নড়াইল
‘একটা গরু পুষি, তাও বাইন্ধে রাখার মতো জায়গা নাই’

নড়াইলের ইসলামপুরে নবগঙ্গা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে হুমকির মুখে বসতবাড়ি। দ্রুত ভাঙনরোধের দাবিতে এলাকাবাসী—ছবি: সংগৃহীত
নড়াইলের নড়াগাতী থানার মাউলি ইউনিয়নের ইসলামপুর গ্রাম। নবগঙ্গা নদীর ভাঙনে গত ১০ বছর ধরে গ্রামটির বসতবাড়ি, গাছপালা ও ফসলি জমি বিলীন হচ্ছে। কিন্তু ভাঙনরোধে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাই দ্রুত নদীভাঙন রোধে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
ইসলামপুর গ্রামের খাজা ফকির জানালেন, গত ১০ বছরে নদীগর্ভে অন্তত ৬০টি বসতবাড়ি বিলীন হয়েছে। তিনি নড়াইল-১ আসনের সংসদ সদস্য বিশ্বাস জাহাঙ্গীর আলম। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে দ্রুত ভাঙনরোধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তিনি বললেন, ‘আমাদের গ্রামটা রক্ষা করুন।
আতিয়ার মোল্যা বললেন, ‘প্রায় এক দশক ধরে ইসলামপুর পূর্বপাড়া নদীভাঙনের কবলে রয়েছে। কিন্তু এখনো কোনো কাজ হয়নি। ভাঙনের কারণে অনেক পরিবার আশ্রয়ণ প্রকল্পে চলে গেছে। কেউ কেউ ভাড়াবাসায় থাকছেন। তিনি দ্রুত ভাঙনরোধের কাজ শুরুর দাবি জানান।
‘ইসলামপুর গ্রামের অনেক বসতবাড়ি ইতোমধ্যে নদীতে বিলীন হয়েছে। এখনই ব্যবস্থা না নিলে আরও ৮০ থেকে ৯০টি বসতবাড়ি এবং বিস্তীর্ণ ফসলি জমি হুমকির মুখে পড়বে।’—বললেন স্থানীয় আতিক কাজী।
ময়না বেগম জানালেন, এই বসতভিটা ছাড়া আমাদের আর কোনো জায়গা নেই। এটুকুও নদীতে চলে গেলে আমরা কোথায় যাব? আমরা গরিব মানুষ।
‘ভাঙনের আতঙ্কে রাতে ঠিকমতো ঘুমাতে পারেন না। তাদের দুটি ঘর ইতোমধ্যে নদীতে চলে গেছে। আরেকটি ঘর ভাঙনের মুখে। ছেলে-মেয়েরাও আতঙ্কে থাকে।’—জানালেন রোজিনা বেগম (৪৫) নামের আরেকজন।
তিনি বললেন, ‘একটা গরু পুষি, তাও বাইন্ধে রাখার মতো জায়গা নাই। পরের জায়গায় রাখি। আমাদের একটাই দাবি, নদী বাইন্ধে দেন।’
আজগর মোল্যা বললেন, ‘নদীভাঙনের কারণে তার দুই চাচা প্রায় পাঁচ বছর আগে গ্রাম ছেড়ে যেতে বাধ্য হয়েছেন। এখন তার নিজের জমিও ভাঙছে। প্রায় দেড় কিলোমিটার এলাকায় ভাঙন প্রতিরোধ করা জরুরি। তা না হলে এখানে বসবাস করা কঠিন হয়ে পড়বে।’
ভুক্তভোগী আরও অনেকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাদের বসতভিটা ও ফসলি জমি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। দীর্ঘদিনের ভাঙনে নদীর ওপারে এখন তাদের হারানো জমির চর জেগে উঠেছে। কিন্তু সেই জমি তাদের কোনো কাজে আসছে না। অবশিষ্ট বাড়িঘর, গাছপালা ও কৃষিজমি রক্ষায় দ্রুত ভাঙনরোধের দাবি জানান তারা।
ভাঙন প্রতিরোধের দাবিতে গত ৩ জুলাই ভাঙনকবলিত এলাকায় মানববন্ধনও করেন স্থানীয়রা। তারা জানান, ভাঙনের ভয় নিয়ে দিন-রাত কাটছে। দীর্ঘদিনের ভাঙনে গ্রামের অর্ধশতাধিক বসতবাড়ি নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। অনেকে ভূমিহীন হয়ে আশ্রয়ণ প্রকল্পে বসবাস করছেন। আবার অনেকে ভাড়াবাসায় রয়েছেন।
বর্তমানে আরও ৮০ থেকে ৯০টি বসতবাড়ি এবং বিস্তীর্ণ ফসলি জমি নদীভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। এলাকাবাসীর দাবি, অন্তত দেড় কিলোমিটার এলাকায় স্থায়ী ভাঙন প্রতিরোধের ব্যবস্থা নিতে হবে।
এ বিষয়ে নড়াইল পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী অভিজিৎ কুমার সাহা বললেন, ‘মধুমতি ও নবগঙ্গা অত্যন্ত ভাঙনপ্রবণ নদী। এসব নদীর ভাঙন প্রতিরোধে একটি প্রকল্প মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। প্রকল্পটি অনুমোদন পেলে স্থায়ীভাবে কাজ শুরু করা হবে।’
‘বর্ষা মৌসুমে জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় আপদকালীন কাজের প্রস্তুতি রয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রয়োজন অনুযায়ী ব্যবস্থা নিয়ে মানুষের বসতবাড়ি ও গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষার চেষ্টা করা হবে। এবারের বর্ষা মৌসুমেও সেই প্রস্তুতি রয়েছে।’—যোগ করলেন তিনি।




