স্বপ্নে পাওয়া মিষ্টি, দুই শতকেও অমলিন মুক্তাগাছার মণ্ডা

ছবি: আগামীর সময়
সকালের সূর্যের আলোর ঝলক তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। মুক্তাগাছা শহরের চৌরঙ্গী মোড়ে একটি পুরোনো মিষ্টির দোকানের সামনে ইতিমধ্যে ভিড় জমতে শুরু করেছে। কেউ এসেছেন ময়মনসিংহ থেকে, কেউ ঢাকার থেকে, কেউবা আবার নারায়ণগঞ্জ কিংবা চট্টগ্রাম থেকে। তাদের সবার উদ্দেশ্য এক দুই শতকেরও বেশি সময় ধরে মানুষের জিহ্বায়, স্মৃতিতে আর ঐতিহ্যে জায়গা করে নেওয়া মুক্তাগাছার বিখ্যাত মণ্ডার স্বাদ নেওয়া।
দোকানের পেছনে বিশাল কড়াইয়ে ধীরে ধীরে নাড়ছেন কারিগরেরা। আগুনের তাপে দুধের ছানা আর চিনি রূপ নিচ্ছে এক অনন্য মিষ্টিতে। এই দৃশ্য আজকের নয়, প্রায় দুই শ বছর ধরে একই ছন্দে, একই ধৈর্যে তৈরি হচ্ছে মুক্তাগাছার মণ্ডা। সময় বদলেছে, বদলেছে মানুষের জীবনযাত্রা, কিন্তু বদলায়নি এই মিষ্টির স্বাদ আর সুনাম।
মুক্তাগাছার মণ্ডার জন্মের গল্পটি লোককথার মতোই বিস্ময় জাগানো। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, ১৮২৪ সালে তারাটী গ্রামের মিষ্টি প্রস্তুতকারক রাম গোপাল পাল টানা কয়েক রাত এক সন্ন্যাসীকে স্বপ্নে দেখেন। সেই সন্ন্যাসী তাকে দুধের ছানা ও চিনি দিয়ে এক বিশেষ মিষ্টি তৈরির পদ্ধতি শেখান। স্বপ্ন ভাঙার পর তিনি সেই নির্দেশ অনুসরণ করে তৈরি করেন এক নতুন মিষ্টি। পরে সেটি তৎকালীন জমিদার মহারাজা সূর্যকান্ত আচার্য চৌধুরীর দরবারে পরিবেশন করা হলে তিনি মুগ্ধ হন। সেই মুহূর্ত থেকেই শুরু হয় মুক্তাগাছার মণ্ডার ইতিহাস।
তখনকার মুক্তাগাছা ছিল জমিদারি সংস্কৃতির এক সমৃদ্ধ জনপদ। ইতিহাসবিদদের মতে, এই অঞ্চলের আগের নাম ছিল বিনোদবাড়ি। পরে আচার্য চৌধুরী জমিদার পরিবার এখানে বসতি স্থাপন করলে স্থানীয় বাসিন্দা মুক্তারামের নামের 'মুক্তা' এবং 'গাছা' শব্দ মিলিয়ে জনপদের নাম হয় 'মুক্তাগাছা'। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সেই নামের সঙ্গে জুড়ে যায় আরেকটি পরিচয়-মণ্ডা।
জমিদারবাড়ির অতিথি আপ্যায়ন মানেই ছিল মণ্ডা। সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান কিংবা বিশেষ আয়োজন-সবখানেই এই মিষ্টির উপস্থিতি ছিল অবধারিত। জনশ্রুতি রয়েছে, জমিদার পরিবারের সকালের নাশতা থেকে শুরু করে কর্মচারীদের জলখাবারেও থাকত মণ্ডা।
এই মিষ্টির খ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে দূর-দূরান্তে। ইতিহাসে উল্লেখ আছে, সংগীতাচার্য ওস্তাদ আলাউদ্দিন খাঁ, নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসু এবং পশ্চিমবঙ্গের সাবেক মুখ্যমন্ত্রী ডা. বিধানচন্দ্র রায় মুক্তাগাছার মণ্ডার স্বাদ গ্রহণ করেছিলেন।
স্থানীয়দের মুখে মুখে আরও শোনা যায়, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, রাষ্ট্রপতি আবু সাঈদ চৌধুরী, শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান, বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, ড. কামাল হোসেন, ভারতের সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী, ব্রিটেনের রানি দ্বিতীয় এলিজাবেথ এবং রাশিয়ার নেতা জোসেফ স্টালিনের কাছেও এই মণ্ডা পৌঁছেছিল। যদিও এসব তথ্যের অনেকটাই জনশ্রুতি হিসেবে পরিচিত।
মণ্ডা তৈরির গল্পটিও কম বিস্ময়ের নয়। সাত কেজি দুধ থেকে তৈরি হয় মাত্র এক কেজি মণ্ডা। দুধ কেটে ছানা তৈরি করা, দীর্ঘ সময় ধরে আগুনে নাড়াচাড়া, সঠিক তাপমাত্রা বজায় রাখা-প্রতিটি ধাপেই প্রয়োজন অভিজ্ঞতা আর ধৈর্য। কোনো যন্ত্র নয়, এখনো মানুষের হাতের নিপুণতাই এই মিষ্টির আসল শক্তি।
