তিস্তায় বিলীন গ্রামের পর গ্রাম

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
বছরের অধিকাংশ সময় তৃষ্ণার্ত থাকে তিস্তা। এখন নদী ভরা। এতে দুই পাড়ের মানুষের মধ্যে স্বস্তি ফেরার কথা থাকলেও হাবুডুবু খাচ্ছেন দুই তীরের মানুষ। নদী উপচে লোকালয়ে ঢুকছে পানি, ভেঙেছে বেশ কয়েকটি বাঁধ। প্রবল স্রোতে ভেসে যাচ্ছে বসতবাড়ি, বিলীন হচ্ছে ভিটা ও ফসলি জমি। সর্বস্ব হারিয়ে পথে দাঁড়িয়েছে হাজারো মানুষ। অনেকেই খুঁজছে একটু মাথা গোঁজার ঠাঁই। কোনো কোনো গ্রাম চিহ্নিত করার একমাত্র উপায় কয়েকটি উঁচু ঘরের চালা ও গাছে মাথা। এ ছাড়া দেখা যায় না কিছুই।
তিস্তার কড়াল গ্রাস দেখছে রংপুরের গঙ্গাচড়ার বাসিন্দারা। সেখানে ডুবে গেছে একাধিক গ্রাম। বাঁধ ভেঙে পানির স্রোত লোকালয়ে প্রবেশ করায় সর্বস্ব হারিয়েছেন বহু মানুষ। বন্যার সবচেয়ে বেশি অবনতি হয়েছে উপজেলার নোহালী এলাকায়। কষ্টের বর্ণনা দিলেন নোহালী ইউনিয়নের চরগ্রাম বাগডোহরা মিনার বাজার এলাকার ষাটোর্ধ্ব সৈয়দ আলী— ‘অভাবের সংসারোত মাটি কামড়ে অ্যাটেকোনা (এখানে) পড়ি আচনো আইজ কত বছর হইল। অ্যালা গ্যারামের মায়া ছাড়ি যাওয়া নাগেচোল বাহে। আল্লার দুনিয়ায় কোনটে অ্যাকনা জাগা পামো, আর কায়সে জাগা দেবে, তা-ও জানোং না।’ তিস্তার ভাঙনে ভিটে হারিয়ে বিধ্বস্ত ঘরবাড়ি সরানোর প্রাক্কালে এমন অভিব্যক্তি প্রকাশ করলেন তিনি। শুধু সৈয়দ আলীই নন, গত কয়েক দিনে ওই গ্রামের জাহাঙ্গীর আলম, মন্টু মিয়া, জাকারিয়া, তৈয়ব আলীসহ নদীভাঙনের শিকার আরও অন্তত ১০ পরিবার খুঁজছে মাথা গোঁজার ঠাঁই।
মিনার বাজার এখন পানিতে ভাসছে। নৌকা ছাড়া এই গ্রামে প্রবেশে উপায় নেই, আর ঘরের চালা ও গাছের মাথা ছাড়া দৃশ্যমান নেই কিছুই। বাড়িঘর ছেড়ে খোলা আকাশের নিচে মানবেতর দিন কাটাচ্ছেন অনেকে। তিস্তার ভাঙনের ভয়ে অজানার উদ্দেশে যাচ্ছিলেন ছমিরন বেওয়া। কষ্টের সঙ্গে তিনি বললেন, ‘হামার অ্যাটে থাকি য্যান লক্ষ্মী ছাড়ি পালাইচে। অ্যাটে থাকি আর কী করি, আর কায় হামাক খাবার দেয়। জাগার (বসতভিটা) মায়া ছাড়ি যাওচি, দেকি আল্লার দুনিয়াত কোনটে অ্যাকনা ঠাঁই মেলে।’
এমন ভয়াবহ দুর্যোগের পরও সরকারি কোনো কর্মকর্তার ছায়া পর্যন্ত দেখা যায়নি বলে অভিযোগ ভুক্তভোগীদের। স্থানীয় আমজাদ আলীর আক্ষেপ, ‘এর আগে নদীতে বাড়ি ভেঙেছে ৯ বার। আশায় বুক বেঁধে সবাই মিলে দিয়েছিলেন বাঁধ। স্বেচ্ছাশ্রমে গড়া সেই বাঁধও ভেঙে গেছে, কেড়ে নিয়েছে সব সম্বল।’
বাগডোহরা নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোনায়েম হোসেনের অভিযোগ, আবেদনের পরও ন্যূনতম সহায়তা করেনি পানি উন্নয়ন বোর্ড। স্বেচ্ছাশ্রমেই নির্মাণ করা হয়েছিল বাঁধটি। সেটিও ভেঙে যাওয়ায় তিস্তার ভাঙনে নিঃস্ব হয়ে শেষ পর্যন্ত এলাকা ছাড়তে বাধ্য হচ্ছে লোকজন। এখনো জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগসহ ভাঙন রোধের ব্যবস্থা নিলে রক্ষা পেতে পারে বাকি পরিবারগুলো।
‘ভাঙনের পরিস্থিতি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। বাগডোহরা মিনার বাজার ও চরনোহালী কাচারিপাড়া এলাকায় ৩৬ পরিবারের ঘরবাড়িসহ প্রায় ১০০ একর কৃষিজমি নদীতে বিলীন। বিষয়টি উপজেলা প্রশাসন ও পানি উন্নয়ন বোর্ডকে জানানো হয়েছে। জরুরি ভিত্তিতে ভাঙন রোধে কার্যকর ব্যবস্থা না নিলে আরও বড় ক্ষতির শঙ্কা রয়েছে’— জানালেন নোহালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আশরাফ আলী।
সাত দিন পর কর্তৃপক্ষের খোঁজ: তিস্তার অব্যাহত ভাঙনে একের পর এক ঘরবাড়ি বিলীন হলেও খোঁজ নেয়নি কেউ। শেষ পর্যন্ত সাত দিন পর শুক্রবার ভাঙন এলাকা পরিদর্শন করেছেন পানি উন্নয়ন বোর্ড (পাউবো) রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী রবিউল ইসলাম। বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে বলে দিলেন সান্ত্বনা।
ডিমলার চিত্রও অভিন্ন: তিস্তা নদীর গতিপথ পরিবর্তনে নীলফামারীর ডিমলার বিভিন্ন এলাকা ভাঙনের মুখে পড়ছে। একের পর এক বিলীন হচ্ছে চাষের জমি, বসতভিটা। ভাঙন থেকে বাঁচতে তিন দিনে বসতভিটা সরিয়ে নিতে হয়েছে শতাধিক পরিবারকে। শুক্রবার উপজেলার ঝুনাগাছ চাঁপানী ও খালিশাচাঁপানী ইউনিয়নের বাইশপুকুর, ডালিয়া, ছাতুনামা, কেল্লাপাড়া, ভেন্ডাবাড়ির নদীতীরবর্তী এলাকায় গেলে শোনা যায় ক্ষতিগ্রস্তদের আহাজারি।
বসতঘর সরিয়ে নেওয়ার ফাঁকে ভেন্ডাবাড়ির এক ভুক্তভোগী বললেন, ‘আমি পথে বসে গেলাম। বসতভিটা তো গেলই। ফসলের যেটুকু জমি আছে, আমন ধান করব বলে ঠিক করেছি, সেই জমির ওপর দিয়ে এখন তিস্তার স্রোত যাচ্ছে। আমাদের মরণদশা হইছে।’
প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন সংশ্লিষ্ট এলাকার আগামীর সময় অফিস ও প্রতিনিধি




