ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে ২০০ বছরের ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বাড়ি

ছবি: আগামীর সময়
দিনাজপুর সদর উপজেলা থেকে মাত্র ৮ কিলোমিটার দূরে ইতিহাস-ঐতিহ্যের নীরব সাক্ষী হয়ে আজও দাঁড়িয়ে আছে ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারবাড়ি। পুনর্ভবা নদীর কোলঘেঁষে নিরিবিলি ও কোলাহলমুক্ত ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামে অবস্থিত এই জমিদারবাড়ি। সংরক্ষণের অভাবে বাড়িটি আজ ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। একসময়ের বিস্তৃত জমিদারবাড়িটি এখন বিলীন হওয়ার অপেক্ষায়।
অথচ প্রয়োজনীয় সংস্কার ও সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া হলে ঐতিহ্যের নিদর্শন হিসেবে নতুন প্রজন্মের কাছে ইতিহাসের শিক্ষণীয় বিষয় হয়ে উঠতে পারে এটি। পাশাপাশি বাড়িটি হতে পারে একটি দর্শনীয় স্থান। ইতিহাস-ঐতিহ্যে সমৃদ্ধ ঘুঘুডাঙ্গা শতাধিক পরিবারের বসবাসের একটি গ্রাম। এই গ্রামের নামেই পরিচিত ঘুঘুডাঙ্গার জমিদার পরিবার।
ঘুঘুডাঙ্গা এলাকায় বসবাসরত বংশধরদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য ও ইতিহাস থেকে জানা যায়, ব্রিটিশ শাসনামলে দিনাজপুর জেলায় যেসব জমিদার ছিলেন, তাদের মধ্যে অন্যতম ছিলেন ঘুঘুডাঙ্গার জমিদার। ব্রিটিশ শাসিত তৎকালীন দিনাজপুরের ১১টি থানায় এই জমিদারের এস্টেট ছিল।
এস্টেট থেকে প্রতিবছর ব্রিটিশ সরকারকে এক লাখ টাকা খাজনা দিতে হতো। এই জমিদারি পরিচালিত হতো ১৮টি কাচারি ও ৪১টি তহসিল অফিসের মাধ্যমে। ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বংশের গোড়াপত্তন করেন নবীর মোহাম্মদের একমাত্র ছেলে ফুল মোহাম্মদ। এভাবে পর্যায়ক্রমে প্রায় ৮০ বছর স্থায়ী ছিল ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারি।
তবে ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারির সূচনা কবে হয়েছিল, তা সঠিকভাবে কেউ বলতে পারেননি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ১৭৭১ সালে চালু করা পঞ্চসনা ব্যবস্থা পরবর্তীকালে ব্যর্থতায় পর্যবসিত হলে সরকার চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের নীতিতে ১৭৮৯ সালে দশসালা বন্দোবস্ত চালু করে। এ থেকে ধারণা করা যায়, ১৭৭১ থেকে ১৭৮৯ সালের মধ্যে ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারির সূচনা হয়েছিল। ১৯৫০ সালে জমিদারি প্রথা বিলুপ্ত হওয়ার আগপর্যন্ত এই জমিদারি টিকে ছিল।
ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারবাড়িটি একতলা ও দোতলার সমন্বয়ে নির্মিত একটি অনন্য পাকা ভবন। তবে বর্তমানে ভবনটি ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে।
ফুল-লতাপাতার নকশায় সজ্জিত বিশাল প্রবেশদ্বারটিও এখন ভগ্নদশায় রয়েছে। একসময় জমিদারবাড়িতে হাতিশালে হাতি ও ঘোড়াশালে ঘোড়া ছিল। অন্যান্য জমিদার পরিবারের মতো এখানেও ছিলেন পাইক-পেয়াদা, সিপাহি, বাবুর্চি, খানসামা ও খামারু। ছিলেন একজন ব্যবস্থাপকও।
বাড়ির বহিরাংশে ছিল মেহমানখানা ও একটি সুদৃশ্য মসজিদ। সপ্তাহে বা মাসে একবার মেহমানখানা চত্বরে বসত গ্রামপ্রধানদের আসর। সেখানে শান্তিশৃঙ্খলা, সামাজিক বিষয়, চাষাবাদ ও আর্থিক নানা বিষয় নিয়ে আলোচনা হতো। মেহমানখানার পেছনে রয়েছে ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার পরিবারের দুটি কবরস্থান।
ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার এস্টেটে ছিল বেশ কিছু দুর্লভ সামগ্রী। এর মধ্যে একটি স্বর্ণের চেয়ার বর্তমানে জাতীয় জাদুঘরে ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষিত রয়েছে।
এ ছাড়া ১০১ ভরি ওজনের স্বর্ণের তৈরি কৃত্রিম কই মাছ, রুপার বাটযুক্ত ছাতা, পাখা, রৌপ্যনির্মিত লাঠি ও তামার ডেকচিসহ বেশ কিছু দুর্লভ সামগ্রী ছিল। ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে এসব সামগ্রী লুণ্ঠিত ও ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়।
ঘুঘুডাঙ্গা জমিদার বংশের গোড়াপত্তনকারী ফুল মোহাম্মদের উত্তরসূরিরা আজও সমাজের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে রয়েছেন। তবে জমিদারবাড়ির ঐতিহাসিক স্থাপনাগুলো এখনো ভঙ্গুর অবস্থায় পড়ে আছে। ইতিহাস জানার আগ্রহে আজও অনেক মানুষ নিরিবিলি ও কোলাহলমুক্ত ঘুঘুডাঙ্গা গ্রামে অবস্থিত এই জমিদারবাড়ি দেখতে ছুটে যান।
প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের রংপুর বিভাগের আঞ্চলিক পরিচালক ড. আহমেদ আবদুল্লাহ আগামীর সময়কে জানান, ঘুঘুডাঙ্গা জমিদারবাড়ি এখনো সংরক্ষিত পুরাকীর্তির তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হয়নি। তবে এ বিষয়ে কেউ আবেদন করলে পরিদর্শন ও যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে।




