জালালাবাদের কাঁধে ২০০ কোটি

সংগৃহীত ছবি
হাজার-হাজার কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি করলেও হবিগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠান নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করছে না। ফলে জালালাবাদ গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন সিস্টেম লিমিটেডের (জেজিটিডিএসএল) কাছে তাদের বকেয়া জমেছে প্রায় ২০০ কোটি টাকা। এ কারণে গ্যাস-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গিয়ে সরকারি লোকদের পড়তে হয়েছে তাদের বাধার মুখেও।
জেজিটিডিএসএল হবিগঞ্জের শাহজীবাজার কার্যালয়ের আওতায় ঢাকা-সিলেট মহাসড়কের পাশে ক্যাপটিভ পাওয়ারের ৪২টি ও শিল্পশ্রেণির ৩৯টিসহ মোট ৮১টি বাণিজ্যিক গ্যাস-সংযোগ রয়েছে। এসব সংযোগে মাসে গড়ে ৫ কোটি (৫০ মিলিয়ন) ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ করা হয়। পেট্রোবাংলার মাধ্যমে হবিগঞ্জ গ্যাসফিল্ডস লিমিটেড ও গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেড (জিটিসিএল) থেকে প্রায় ১৫০ কোটি টাকায় এ গ্যাস কেনা হয়। প্রতি ঘনমিটারে ৩০ টাকা মূল্যের বিপরীতে কমিশন বাবদ ১৮ পয়সা হিসাবে মাসে প্রায় ৯০ লাখ টাকা আয় করে জেজিটিডিএসএল।
শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব বিদ্যুৎ উৎপাদনে ক্যাপটিভ পাওয়ার এবং পণ্য উৎপাদন প্রক্রিয়ায় শিল্পশ্রেণির গ্যাস-সংযোগ ব্যবহার করে। এসব প্রতিষ্ঠান প্রতি মাসে হাজার হাজার কোটি টাকার পণ্য উৎপাদন ও বিক্রি করলেও নিয়মিত গ্যাস বিল পরিশোধ করছে না।
বর্তমানে পাঁচটি প্রতিষ্ঠানের কাছে ৭৪ কোটি ৫০ লাখসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের মোট প্রায় ২০০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে, যা তাদের জমা রাখা জামানতের বহুগুণ। এতে চাপ তৈরি হয়েছে প্রতিষ্ঠানটির আর্থিক ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনায়।
ক্যাপটিভ পাওয়ার সংযোগের গ্রাহকদের মধ্যে টাইলস ও স্যানিটারি ওয়্যার উৎপাদনকারী ‘স্টার সিরামিকস প্রাইভেট লিমিটেডের’ ২২ কোটি এবং পোর্সেলিন টেবিলওয়্যার উৎপাদনকারী ‘স্টার পোর্সেলিন লিমিটেডের’ বকেয়া সাড়ে ৩ কোটি টাকা।
অন্যদিকে শিল্পশ্রেণির সংযোগে ‘স্টার সিরামিকস প্রাইভেট লিমিটেডের’ ৪০ কোটি, ‘স্টার পোর্সেলিন লিমিটেডের’ ৭ কোটি এবং ডিটারজেন্ট, সাবান ও অন্যান্য গৃহস্থালি পরিচ্ছন্নতাবিষয়ক ভোগ্যপণ্য উৎপাদনকারী ‘এসএকে কনজ্যুমার প্রোডাক্টস লিমিটেডের’ ২ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে।
গ্যাস আইন-২০১০ ও গ্যাস বিপণন বিধিমালা-২০২৬ অনুযায়ী, বিল পরিশোধে ৪৫ দিন অতিক্রম করলে গ্যাস-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা যায়। অথচ ওই পাঁচটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানের বকেয়া ৫ থেকে ৮ মাসের। গত সোমবার মাধবপুর থানার চারজন পুলিশ সদস্য ও জিটিসিএলের ১০ সদস্যের একটি দল স্টার সিরামিকসে গ্যাস-সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে কারখানার গেট বন্ধ করে দেওয়া হয়। একপর্যায়ে কয়েকশ শ্রমিকের বাধার মুখে দলটি ফিরে আসে।
জেজিটিডিএসএলের শাহজীবাজার কার্যালয়ের ব্যবস্থাপক খালেদ গণি বলছিলেন, ‘৮১টি গ্যাস-সংযোগের মধ্যে বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের দেড় থেকে দুই মাসের বিল মিলিয়ে প্রায় ২০০ কোটি টাকা বকেয়া রয়েছে। তবে তারা ৪৫ দিন পার হওয়ার পর বিলম্ব ফিসহ বিল পরিশোধ করে। কিন্তু ওই পাঁচটি প্রতিষ্ঠান ৬ থেকে ১২ মাস ধরে বিল পরিশোধ করছে না; উল্টো বাধা দিচ্ছে সরকারি দায়িত্ব পালনে। অথচ প্রতি মাসে কমিশন বাবদ পাওয়া প্রায় ৯০ লাখ টাকা দিয়েই জালালাবাদ গ্যাসের পরিচালন ব্যয় মেটানো হয়।’ তিনি যোগ করেন, ‘এভাবে চলতে থাকলে বিপাকে পড়বে আমাদের প্রতিষ্ঠান। এ বিষয়ে আরও কঠোর আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে।’
পরিচয় গোপন রাখার শর্তে কোম্পানির এক কর্মকর্তা বললেন, দেশে বর্তমানে দৈনিক প্রায় ৩ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট (এমএমসিএফডি) গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ হচ্ছে প্রায় ২ হাজার ৭০০ এমএমসিএফডি। প্রায় ১ হাজার ১০০ এমএমসিএফডির ঘাটতিতে দেশের বিভিন্ন শিল্পাঞ্চলে উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে, সীমিত রয়েছে নতুন গ্যাস-সংযোগও। এমন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন ধরে বিল পরিশোধ না করেও গ্যাস-সংযোগ বহাল রাখার চেষ্টা করছে কিছু শিল্পপ্রতিষ্ঠান। প্রশাসনের অসহযোগিতায় ব্যবস্থা নেওয়া যাচ্ছে না।




