মধুপুরে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ চলাচলে পাঁচ রোপওয়ে করিডোর

ছবি: আগামীর সময়
টাঙ্গাইলের মধুপুর গড়াঞ্চলে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে পাঁচটি বিশেষ রোপওয়ে করিডোর নির্মাণ করেছে বন বিভাগ।
টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কের প্রায় ১১ কিলোমিটার এলাকায় তৈরি করা হয়েছে এসব করিডোর। এর মাধ্যমে বানর, হনুমান, কাঠবিড়ালিসহ বৃক্ষবাসী প্রাণীরা এখন মাটিতে না নেমেই যেতে পারছে রাস্তার এক পাশ থেকে অন্য পাশে। এতে সড়ক দুর্ঘটনায় বন্যপ্রাণীর মৃত্যু কমবে বলে আশা করছে বন বিভাগ।
বন বিভাগের কর্মকর্তরা জানিয়েছেন, টাঙ্গাইলে প্রায় ৫৫ হাজার ৪৭৬ একর বনাঞ্চল রয়েছে। এর মধ্যে মধুপুর জাতীয় উদ্যানসংলগ্ন টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ আঞ্চলিক মহাসড়কের পঁচিশ মাইল থেকে রসুলপুর অংশে বন্যপ্রাণীর নিরাপদ পারাপারের জন্য পরীক্ষামূলকভাবে পাঁচটি রোপওয়ে করিডোর নির্মাণ করা হয়েছে।
মধুপুর জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জের আওতাধীন ঝুঁকিপূর্ণ স্থানে রাস্তার দুই পাশের উঁচু গাছের সঙ্গে বিশেষ কৌশলে শক্ত দড়ি সংযুক্ত করে এসব করিডোর তৈরি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে বানর, হনুমান, কাঠবিড়ালিসহ বিভিন্ন বৃক্ষবাসী প্রাণী নিরাপদে চলাচল করছে।
বন্যপ্রাণী গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, মধুপুর জাতীয় উদ্যানে বর্তমানে প্রায় ১৯০ প্রজাতির বন্যপ্রাণীর আবাস রয়েছে। এর মধ্যে ২১ প্রজাতির স্তন্যপায়ী, ১৪০ প্রজাতির পাখি এবং ২৯ প্রজাতির সরীসৃপ ও অন্যান্য প্রাণী রয়েছে।
সম্প্রতি আইইউসিএনের লাল তালিকাভুক্ত মহাবিপন্ন বাংলা লজ্জাবতী বানরের উপস্থিতিও মধুপুরের শালবনে দেখা গেছে।
স্থানীয় বাসিন্দা সিরাজুল ইসলাম জানিয়েছেন, খাদ্যের অভাব এবং বিভিন্ন প্রাকৃতিক কারণে বন্যপ্রাণী প্রায়ই বন ছেড়ে মহাসড়কে চলে আসে। বিশেষ করে বিকালের দিকে বানরগুলো পথচারীদের কাছ থেকে খাবারের আশায় রাস্তার ধারে অবস্থান করে। এতে দ্রুতগতির যানবাহনের ধাক্কায় প্রায়ই প্রাণহানির ঘটনা ঘটে।
তার মতে, রোপওয়ে করিডোর নির্মাণের ফলে এসব দুর্ঘটনা অনেকটাই কমবে।
আরেক স্থানীয় বাসিন্দা ফেরদৌস বলেছেন, রোপওয়ে করিডোর সময়োপযোগী উদ্যোগ। তবে শুধু নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থা করলেই হবে না, বন্যপ্রাণীর আবাসস্থল ও খাদ্যের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে। বন উজাড় বন্ধ করে তাদের জন্য নিরাপদ আবাস গড়ে তোলার ওপরও তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
জাতীয় উদ্যানের সহব্যবস্থাপনা কমিটির সভাপতি লাল মিয়া বলেছেন, ‘মহাসড়ক নির্মাণের ফলে মধুপুর গড়াঞ্চলের বনভূমি খণ্ডিত হয়েছে। ফলে খাদ্যের সন্ধানে রাস্তা পার হতে গিয়ে লজ্জাবতী বানরসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী যানবাহনের নিচে চাপা পড়ে মারা যাচ্ছিল।’
মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের এনভায়রনমেন্টাল সায়েন্স অ্যান্ড রিসোর্স ম্যানেজমেন্ট বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. এএসএম সাইফুল্লাহ বলেছেন, বনাঞ্চলসংলগ্ন মহাসড়কে এ ধরনের বন্যপ্রাণীবান্ধব অবকাঠামো নির্মাণ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশেও এ ধরনের রোপওয়ে করিডোর সফলভাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
মধুপুর জাতীয় উদ্যান সদর রেঞ্জের ডেপুটি রেঞ্জার মো. মোশাররফ হোসেন আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণে মধুপুর শালবন প্রতিষ্ঠা প্রকল্পের আওতায় পরীক্ষামূলকভাবে পাঁচটি রোপওয়ে করিডোর নির্মাণ করা হয়েছে। এরইমধ্যে বন্যপ্রাণীর চলাচলের ইতিবাচক লক্ষণ দেখা যাচ্ছে। উদ্যোগটি সফল হলে বনাঞ্চলের অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ স্থানেও একই ধরনের করিডোর নির্মাণ করা হবে।
টাঙ্গাইলের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা ড. আবু নাসের মোহসিন হোসেন আগামীর সময়কে জানিয়েছেন, প্রকল্পটি ২০২৫ সালের এপ্রিল থেকে শুরু হয়েছে এবং ২০২৮ সালের মার্চ পর্যন্ত চলবে। রোপওয়ে করিডোর চালু হওয়ায় বানর, হনুমান, সিভেটসহ বিভিন্ন বন্যপ্রাণী নিরাপদে চলাচল করতে পারছে। প্রকল্পটি পুরোপুরি বাস্তবায়িত হলে সড়ক দুর্ঘটনায় বন্যপ্রাণীর মৃত্যুর ঝুঁকি আরও কমে আসবে।





