টিকর খাবার দিতে হবে। প্রতিযোগিতার প্রস্তুতির সময় তিনি জিএমপি কার্ড, টিকাদান ও শিশুর পুষ্টির বিষয়ে আরও ভালোভাবে জানতে পেরেছেন। এ ধরনের আয়োজন নিয়মিত হলে অভিভাবকদের মধ্যে শিশুর স্বাস্থ্য ও পুষ্টি বিষয়ে সচেতনতা আরও বাড়বে।
আয়োজকদের মতে, ‘সুস্থ শিশু’ প্রতিযোগিতার লক্ষ্য শুধু সুস্থ শিশু নির্বাচন বা পুরস্কার দেওয়া নয়। শিশুর পুষ্টি, স্বাস্থ্য, পরিচ্ছন্নতা ও নিয়মিত স্বাস্থ্য পর্যবেক্ষণের বিষয়ে পরিবারগুলোকে আরও সচেতন করাই এ আয়োজনের বড় উদ্দেশ্য। কারণ, একটি শিশুর সুস্থ ভবিষ্যতের শুরুটা হয় সচেতন পরিবার থেকেই।





