বিভাগীয় শহর ছাড়া নেই হৃদরোগের চিকিৎসা

প্রতীকী ছবি
ফেনী সদর উপজেলার হালিমা বেগমের গত রবিবার রাতে বুকে ব্যথা ওঠে। পরদিন সকালে একটি বেসরকারি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানকার ডাক্তার চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ (চমেক) হাসপাতালে পাঠানোর পরামর্শ দেন। বিকালে চমেক কার্ডিওলজি বিভাগের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) ভর্তি হন তিনি।
হালিমার স্বামী আবু আহমেদ বললেন, ‘বুকে ব্যথা ওঠায় অ্যাম্বুলেন্সে চট্টগ্রাম নিয়ে আসি। এর আগে একবার ঢাকার এক ডাক্তারের অধীনে চিকিৎসা নিয়েছিলেন।’
জেলা পর্যায়ে কাঙ্ক্ষিত মানের চিকিৎসাসেবা না থাকায় এভাবে হার্টের অসুখ নিয়ে সারা দেশের রোগীরা হয়তো ঢাকা নয়তো চট্টগ্রাম শহরে ছুটছেন।
ঢাকা ও চট্টগ্রামে সরকারি প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি অনেক বেসরকারি হাসপাতালে হৃদরোগের উন্নত সেবা পাওয়া যায়। দেশের বেশিরভাগ হৃদরোগ বিশেষজ্ঞ এ দুই শহরে প্র্যাকটিস করেন। এর মূল কারণ ক্যাথল্যাবসহ পর্যাপ্ত চিকিৎসা অবকাঠামো এখানে আছে। অন্যান্য বিভাগীয় শহরে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে হার্টের চিকিৎসার আধুনিক ব্যবস্থা থাকলে জেলা হাসপাতালগুলোতেও কার্ডিওলজিস্ট সংকট থাকবে না মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর হিসাবে ‘হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে’ অনুযায়ী দেশে প্রতি হাজারে ৩১ জন হার্টের অসুখে ভুগছেন। হাজারে উচ্চ রক্তচাপের রোগী ৭৮ জন। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রতি বছর হৃদরোগে মৃত্যু তিন লাখের কাছাকাছি।
বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা হৃদরোগীদের দ্রুত চিকিৎসার ওপর জোর দিচ্ছেন ঠিকই। কিন্তু উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে হৃদরোগে আক্রান্তদের চিকিৎসকের শরণাপন্ন হতে অনেক ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়। এতে অকারণে অর্থ ও সময়— দুটোরই অপচয় হয়। আর এভাবেই সময়মতো চিকিৎসার অভাবে রোগীর মৃত্যু হয়। আজ বিশ্ব হার্ট দিবস, যার প্রতিপাদ্য ‘ডোন্ট মিস এ বিট’ বা মুহূর্ত নষ্ট করো না। এই দিবস সামনে রেখে চিকিৎসকদের সঙ্গে কথা বলে এ চিত্র পাওয়া গেছে।
জাতীয় হৃদরোগ ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক ইব্রাহিম চৌধুরী আগামীর সময়কে বললেন, ‘হার্ট অ্যাটাকের রোগীদের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিট গুরুত্বপূর্ণ। এক মিনিট দেরি হওয়া মানে তার মারাত্মক ক্ষতি। যদি জেলা পর্যায়ে হার্টের চিকিৎসা ছড়িয়ে দেওয়া যায়, তাহলে মৃত্যু অনেক কমে আসবে।’
সিলেট বিভাগের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক মাহবুবুল আলম বললেন, ‘আমি মনে করি হার্টের রোগীদের জন্য উপজেলা পর্যায়েও ইসিজি এবং মনিটরিংয়ের পাশাপাশি থ্রোম্বলাইসিস দিতে পারে— এমন চিকিৎসক থাকা দরকার। কিন্তু আমাদের ইচ্ছা থাকলেও জনবল এবং অন্যান্য সুবিধার অভাবে তা করা যাচ্ছে না।’
