সুন্দরগঞ্জ
৭২ ঘণ্টায় তিন মৃত্যু, ভ্যাকসিন সংকটে বাড়ছে জলাতঙ্ক আতঙ্ক

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
রতনেশ্বর কুমার পেশায় রাজমিস্ত্রি। কাজে যাওয়ার পথে বেওয়ারিশ পাগলা কুকুরের কামড়ে গুরুতর আহত হন। শরীরের বিভিন্ন স্থানে হয় গভীর ক্ষত। পরিবারের সদস্যরা প্রথমে তাকে নিয়ে যান উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখানে ছিল না জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন। পাঠানো হয় জেলা সদর হাসপাতালে। সেখানেও একই উত্তর, ‘ভ্যাকসিন নেই’। শুরু হয় এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে দৌড়ঝাঁপ। ফার্মেসি থেকে বেসরকারি ক্লিনিক— কোথায় যাননি তারা! ২৪ ঘণ্টারও বেশি সময় পার হওয়ার পর চড়া দামে একটি ভ্যাকসিন সংগ্রহ করেন তারা। কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে।
জলাতঙ্কে আক্রান্ত হওয়ার ১৪ দিন পর রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে মারা যান চিকিৎসাধীন রতনেশ্বর কুমার। শুধু তিনি নন, গত ৭২ ঘণ্টায় একই পাগলা কুকুরের কামড়ে আক্রান্ত আরও দুজনের মৃত্যু হয়েছে। এ ঘটনায় পুরো এলাকায় ছড়িয়ে পড়েছে আতঙ্ক।
গত ২২ এপ্রিল গাইবান্ধার সুন্দরগঞ্জ উপজেলার কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বজরা কঞ্চিবাড়ি ও কঞ্চিবাড়ি গ্রাম এবং পার্শ্ববর্তী ছাপরহাটী ইউনিয়নের মন্ডলেরহাট গ্রামে ঘটে এসব ঘটনা। এসব ঘটনায় দুই শিশু ও দুই নারীসহ মোট ১৩ জন গুরুতর আহত হন।
আহতরা জেলা সদর হাসপাতাল ও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ঘুরেও ভ্যাকসিন পাননি। বাইরের ফার্মেসি থেকে চড়া দামে কিনতে হয়েছে ভ্যাকসিন।
৭২ ঘণ্টার ব্যবধানে তিনজনের মৃত্যুর খবর
র্যাবিস ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে ৬ মে মারা যান কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়নের বজরা কঞ্চিবাড়ি গ্রামের খোকা রামের স্ত্রী নন্দ রানী (৫৫) ও কঞ্চিবাড়ি গ্রামের নাইব উদ্দিনের ছেলে ফুলু মিয়া। ৮ মে মারা যান রতনেশ্বর কুমার।
আহতদের মধ্যে আশঙ্কাজনক অবস্থায় মতিয়ার রহমানের স্ত্রী আফরোজা বেগমকে উন্নত চিকিৎসার জন্য পাঠানো হয়েছে ঢাকায়। নারী-শিশুসহ ৯ জন আহতাবস্থায় চিকিৎসা নিচ্ছেন। তাদের নিয়ে চরম উদ্বেগে দিন কাটছে পরিবারগুলোর।
পরিবারের সদস্যরা বলছেন, দ্রুত চিকিৎসা ও পর্যাপ্ত ভ্যাকসিনের ব্যবস্থা না হলে হতে পারে আরও প্রাণহানি। আক্রান্তদের এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছুটতে ছুটতেই কেটে যাচ্ছে গুরুত্বপূর্ণ সময়। বাইরে থেকে চড়া দামে ভ্যাকসিন সংগ্রহ করলেও ততক্ষণে ২৪ ঘণ্টা পেরিয়ে যাচ্ছে। ফলে র্যাবিস ভাইরাস ছড়িয়ে পড়ছে শরীরে।
রতনেশ্বরের ভাই রবিন্দ্র কুমার অভিযোগ করেন, ‘কুকুর কামড়ানোর পরপরই ভাইকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে ক্ষতস্থানগুলো ড্রেসিংয়ের পর জানানো হয় ভ্যাকসিন নেই। এরপর জেলা হাসপাতালে ছুটে যাই, সেখানেও একই কথা। বাধ্য হয়ে ওষুধের দোকান, বেসরকারি হাসপাতালে খোঁজাখুঁজি শুরু করি। কিন্তু কোথাও ভ্যাকসিন মেলেনি।’
মন্ডলেরহাট এলাকার বাসিন্দা আব্দুল মালেক জানালেন, ‘মানুষ হাসপাতালে ছুটে যায়, কিন্তু ভ্যাকসিন পাওয়া যায় না। এখন তিনজন মারা গেছে, আমরা ভয় আর আতঙ্কে আছি।’
কঞ্চিবাড়ি ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য তাজরুল ইসলাম মনে করিয়ে দেন, জলাতঙ্কে তার এলাকায় দুজন মারা গেছেন। ‘ভ্যাকসিন না থাকায় সময়মতো চিকিৎসা শুরু করা যায়নি তাদের। সরকারি হাসপাতালে যদি পর্যাপ্ত ভ্যাকসিন থাকত, এই মৃত্যুগুলো এড়ানো যেত।’
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা দিবাকর বসাকের ভাষ্য, ‘আমাদের এখানে আক্রান্তদের কেউ চিকিৎসা নেয়নি। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কোনো ভ্যাকসিন সরবরাহ ছিল না। এ মাসে ৩০টি জলাতঙ্ক প্রতিরোধী ভ্যাকসিন কেনার জন্য অর্থ বরাদ্দ পেয়েছি। এসব ভ্যাকসিন জেলা হাসপাতালগুলোয় সরবরাহ করা হয়।’
তিনি পরামর্শ দেন, কুকুর বা অন্য কোনো প্রাণীর কামড়ে আহত হলে দ্রুত ক্ষতস্থান সাবান-পানি দিয়ে ধুয়ে হাসপাতালে যেতে হবে। সময়মতো ভ্যাকসিন নিলে জলাতঙ্ক প্রতিরোধ সম্ভব। এ বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি র্যাবিস ভাইরাসে আক্রান্ত কুকুরের ভ্যাকসিন সরবরাহ নিশ্চিত করাও জরুরি।




