নাজমুলের ছাদবাগান

ছবি: আগামীর সময়
সকালের সূর্য যখন গাজীপুরের কালীগঞ্জ পৌরসভার ভাদার্ত্তী দক্ষিণপাড়া গ্রামের ঘরবাড়ির ছাদ ছুঁয়ে যায়, তখন বেশিরভাগ মানুষ দিনের কাজে হয়ে পড়েন ব্যস্ত। কিন্তু মো. নাজমুল হোসেনের সকালটা একটু ভিন্ন। অফিসের ফাইল বা বাজারের ব্যাগ নয়, তার হাতে থাকে পানির পাইপ, কোদাল আর গাছের পরিচর্যার বিভিন্ন সরঞ্জাম। দিনের শুরুতেই তিনি চলে যান নিজের ছাদবাগানে— যে বাগান এখন তার পরিবারের নিরাপদ খাদ্যের অন্যতম উৎস।
একতলা বাড়ির ছাদে পা রাখলেই মনে হয় যেন শহরের ভেতরে গড়ে ওঠা একটি ছোট কৃষি খামার। কোথাও ঝুলছে লাউ, কোথাও শিমের লতা দুলছে বাতাসে। সারি সারি টবে বেড়ে উঠছে ঢেঁড়স, বেগুন, টমেটো, করলা, বরবটি, কলমিশাক, পুঁইশাক, ঝিঙা, মিষ্টিকুমড়া ও কাঁচা মরিচ।
শুধু সবজিই নয়, ছাদের একাংশ জুড়ে রয়েছে বিভিন্ন ফলের গাছও। ড্রাগন, পেয়ারা, ডালিম, মালবেরি, ফিলিপাইন আখ ও পেঁপে মিলিয়ে ছাদটি যেন হয়ে উঠেছে এক ক্ষুদ্র সবুজ পৃথিবী।
প্রায় দুই বছর আগে নিছক শখ থেকেই ছাদবাগান শুরু করেছিলেন নাজমুল। তখন কয়েকটি টব আর কিছু মৌসুমি গাছ দিয়ে শুরু হওয়া উদ্যোগটি সময়ের সঙ্গে হয়েছে বিস্তৃত। পরিবারের প্রয়োজনীয় অনেক সবজিই কিনতে হয় না তাকে। নিজের ছাদেই উৎপাদিত হয়।
নাজমুল হোসেন বলেছেন, ‘ছাদের সবজির স্বাদ আলাদা। কারণ, এগুলো উৎপাদন করা হয় জৈব পদ্ধতিতে। পরিবারের চাহিদা পূরণের পাশাপাশি প্রতিবেশী ও পরিচিতদের মধ্যেও ভাগ করে দিই সবজি।’
তিনি জানালেন, শুরুতে চাষাবাদ সম্পর্কে ধারণা ছিল না খুব বেশি। মানুষের কাছ থেকে পরামর্শ নিয়েছেন। পরে কৃষিবিষয়ক ভিডিও, অনলাইন প্ল্যাটফর্ম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিভিন্ন গ্রুপ থেকে নতুন তথ্য সংগ্রহ করে অভিজ্ঞতাকে করেছেন সমৃদ্ধ।
এই উদ্যোগে নাজমুল একা নন। তার সহধর্মিণী লিমা আক্তারও সমানভাবে যুক্ত রয়েছেন বাগানের পরিচর্যায়। ভারী টব সরানো, মাটি সংগ্রহ, চারা রোপণ কিংবা গাছের যত্ন— প্রতিটি কাজেই রয়েছে তার সক্রিয় অংশগ্রহণ।
লিমা আক্তারের ভাষায়, ‘প্রতিদিন অন্তত একবার ছাদে না এলে ভালো লাগে না। নতুন পাতা, ফুল কিংবা ফল দেখতে খুব আনন্দ হয়। নিজের হাতে পরিচর্যা করা গাছের ফল ও সবজি খাওয়ার অনুভূতি সত্যিই অন্যরকম।’
ছাদবাগান শুধু খাদ্য উৎপাদনের জায়গা নয়; এটি পরিবারের সদস্যদের মানসিক প্রশান্তিরও একটি আশ্রয়— মনে করেন তিনি।
নাজমুলের পরিবারও বেশ বড়। বাবা-মা, সন্তান, ছোট ভাই এবং তার পরিবার— সব মিলিয়ে এক ছাদের নিচে বসবাস করেন তারা। ব্যস্ত জীবনের ফাঁকে পরিবারের সদস্যদের অনেক আড্ডা ও মিলনমেলাও বসে এই ছাদবাগান ঘিরে। ফলে বাগানটি শুধু সবুজের সমারোহ নয়, পারিবারিক বন্ধনেরও একটি কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠেছে।
নাজমুল মনে করেন, সফল ছাদবাগানের জন্য প্রয়োজন হয় না বড় জায়গা। দরকার আগ্রহ, পরিকল্পনা এবং নিয়মিত পরিচর্যা।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শাহরিয়ার মোরসালিন মেহেদীর মতে, ছাদবাগান শুধু খাদ্য উৎপাদনের মাধ্যম নয়; এটি পরিবেশ সংরক্ষণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
‘গাছপালা বাতাসের কার্বন ডাইঅক্সাইড শোষণ করে অক্সিজেন সরবরাহ করে, ভবনের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে এবং নগর এলাকায় সবুজের পরিমাণ বাড়ায়। পাশাপাশি বৃষ্টির পানি ধারণ করে জলাবদ্ধতা কমাতেও ভূমিকা রাখতে পারে’— বলেন তিনি।




