দখল, ঝাঁক আর কচুরিপানায় বিপর্যস্ত ধনাগোদা নদী, বন্ধ নৌযান চলাচল

নদীজুড়ে কচুরিপানা। ছবি : আগামীর সময়
একসময় বৃহত্তর মতলবের নৌযান চলাচলের প্রধান পথ ছিল ধনাগোদা নদী। ঢাকা, নারায়ণগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে পণ্য পরিবহনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখা নদীটি এখন দখল, অবৈধ মাছ ধরার ঝাঁক ও কচুরিপানার কারণে বিপর্যস্ত। চাঁদপুরের মতলব উত্তরে অন্তত ১০ কিলোমিটার এলাকাজুড়ে কচুরিপানার স্তূপ জমে বন্ধ হয়ে গেছে নৌযান চলাচল। অচল হয়ে পড়েছে কয়েকটি লঞ্চঘাট। কোথাও কচুরিপানার ওপর দিয়ে হেঁটে চলাচল করছেন মানুষ। এতে ভোগান্তিতে পড়েছেন দুই পাড়ের বাসিন্দা, শিক্ষার্থী ও নৌযানশ্রমিকরা।
সরেজমিনে দেখা যায়, কালীরবাজার লঞ্চঘাট থেকে শ্রী রায়েরচর সেতু পর্যন্ত প্রায় তিন কিলোমিটার এলাকায় একেবারেই বন্ধ নৌযান চলাচল। এই তিন কিলোমিটার নদীজুড়ে কচুরিপানার ঘন স্তর জমেছে। মতলব ধনাগোদার খেয়াঘাট, দুর্গাপুর, শ্রী রায়েরচর, বাংলাবাজার, রায়েরকান্দি, কালীরবাজার, নন্দলালপুর, বাইশপুর, গাজীপুর মোড়, সাহেববাজার, লক্ষ্মীপুর, টরকী, মাছুয়াখাল, শাহপুর ও নায়েরগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকায় একই চিত্র। কচুরিপানার কারণে আটকে পড়েছে কয়েকটি বালুবাহী বাল্কহেড।
শ্রমিকদের অভিযোগ, প্রায় এক মাস ধরে শ্রী রায়েরচর সেতু এলাকায় আটকে আছে তাদের নৌযান। চলাচল বন্ধ থাকায় নৌযানেই দিন কাটছে তাদের।
নদীর এমন অবস্থায় সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে দুই পাড়ের বাসিন্দা ও শিক্ষার্থীরা। দাউদকান্দি অংশ থেকে ধনাগোদা তালতলী স্কুল অ্যান্ড কলেজে আসা শিক্ষার্থীদের নদীপথ ব্যবহার করতে না পেরে প্রায় পাঁচ কিলোমিটার ঘুরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে।
শিক্ষার্থী রুহান, ফাতেমা ও জান্নাতী আক্তার জানান, নদীতে কচুরিপানা জমে থাকায় যাতায়াতে চরম সমস্যা হচ্ছে তাদের। আগে যে পথে সহজে যাতায়াত করা যেত, এখন সেই পথে চলাচল বন্ধ। ফলে দীর্ঘ পথ ঘুরে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে হচ্ছে।
ধনাগোদা তালতলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ ফারুকুল ইসলাম বলেছেন, নদীর দুই পাড়ে অসংখ্য অবৈধ মাছ ধরার ঝাঁক রয়েছে। এসব ঝাঁকে কচুরিপানা আটকে নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। এতে নৌযান চলাচল ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় মানুষের দুর্ভোগও বাড়ছে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, গত পাঁচ থেকে সাত বছরে নদীর নাব্যতা হ্রাস, অবৈধ দখল এবং মাছ ধরার ঝাঁক স্থাপনের কারণে স্বাভাবিক প্রবাহ বাধাগ্রস্ত হয়েছে। পাশাপাশি শ্রী রায়েরচর সেতুর অপরিকল্পিত নির্মাণও পানির প্রবাহে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করছে। এসব কারণে কচুরিপানা আটকে নদীটি এখন জলাভূমিতে পরিণত হয়েছে।
মতলব উত্তর উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির সভাপতি শামসুজ্জামান ডলার জানান, ধনাগোদা নদীকে বাঁচাতে হলে অবৈধ দখল ও মাছ ধরার ঝাঁক উচ্ছেদের পাশাপাশি নদীর নাব্যতা ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নিতে হবে। নদীটির স্বাভাবিক প্রবাহ ফিরিয়ে আনতে প্রয়োজন কার্যকর ও স্থায়ী পরিকল্পনা।
মতলব উত্তর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মাহমুদা কুলসুম মনি জানান, বিষয়টি তাদের নজরে এসেছে। ইতিমধ্যে জেলা প্রশাসকের সঙ্গে এ বিষয়ে কথা হয়েছে। স্থায়ীভাবে সমস্যা সমাধানে কচুরিপানা অপসারণ ও অবৈধ মাছ ধরার ঝাঁক উচ্ছেদের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
চাঁদপুরের জেলা প্রশাসক আহমেদ জিয়াউর রহমান বলেন, জেলার নদীগুলোকে অবৈধ দখলমুক্ত করতে বৃহৎ পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। চাঁদপুর শহরসংলগ্ন ডাকাতিয়া নদীতে ৭৩৬টি অবৈধ দখল চিহ্নিত করা হয়েছে। ডিসেম্বর থেকে সেখানে উচ্ছেদ অভিযান শুরু হবে। মেঘনা ও ধনাগোদা নদীর অবৈধ দখল এবং নদীর মধ্যে কচুরিপানা ও মাছ ধরার ঝাঁক দিয়ে মাছ চাষের বিষয়টিও গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হবে। পর্যায়ক্রমে প্রতিটি নদী অবৈধ দখলমুক্ত করে স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত করা হবে।