চট্টগ্রাম ও বরিশালে হৃদরোগী বেশি: গত বছর প্রকাশিত হেলথ অ্যান্ড মরবিডিটি স্ট্যাটাস সার্ভে অনুযায়ী চট্টগ্রাম ও বরিশাল বিভাগের মধ্যে হৃদরোগীর সংখ্যা বেশি। হাজারে প্রায় ৩৪ থেকে ৩৬ জন, অন্যান্য বিভাগের মধ্যে খুলনা ও রাজশাহীতে প্রতি হাজারে ৩১ জন, সিলেটে ৩০, ময়মনসিংহে ২৯, ঢাকা ও রংপুরে ২৬ জন হৃদরোগী। জরিপে আটটি বিভাগের ১ লাখ ৮৯ হাজার ৯৮৬ ব্যক্তির জরিপ-পূর্ববর্তী ৯০ দিনের স্বাস্থ্য তথ্য থেকে এ হিসাব পাওয়া গেছে। নারী ও পুরুষের মধ্যে হৃদরোগের হার প্রায় সমান।
বরিশাল, রংপুর ও খুলনায় ক্যাথল্যাব নেই: বরিশালে হৃদরোগী বেশি হলেও পুরো বিভাগে সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে হার্টের রোগীদের জন্য কোনো ক্যাথল্যাব নেই। দু-একটি হাসপাতালে সিসিইউ থাকলেও এগুলোর সেবার মান সন্তোষজনক নয়। বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হচ্ছে বিভাগের সবচেয়ে বড় হাসপাতাল। এখানে সিসিইউ সুবিধা রয়েছে। ইসিজি এবং ইকোকার্ডিওগ্রাফি হয়। কিন্তু ক্যাথল্যাবের জন্য রোগীদের ছুটতে হয় ঢাকায়।
ক্যাথল্যাবের মাধ্যমে হার্টের ধমনিতে প্রতিবন্ধকতা বা ব্লক নির্ণয় করা হয়। এটিকে এনজিওগ্রাম বলা হয়। এ ছাড়া হার্টে রিং পরানো বা এনজিওপ্লাস্টি এবং পেসমেকার বসানো হয় ক্যাথল্যাবের মাধ্যমে।
ছয়টি জেলা হাসপাতালে ইসিজি রয়েছে। তবে সব জেলা হাসপাতালে কার্ডিওলজিস্ট নেই। বরিশাল বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক মোহাম্মদ রেফায়াতুল হায়দার আগামীর সময়কে বললেন, ‘বরিশালের হৃদরোগীদের ক্যাথল্যাবকেন্দ্রিক যে সেবা, তা পুরোপুরি ঢাকানির্ভর। শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল কিংবা বেসরকারি পর্যায়েও ক্যাথল্যাব সেবা নেই। জেলা হাসপাতালগুলোতে ইসিজির মতো সাধারণ হার্টের পরীক্ষাগুলো হয়।’
রংপুর বিভাগের সব হার্টের রোগীকে ঢাকার দিকে তাকিয়ে থাকতে হয়। রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সীমিত পর্যায়ে ক্যাথল্যাব সেবা চালু রয়েছে। তবে তা মাঝেমধ্যে বন্ধ হয়ে যায়। এখানে জেলা হাসপাতালগুলোতে হার্টের চিকিৎসা মানে ইসিজিনির্ভর। কোনো হাসপাতালে কার্ডিওলজিস্ট নেই— জানালেন বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ওয়াজেদ আলী।
খুলনা বিভাগের যশোর, সাতক্ষীরা, কুষ্টিয়া ও মাগুরা মেডিকেল কলেজে ক্যাথল্যাব সুবিধা নেই। এর মধ্যে শুধু সাতক্ষীরা ও কুষ্টিয়ায় সিসিইউ রয়েছে। খুলনার বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক শেখ মোহাম্মদ আবু মোশাররফ হোসেন বললেন, ‘খুলনা শেখ আবু নাসের হাসপাতাল ও খুলনা মেডিকেল কলেজে ক্যাথল্যাব রয়েছে। তবে জেলা পর্যায়ে সে অর্থে হার্টের চিকিৎসা অপ্রতুল।’
চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভিড়: চট্টগ্রাম বিভাগের ১১ জেলার মধ্যে ৬টি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রয়েছে। এর মধ্যে শুধু চট্টগ্রাম মেডিকেল ছাড়া কোথাও ক্যাথল্যাব নেই। তবে কুমিল্লা মেডিকেলে শুধু সিসিইউ সুবিধা রয়েছে। এ কারণে পুরো বিভাগের রোগী চট্টগ্রাম মেডিকেলে ভিড় জমান।
চট্টগ্রাম মেডিকেলে ১০০ শয্যার কার্ডিওলজি ওয়ার্ডে রোগী থাকে প্রায় দ্বিগুণ। গত বছরের আগস্ট থেকে চলতি বছর আগস্ট পর্যন্ত চমেক হৃদরোগ বিভাগ ৫৮ হাজার ২৯৮ রোগীকে চিকিৎসা দিয়েছে।
