ঈদযাত্রার আতঙ্ক চন্দ্রার ‘বটলনেক’

ছবি: আগামীর সময়
ঈদে ঘরমুখো যাত্রীদের ঢলে আশুলিয়ার নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কে প্রতিবারই তৈরি হয় তীব্র যানজট। ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে নাভিশ্বাস ওঠে যাত্রীদের। এই দুর্ভোগের উৎস মূলত চন্দ্রা ত্রিমোড়ের ‘অদ্ভুত ও ত্রুটিপূর্ণ প্রকৌশলগত নকশা’ বা ‘বটলনেক’ - মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
শিল্পাঞ্চলসহ রাজধানী ঢাকা থেকে উত্তরবঙ্গের ১৬ জেলাসহ অন্তত ২০ জেলায় যেতে লাখ লাখ যাত্রী ব্যবহার করে এই সড়ক। ঈদে বাড়ি ফেরার আনন্দ চন্দ্রা ত্রিমোড়ের আশপাশে পৌঁছালেই বদলে যায় বিরক্তিতে। কবিরপুর থেকে চন্দ্রা ত্রিমোড় পর্যন্ত মাত্র ৪ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিতেই যাত্রীদের লেগে যায় ৪ থেকে ৫ ঘণ্টা।
৪ লেনের চাপে যেখানে বটলনেক
সরেজমিনে চন্দ্রা ত্রিমোড়ের সড়ক কাঠামো বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, সাভার ও আশুলিয়া থেকে উত্তরবঙ্গের দিকে যাওয়া যানবাহনের জন্য আছে আলাদা লেন। এই লেনটি আবার দুই ভাগে বিভক্ত— একটি সরাসরি লেন, অন্যটি কাউন্টার থেকে যাত্রী তোলার জন্য ‘সার্ভিস লেন’। আর গাজীপুর থেকে উত্তরবঙ্গগামী যানবাহনের জন্য এখানে আছে একটি ফ্লাইওভার।
নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কের ভয়াবহ যানজটের আসল রহস্যটি লুকিয়ে এই ফ্লাইওভারের শেষ প্রান্তে।
ফ্লাইওভার থেকে নামা দুই লেনের গাড়ি এবং সাভার-আশুলিয়া থেকে আসা সরাসরি দুই লেনের গাড়ি— মোট ৪ লেনের গাড়ি এসে মিশেছে মাত্র দুই লেনের একটি সরু পথে। রাস্তার প্রশস্ততা কমে হঠাৎ কোনো অংশে সংকীর্ণ হয়ে গেলে তাকে বিশেষজ্ঞরা বলেন ‘বটলনেক’। এখানে এসেই চাপে পড়ে কমে যায় সব যানবাহনের গতি।
মরার ওপর খাঁড়ার ঘা ‘সার্ভিস লেন’
বটলনেকের ধাক্কা সামলে কিছুদূর এগোতেই ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হয়ে হাজির হয় সার্ভিস লেন। সেই দুই লেনের গাড়ির চাপে যুক্ত হয় সার্ভিস লেনের দূরপাল্লার বাসগুলো। তৈরি হয় তীব্র জট।
স্বাভাবিক সময়েই এই অংশে কমে যায় গাড়ির গতি। ঈদে যানবাহনের চাপ বাড়ামাত্রই পুরো চন্দ্রা ত্রিমোড় এলাকা কার্যত অচল হয়ে পড়ে। এর প্রভাব মুহূর্তেই ছড়িয়ে পড়ে পেছনের নবীনগর-চন্দ্রা মহাসড়কে। ফলে কবিরপুর থেকেই স্থবির হয়ে পড়ে উত্তরবঙ্গগামী চাকা।
যা বলছেন সংশ্লিষ্টরা
নাওজোড় হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সওগাতুল আলম বলছেন, ‘সড়ক পর্যাপ্ত প্রশস্ত না হওয়ার কারণেই মূলত ঈদযাত্রায় অতিরিক্ত যাত্রী ও যানবাহনের চাপে এই চরম ভোগান্তি তৈরি হয়।’
‘সড়কের নকশাজনিত কারণে ফ্লাইওভার ও সাভার থেকে আসা মোট চার লেনের গাড়িগুলোকে একপর্যায়ে গিয়ে মাত্র দুই লেনের একটি সরু পথ দিয়ে চলতে হয়। হঠাৎ রাস্তা সংকুচিত হয়ে যাওয়ার কারণে সেখানে স্বাভাবিকভাবেই যানবাহনের গতি মন্থর হয়ে পড়ে। আর এই ধীরগতির ফলেই পেছনে যানবাহনের দীর্ঘ সারি তৈরি হয়ে তীব্র যানজটের সৃষ্টি হয়’, ব্যাখ্যা করলেন ওসি।
চন্দ্রা ত্রিমোড়ের এই তীব্র যানজটকে কেবল যানবাহনের বাড়তি চাপ নয়, বরং সম্পূর্ণ ‘প্রকৌশলগত ত্রুটি’ হিসেবে দেখছেন বিশেষজ্ঞরা।
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট)-এর সহকারী অধ্যাপক ও সড়ক বিশেষজ্ঞ কাজী সাইফুন নেওয়াজের মত, ‘চন্দ্রা এলাকার সড়কের ত্রুটিপূর্ণ নকশা ও প্রকৌশলগত ভুলের কারণেই প্রতি বছর সড়ক ব্যবহারকারীদের এমন চরম ভোগান্তিতে পড়তে হচ্ছে।’
‘চার লেনের গাড়ি হঠাৎ দুই লেনের সরু পথে প্রবেশ করার এই গলদটি একটি বড় গাঠনিক ত্রুটি। স্থায়ীভাবে নকশা সংশোধন না করে কেবল ট্রাফিক পুলিশ দিয়ে প্রতি ঈদে এই মহাসড়ক সচল রাখা কোনোভাবেই সম্ভব নয়’, যোগ করেন তিনি।
স্থায়ী সমাধানের খোঁজে কর্তৃপক্ষ
চন্দ্রা ত্রিমোড়ে উত্তরবঙ্গগামী সরাসরি যানবাহনের নির্বিঘ্ন চলাচল নিশ্চিতে একটি স্থায়ী সমাধান খোঁজা হচ্ছে। এর অংশ হিসেবে সেখানে একটি এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে নির্মাণের মেগা পরিকল্পনার কথা ভাবা হচ্ছে, জানালেন গাজীপুর সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ।
আপাতত ‘সাভার থেকে ছেড়ে আসা সরাসরি লেনের যানবাহন এবং ফ্লাইওভার থেকে নামা যানবাহনের সংযোগস্থলে এবারের ঈদযাত্রায় ভোগান্তি কমাতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে’, বললেন এই কর্মকর্তা।




