একটি ময়নাতদন্ত কেন্দ্রের ‘পোস্টমর্টেম’

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
‘শোনা গেল লাশকাটা ঘরে/নিয়ে গেছে তারে;/কাল রাতে— ফাল্গুনের রাতের আঁধারে/যখন গিয়েছে ডুবে পঞ্চমীর চাঁদ/মরিবার হ’ল তার সাধ; —জীবনানন্দ দাশ। আত্মহত্যা, হত্যা কিংবা যে কোনো অপমৃত্যুর পর মরদেহ নিতে হয় লাশকাটা ঘরে বা মর্গে। আর মৃত্যুর কারণ অনুসন্ধানের জন্য যে মর্গে মরদেহের ময়নাতদন্ত করা হয়, সেই মর্গই এখন ধুঁকছে বিভিন্ন সংকটে। ফেনী জেনারেল হাসপাতালের এই ময়নাতদন্ত কেন্দ্রে দুটি ফ্রিজারের একটি নষ্ট, যন্ত্রপাতিও পুরনো। নেই গুরুত্বপূর্ণ নমুনা সংরক্ষণের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা। স্থায়ী জনবল না থাকায় আউটসোর্সিংয়ের দুজন কর্মী দিয়ে চলছে কার্যক্রম। নিয়মিত ভাতা না পেয়ে তারাও হতাশ। জেলার একমাত্র মর্গটির এমন বেহালদশায় ব্যাহত হচ্ছে স্বাভাবিক কার্যক্রম।
ফেনী জেনারেল হাসপাতালের মর্গে নিয়মিত মরদেহ আসে। এসবের উল্লেখযোগ্য একটি অংশের ময়নাতদন্ত করতে হয়। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় অবকাঠামো ও সরঞ্জামের ঘাটতি থাকায় কাজের চাপ সামলাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে কর্মীদের। তার ভাষ্য, মরদেহের ময়নাতদন্ত ও সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের ঘাটতি রয়েছে। ভিসেরা বা মানবদেহের বিভিন্ন অংশবিশেষ সংরক্ষণের উপযুক্ত ব্যবস্থা না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ নমুনা সংরক্ষণেও সমস্যার মুখে পড়তে হচ্ছে। ময়নাতদন্তের কাজে ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণের ব্যবস্থাও নেই।
মর্গের কার্যক্রম পরিচালনার জন্য নেই স্থায়ী জনবলও। আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে নিয়োগ পাওয়া প্রধান ডোম আব্দুর রহিম ও সহকারী ডোম আমজাদ হোসেনই সব কাজ সামলাচ্ছেন। তাদের দায়িত্ব পালনের নির্দিষ্ট সময়ও নেই। দিন-রাত যেকোনো সময় মরদেহ এলে তা গ্রহণ ও সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয়। প্রধান ডোম আব্দুর রহিমের ভাষায়, মর্গের সংকটের কারণে তাদের অত্যন্ত কষ্টে কাজ করতে হচ্ছে। পুরনো যন্ত্র দিয়ে মরদেহ কাটাছেঁড়ার কাজ করা কঠিন হয়ে পড়েছে। এজন্য উন্নতমানের যন্ত্রপাতি প্রয়োজন। শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রটি নষ্ট থাকায় কাজ করতে আরও সমস্যা হচ্ছে।
জনবল সংকটের পাশাপাশি আবাসনের সমস্যাও রয়েছে তার। আব্দুর রহিম জানালেন, হাসপাতাল চত্বরে একটি ছোট ঘরে পরিবারের সদস্যদের নিয়ে কোনো রকমে থাকতে হচ্ছে তাকে। মর্গের মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানে দায়িত্ব পালন করলেও কর্মীদের জন্য উপযুক্ত আবাসনের ব্যবস্থা নেই।
সহকারী ডোম আমজাদ হোসেন বললেন, ‘প্রায় ২৪ ঘণ্টাই তাদের প্রস্তুত থাকতে হয়। অনেক সময় গভীর রাতে পুলিশ মরদেহ নিয়ে আসে। তখন মরদেহ গ্রহণ করে মর্গে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করতে হয়। কিন্তু দায়িত্বের তুলনায় পারিশ্রমিক কম এবং নিয়মিত ভাতা না পাওয়ায় তারা হতাশ। এতে পরিবারের প্রয়োজনীয় খরচ মেটাতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
মর্গের সংকট শুধু কর্মীদের দুর্ভোগেই সীমাবদ্ধ নয়; মরদেহ সংরক্ষণ ও ময়নাতদন্ত-সংশ্লিষ্ট গুরুত্বপূর্ণ নমুনা ব্যবস্থাপনাও ব্যা হত হচ্ছে। দুটি ফ্রিজারের একটি নষ্ট থাকায় একাধিক মরদেহ সংরক্ষণের ক্ষেত্রে বাড়তি চাপ তৈরি হয়। বিশেষ করে কোনো মরদেহ কয়েক দিন ধরে সংরক্ষণের প্রয়োজন হলে সমস্যা আরও বাড়ে।
ফেনী জেনারেল হাসপাতালের আবাসিক চিকিৎসা কর্মকর্তা (আরএমও) ডা. রোকন উদ দৌলা মর্গের বিভিন্ন সংকটের কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেছেন, ‘স্থায়ী জনবল না থাকায় আউটসোর্সিংয়ের দুজন কর্মী দিয়ে কোনোমতে কাজ চালানো হচ্ছে। দুটি ফ্রিজারের একটি নষ্ট। ভিসেরা ক্যাবিনেট না থাকায় গুরুত্বপূর্ণ নমুনা সংরক্ষণেও সমস্যা হচ্ছে।’ মর্গে ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণের ব্যবস্থাও প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন তিনি।
হাসপাতালের তথ্য বলছে, ১৯৯৭ সালের আগে ফেনী শহরের ট্রাংক রোড এলাকায় ভূঁইয়া ও পাঠান পরিবারের মালিকানাধীন সাবেক বড় পুকুরপাড়ে মর্গের কার্যক্রম চলত। পরে ফেনী জেনারেল হাসপাতাল চত্বরের দক্ষিণ-পশ্চিম কোণে ছয় শতক জমিতে নতুন মর্গ নির্মাণ করা হয়। তবে নতুন স্থাপনা তৈরি হলেও প্রয়োজনীয় জনবল ও যন্ত্রপাতির সংকট কাটেনি।
সড়ক ও মহাসড়কে নিয়মিত ছোট-বড় দুর্ঘটনা ঘটে। এসব ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের মরদেহের ময়নাতদন্তের জন্য এই মর্গের ওপর নির্ভর করতে হয়।
ফেনী জেনারেল হাসপাতালের ভারপ্রাপ্ত তত্ত্বাবধায়ক ডা. মোবারক হোসেন দুলালের ভাষ্য, মর্গে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি ও জনবলের সংকট রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে লিখিত আবেদন করা হয়েছে। তার আশা, স্বাস্থ্য খাতে সরকারের বরাদ্দ বৃদ্ধি পাওয়ায় ভবিষ্যতে সমস্যাগুলোর সমাধান হবে।
তবে কবে নাগাদ নষ্ট ফ্রিজার ও শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্র সচল হবে, প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম কেনা হবে এবং জনবল সংকট দূর হবে, সে বিষয়ে নির্দিষ্ট সময়সীমা জানা যায়নি।