আজও গোপাল পালের বংশধরেরাই সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন। পরিবারের পঞ্চম প্রজন্মের সদস্য রামেন্দ্রনাথ পাল বলেন, আমাদের মণ্ডার দোকানের কোথাও কোনো শাখা নেই। আসল মণ্ডার স্বাদ নিতে সবাই মুক্তাগাছাতেই আসেন। বিদেশেও এখন এর পরিচিতি তৈরি হয়েছে।
আরেক সদস্য মিহির কুমার পাল বলেন, স্বাদ আর গুণগত মান ধরে রাখাই আমাদের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর বিদেশে রপ্তানির পরিকল্পনাও করছি।
বর্তমানে ১৪ জন কারিগর প্রতিদিন চার থেকে পাঁচ মণ মণ্ডা তৈরি করেন। কিন্তু তাদের সবচেয়ে বড় লড়াই ভালো মানের পর্যাপ্ত দুধ সংগ্রহ করা। কারণ, মানের সঙ্গে কোনো আপস করতে চান না তারা।
২০২৪ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি মুক্তাগাছার মণ্ডা বাংলাদেশের ২৫তম ভৌগোলিক নির্দেশক (জিআই) পণ্যের স্বীকৃতি পায়। এই স্বীকৃতি শুধু একটি মিষ্টিকে নয়, একটি অঞ্চলের ইতিহাস, সংস্কৃতি ও কারুশিল্পকেও নতুন মর্যাদা দিয়েছে। এর পর থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ক্রেতার সংখ্যা বেড়েছে। উৎসবের সময় সেই ভিড় দ্বিগুণ হয়ে যায়।
মুক্তাগাছার বিজয় শিল্পালয়ের স্বত্বাধিকারী সুমন সরকার বলেন, অনেক জায়গার মণ্ডা খেয়েছি, কিন্তু এখানকার স্বাদ ও গন্ধের ধারাবাহিকতা আলাদা।
নারায়ণগঞ্জ থেকে পরিবার নিয়ে আসা ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেনের বলেন, আগেও মণ্ডা খেয়েছি এক বন্ধুর বাসায়, তবে জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার খবর শোনার পরই আসার ইচ্ছা ছিল মুক্তাগাছায় এসে এই মণ্ডা খাওয়ার। আজ এসে মণ্ডা খেয়ে বুঝলাম, এত প্রশংসার কারণ আছে।
মুক্তাগাছা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা কৃষ্ণ চন্দ্র বলেন, যুগ যুগ ধরে মুক্তাগাছার ইতিহাস ও ঐতিহ্যের সঙ্গে মণ্ডা জড়িয়ে আছে। জিআই স্বীকৃতি পাওয়ার পর এটি এখন শুধু মুক্তাগাছার নয়, সারা বাংলাদেশের সম্পদ। ইতিমধ্যেই তাদের জিয়াই পণ্য এর গুণগত মান বজায় রাখার ওপর প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা, গুনগতমান এবং গ্রাহক সেবাসহ পর্যটনবান্ধব পরিবেশ গড়ে তুলতে আমরা কাজ করছি।
মণ্ডার প্রতি মুগ্ধতার সাক্ষ্য মেলে দর্শনার্থীদের লেখাতেও। ২০০৬ সালে ভারতের তৎকালীন হাইকমিশনার বীণা সিক্রি দোকানের দর্শনার্থী বইয়ে লিখেছিলেন, গোপাল পালের বিখ্যাত মণ্ডার দোকানে এসে এই সুস্বাদু মিষ্টির স্বাদ নেওয়া অত্যন্ত আনন্দের ও সৌভাগ্যের বিষয়। প্রকৃতপক্ষে, এটি তার সুনামের পুরোপুরি যোগ্য।
জমিদার পরিবারের উত্তরসূরি জীবেন্দ্র কিশোর আচার্য চৌধুরীও বহু বছর আগে তার লেখা "আমি" বইতে লিখেছিলেন, তাদের পূর্বপুরুষদের সময় থেকেই এই মণ্ডা জমিদার বাড়িতে সরবরাহ হতো এবং এর বিশুদ্ধতা নিয়ে কখনো কোনো প্রশ্ন ওঠেনি।
আজও মুক্তাগাছার সেই পুরোনো দোকানে বসে যখন কেউ এক টুকরো মণ্ডা মুখে তোলেন, তখন তিনি শুধু একটি মিষ্টির স্বাদ নেন না। তিনি যেন ছুঁয়ে দেখেন প্রায় দুই শতকের ইতিহাস, জমিদারবাড়ির স্মৃতি, এক স্বপ্ন থেকে জন্ম নেওয়া লোককথা এবং কয়েক প্রজন্ম ধরে একই নিষ্ঠায় কাজ করে যাওয়া মানুষের শ্রম।
সময়ের সঙ্গে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়। কিন্তু কিছু কিছু স্বাদ ইতিহাসের মতোই টিকে থাকে। মুক্তাগাছার মণ্ডা ঠিক তেমনই-একটি মিষ্টি, একটি জনপদের পরিচয়, আর বাংলাদেশের খাদ্য ঐতিহ্যের এক উজ্জ্বল প্রতীক।








