তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতে ডুবল কুমিল্লা, নৌকায় পরীক্ষা কেন্দ্রে শিক্ষার্থীরা

ভারী বৃষ্টিতে পানির নিচে তলিয়ে গেছে কুমিল্লা নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা। ছবি: আগামীর সময়
মাত্র তিন ঘণ্টার ভারী বৃষ্টিতে পানির নিচে তলিয়ে গেছে কুমিল্লা নগরীর বিস্তীর্ণ এলাকা। প্রধান সড়ক, অলিগলি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, ব্যবসা প্রতিষ্ঠান ও বাসাবাড়িতে পানি ঢুকে সৃষ্টি হয়েছে জলাবদ্ধতা। এতে কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে জনজীবন।
সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন এইচএসসি পরীক্ষার্থী, রোগী ও নিম্ন আয়ের মানুষ।
আজ সোমবার ভোর থেকে সকাল ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় কুমিল্লায় রেকর্ড করা হয়েছে ১০৭ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত। গত ২৪ ঘণ্টায় জেলায় মোট বৃষ্টিপাত হয়েছে ১৩৮ দশমিক ২ মিলিমিটার।
কুমিল্লা আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, দিনভর আরও ভারী বৃষ্টির সম্ভাবনা রয়েছে। ফলে আরও বাড়তে পারে জলাবদ্ধতা।
সরেজমিন দেখা যায়, নগরীর মনোহরপুর, মহিলা কলেজ সড়ক, বাগানবাড়ি, দক্ষিণ চর্থা, জিলা স্কুল সড়ক, পুলিশ লাইনস, উত্তর রেসকোর্স, ঠাকুরপাড়া, বিসিক শিল্পনগরী, গোবিন্দপুর, মুরাদপুর ও ছায়াবিতান এলাকায় পানি জমে গেছে হাঁটু থেকে কোমরসমান। অনেক এলাকায় ড্রেন উপচে সড়কে ছড়িয়ে পড়ে ময়লা-আবর্জনাযুক্ত পানি। এতে যান চলাচল ব্যাহত হয় এবং দুর্ভোগে পড়তে হয় সাধারণ মানুষকে।
ভারী বৃষ্টিতে কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ ও কুমিল্লা সরকারি কলেজ কেন্দ্রেও জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। অনেক পরীক্ষার্থী হাঁটুপানি মাড়িয়ে কেন্দ্রে পৌঁছান। কেউ কেউ নৌকায় করে পরীক্ষাকেন্দ্রে যান। কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে পরীক্ষার্থীদের জন্য নৌকার ব্যবস্থাও করা হয়।
কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের মানবিক বিভাগের শিক্ষার্থী জান্নাত বলেছেন, ‘আজ সকালে পরীক্ষা দিতে এসে দেখেন পুরো রাস্তা ও কলেজ প্রাঙ্গণ পানিতে তলিয়ে গেছে। হেঁটে যাওয়া সম্ভব না হওয়ায় নৌকায় করে কেন্দ্রে যেতে হয়েছে।’
কয়েকজন পরীক্ষার্থী জানালেন, এমন দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতিতে স্থগিত রাখা উচিত ছিল পরীক্ষা। ভেজা কাপড়ে পরীক্ষা দিতে হয়েছে অনেককে। কেউ কেউ পানিতে পড়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটেছে।
কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত অধ্যক্ষ অধ্যাপক এ কে এম জহিরুল আলম বলেছেন, ‘অতিরিক্ত বৃষ্টিপাতের কারণে সাময়িকভাবে জলাবদ্ধতার সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার্থীদের যেন কোনো ধরনের অসুবিধা না হয়, সে বিষয়ে কলেজ প্রশাসন প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছে।’
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর আবুল বাসার জানালেন, এ কেন্দ্রে আটটি কলেজের প্রায় ২ হাজার ১০০ পরীক্ষার্থী অংশ নিয়েছে। মাঠে পানি জমলেও পরীক্ষার কক্ষে পানি ঢোকেনি। যারা জলাবদ্ধতার কারণে কিছুটা দেরিতে কেন্দ্রে এসেছে, তাদের অতিরিক্ত সময় দিতে শিক্ষা বোর্ড থেকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
কুমিল্লা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান প্রফেসর আহসান পারভেজ বলেছেন, ‘শিক্ষা বোর্ডের অধীন ছয় জেলায় কয়েকটি কেন্দ্রের সামনে জলাবদ্ধতা হলেও কোনো পরীক্ষা কক্ষে পানি প্রবেশ করেনি। যেসব পরীক্ষার্থী জলাবদ্ধতার কারণে দেরিতে এসেছে, তাদের বিষয়ে মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে ব্যবস্থা নিতে কেন্দ্র কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।’
জলাবদ্ধতার কারণে কুমিল্লা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও কুমিল্লা জেনারেল (সদর) হাসপাতালেও পানি ঢুকে পড়ে। রোগী, স্বজন, চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের হাঁটুপানি মাড়িয়ে প্রবেশ করতে হয় হাসপাতালে।
কুমিল্লার সিভিল সার্জন ডা. আলী নুর মোহাম্মদ বশির আহমেদ জানালেন, বাইরে থেকে অতিরিক্ত পানি হাসপাতাল চত্বরে ঢুকেছে। তবে বিকল্প ব্যবস্থায় জরুরি বিভাগের চিকিৎসাসেবা চালু রাখা হয়েছে। বৃষ্টি থেমে গেলে পানি দ্রুত নেমে যাবে বলেও তিনি আশা প্রকাশ করেন।
টানা বৃষ্টিতে পানি ঢুকে পড়েছে বহু বাসাবাড়ি ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে। এতে দুর্ভোগে পড়েছেন হাজারো মানুষ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন নিম্ন আয়ের পরিবার, দিনমজুর ও কর্মজীবীরা। অনেক পরিবারের আসবাবপত্র ও প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে।
নগরীর মহিলা কলেজ সড়কের বাসিন্দা ও অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা খলিলুর রহমান জানালেন, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় কুমিল্লায় এত ভয়াবহ জলাবদ্ধতা দেখা যায়নি। অতিবৃষ্টির কারণেই এ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে।
এদিকে জলাবদ্ধতার সুযোগে রিকশা ও ব্যাটারিচালিত অটোরিকশার ভাড়া দ্বিগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এতে অতিরিক্ত ভাড়া গুনতে বাধ্য হচ্ছেন যাত্রীরা।
কুমিল্লা সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মো. ইউসুফ মোল্লা টিপু জানালেন, পরীক্ষা শুরুর আগেই তিনি সরকারি মহিলা কলেজ কেন্দ্রে গিয়ে শিক্ষার্থীদের নিরাপদে কেন্দ্রে প্রবেশের ব্যবস্থা করেন। জলাবদ্ধতা নিরসনে কাজ চলছে। তার আশা, বৃষ্টি থেমে গেলে দ্রুত পানি নেমে যাবে।