একই ওয়ার্ডের ক্যাথল্যাবে এনজিওগ্রাম ও এনজিওপ্লাস্টির জন্য রোগীর লাইন লেগে থাকে। এখানে সিরিয়াল দিয়ে অপেক্ষায় থাকতে হয় এক মাস। ২০২৬ সালে চমেক হাসপাতালে এনজিওগ্রাম করা হয় ২৫ হাজার রোগীর। গত বছর ছিল ২৩ হাজার। হাসপাতালের পরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ তসলিম উদ্দীন বললেন, ‘প্রচুর রোগীর কারণে হৃদরোগ বিভাগে এনজিওগ্রামের জন্য অপেক্ষা করা ছাড়া আর উপায় নেই।’
চলতি বছর এনজিওপ্লাস্টি হয় ৫ হাজার ৬২৭ জনের। গত বছর হয় ৪ হাজার ৭৪৩টি। এ বছর সাময়িক পেসমেকার বসানো হয় ১ হাজার ৮১৩ জনের। স্থায়ী পেসমেকার বসানো হয় ১ হাজার ২৭৩টি।
চট্টগ্রামের বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক সেখ ফজলে রাব্বি বললেন, ‘চট্টগ্রাম মেডিকেল ছাড়া সরকারিভাবে আর কোথাও ক্যাথল্যাব নেই। এ ছাড়া বেসরকারি পর্যায়েও বিভাগীয় শহরের বাইরে হার্টের চিকিৎসার অবকাঠামো নেই। জেলা হাসপাতালগুলোতে ইসিজি এবং ক্ষেত্রবিশেষে ইকো কার্ডিওগ্রাফি হয়। কনসালট্যান্টও সব জেলায় নেই।’
অচল ক্যাথল্যাব: ঢাকা বিভাগের গোপালগঞ্জ, ফরিদপুর, মানিকগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ, গাজীপুর ও টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল রয়েছে। ফরিদপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ২০১৬ সালে ক্যাথল্যাব বসানো হলেও তা বর্তমানে সচল নেই। সিসিইউ শয্যা রয়েছে এখানে।
মানিকগঞ্জ মেডিকেল কলেজের ক্যাথল্যাবটি চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজে নেওয়া হয় বছরখানেক আগে। ফলে এখন সেবা বন্ধ। এখানে বর্তমানে সিসিইউ সেবা রয়েছে।
ঢাকা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক মোহাম্মদ জাহাঙ্গীর আলম বলেছেন, ‘ঢাকা ছাড়া বিভাগের ছয়টি জেলায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল আছে। কিন্তু কোনোটিতে পুরোপুরি হার্টের চিকিৎসা পাওয়া যায় না। ক্যাথল্যাব থাকলেও অনেক ক্ষেত্রে ডাক্তার এবং সেটআপের অভাব রয়েছে।’
রাজশাহী বিভাগে জেলা আটটি। মেডিকেল কলেজ রয়েছে পাঁচটি। রাজশাহী ও বগুড়া মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়া কোথাও সিসিইউসহ ক্যাথল্যাব সুবিধা নেই। শুধু সিসিইউ রয়েছে সিরাজগঞ্জ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক হাবিবুর রহমান বললেন, ‘রাজশাহী ও বগুড়ায় ক্যাথল্যাব সুবিধা আছে। বাকিগুলোতে ইসিজি, ইকো হয়। কনসালট্যান্ট সব হাসপাতালে নেই।’
অন্যান্য বিভাগ: ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ছাড়া বিভাগটিতে আর কোনো ক্যাথল্যাব বা সিসিইউ সুবিধা নেই। জামালপুর ও নেত্রকোনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শুধু ইসিজি হয়।
সিলেট বিভাগের সিলেট ওসমানী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে সিসিইউসহ ক্যাথল্যাব সুবিধা রয়েছে। এ ছাড়া বেসরকারি পর্যায়ে হার্ট ফাউন্ডেশনসহ দু-একটি জায়গায় ক্যাথল্যাব সুবিধা রয়েছে। সুনামগঞ্জ, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জ জেলা হাসপাতালে ইকো এবং ইসিজিনির্ভর হৃদরোগ চিকিৎসা।
বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক মাহবুবুল আলম বললেন, ‘জেলায় হার্টের চিকিৎসা থাকা খুবই জরুরি। জকিগঞ্জে একটা লোক হার্ট অ্যাটাক করলে তার দ্রুত চিকিৎসা দরকার। কিন্তু তাকে বিভাগে আনতে আনতে জীবন শঙ্কায় পড়ে যায়।’



