পার্বতীপুর
দাদনের ৯০ হাজার টাকার অজুহাতে অর্ধকোটি টাকার জমি দখল!

ভুক্তভোগী লাল চাঁন
দিনাজপুরের পার্বতীপুরে এক অসহায় পরিবারের প্রায় অর্ধকোটি টাকা মূল্যের জমি জালিয়াতির মাধ্যমে দলিল করে নেওয়া এবং আরও জমি জবরদখলে রাখার অভিযোগ উঠেছে কয়েকজন প্রভাবশালীর বিরুদ্ধে।
ভুক্তভোগী লাল চাঁনের অভিযোগ, তার বাবা হত্যাকাণ্ডের শিকার হওয়ার পর পরিবারের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে দাদন ব্যবসার পাওনা টাকার অজুহাতে তাদের ২৫ শতক জমি লিখে নেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া আরও ১৫ শতক জমি কোনো দলিল ছাড়াই দখলে রেখেছে অভিযুক্তরা।
অভিযোগ রয়েছে, জমি রেজিস্ট্রির সময় লাল চাঁনকে অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়া সত্ত্বেও প্রাপ্তবয়স্ক দেখানো হয়েছে। এমনকি দলিলে অন্য ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বরও ব্যবহার করা হয়েছে। জমি উদ্ধারে বিনামূল্যে আইনি সহায়তা চেয়ে দিনাজপুর জেলা লিগ্যাল এইড কার্যালয়ে আবেদন করেছেন তিনি। আদালতে মামলা করার প্রস্তুতি হিসেবে প্রয়োজনীয় কাগজপত্রও সংগ্রহ করছেন।
ঘটনাটি পার্বতীপুর উপজেলার পলাশবাড়ী ইউনিয়নের এরশাদনগর গ্রামের। পার্বতীপুর-ফুলবাড়ী সড়কসংলগ্ন এসব জমির মালিকানা নিয়ে বর্তমানে বিরোধ চলছে।
লাল চাঁন জানান, তার বয়স যখন ১৪ বছর, তখন এক গভীর রাতে তার বাবা হেলালকে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যায় অজ্ঞাতপরিচয় দুর্বৃত্তরা। পরে বাড়ির পাশের বনের একটি গাছের সঙ্গে বেঁধে তাকে হত্যা করা হয়। বাবাকে হারানোর শোক কাটিয়ে ওঠার আগেই দাদন ব্যবসায়ীদের চাপ ও নির্যাতনের মুখে পড়ে তার পরিবার।
লাল চাঁনের অভিযোগ, স্থানীয় একটি দাদন ব্যবসায়ী চক্র তার বাবা হেলালের কাছে ৯০ হাজার টাকা পাওনা দাবি করে। এই টাকা আদায়ের অজুহাতে তার ও পরিবারের সদস্যদের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হয়। একপর্যায়ে সুদে-আসলে পাওনা টাকা জমির মূল্যমানের সমান হয়ে গেছে দাবি করে জমি লিখে দিতে বাধ্য করা হয়।
তার ভাষ্য, পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন হাবড়া মৌজার ১৫৯১ নম্বর খতিয়ানের ৫৭১ নম্বর দাগ এবং ১৬৪৫ নম্বর ডিপি খতিয়ানের ৩৬৫ নম্বর দাগের মোট ২৫ শতক জমি রেজিস্ট্রি করে নেওয়া হয়।
লাল চাঁন জানান, ২০২১ সালের ২৩ ডিসেম্বর ৮১৯৫ নম্বর দলিলের মাধ্যমে তার ও পরিবারের অন্য চার সদস্যের ১০ শতক জমি রবিউল ইসলামের নামে রেজিস্ট্রি করা হয়। এ সময় তাকে প্রাপ্তবয়স্ক দেখানো হয় এবং অন্য ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করা হয় বলে অভিযোগ তার। দলিলটি লেখেন ডিড রাইটার তোফাজ্জল হোসেন।
এর ছয় দিন পর, ২৯ ডিসেম্বর মোখলেছুর রহমান নামের আরেক ডিড রাইটার আরও ১৫ শতক জমি নাসিমা বেগমের নামে রেজিস্ট্রি করে দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। লাল চাঁনের দাবি, দলিলে তাকে ১০ শতক জমির বিক্রেতা হিসেবে দেখানো হয়েছে। অথচ দলিল সম্পাদনের সময় তিনি উপস্থিত ছিলেন না। এ দলিলেও অন্য ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর ব্যবহার করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও জানান, ২০২৩ সালে মায়ের চিকিৎসার খরচ জোগাতে নিজের নামে থাকা জমি বিক্রির উদ্যোগ নেন। তখন রবিউল ইসলাম ও নাসিমা বেগম তাকে জানান, জমি তারা কিনে নিয়েছেন। সেখানে তার আর কোনো জমি নেই। এ সময় তাকে হুমকি দিয়ে গ্রামছাড়া করা হয় বলেও অভিযোগ করেন লাল চাঁন।
এ ছাড়া দলিলের বাইরে তার মায়ের নামে থাকা আরও ১৫ শতক জমিও অভিযুক্তরা দখলে রেখেছে বলে দাবি তার। প্রাণভয়ে প্রায় তিন বছর ঢাকার একটি কারখানায় শ্রমিক হিসেবে কাজ করে আত্মগোপনে ছিলেন লাল চাঁন। ২০২৩ সালে প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয় থেকে দলিলের প্রত্যয়িত অনুলিপি সংগ্রহ করেন। এরপর জমি হস্তান্তরের বিষয়টি জানতে পারেন তিনি।
এ বিষয়ে প্রত্যক্ষদর্শী হিসেবে দাবি করা ভবানীপুর গ্রামের নাজমুল ও দুর্গাপুর গ্রামের রেজওয়ানার সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তারা বলেছেন, লাল চাঁন ও তার পরিবারের কাছ থেকে জোর করে জমি লিখে নেওয়া হয়েছিল। রবিউল ইসলাম ও নাসিমা বেগমের ভয়ে লাল চাঁন ও তার পরিবারের সদস্যরা একাধিকবার তাদের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছিলেন বলেও দাবি করেন তারা।
অভিযোগের বিষয়ে দলিল লেখক তোফাজ্জল হোসেন ও মোখলেছুর রহমান বলেন, লাল চাঁন অপ্রাপ্তবয়স্ক ছিলেন— এ তথ্য তাদের জানানো হয়নি। বিষয়টি অনিচ্ছাকৃত ভুল ছিল বলে দাবি করেন তারা। তবে দলিল সম্পাদনের সময় জাতীয় পরিচয়পত্রের ছবি ও পরিচয় যাচাইয়ের সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কেন তা যথাযথভাবে করা হয়নি, সে বিষয়ে তারা ব্যাখ্যা দিতে পারেননি।
জমি ক্রেতা রবিউল ইসলাম বলেছেন, লাল চাঁনের নামীয় জমির মূল্য তাকে দিয়ে বিষয়টি মীমাংসা করে নেওয়া হবে।
অভিযোগের বিষয়ে নাসিমা বেগমের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করেও তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত সাব-রেজিস্ট্রার উম্মে সালমা মোবাইল ফোনে বলেছেন, অপ্রাপ্তবয়স্ক লাল চাঁনের দলিল সম্পাদনের দায় ডিড রাইটারদের। এ জন্য সাব-রেজিস্ট্রার দায়ী নন বলে দাবি করেন তিনি।





