মুকসুদপুর
কুমার নদ এখন বর্জ্যের ভাগাড়

ছবি: আগামীর সময়
একসময় জীববৈচিত্র্য ও দেশীয় প্রজাতির মাছের সমৃদ্ধ আবাসস্থল ছিল গোপালগঞ্জের মুকসুদপুর উপজেলার কুমার নদ। স্বচ্ছ পানির এ নদ দুই পাড়ের কৃষিজমিকে করেছে উর্বর, মানুষের জীবন-জীবিকার সঙ্গে গড়ে তুলেছে নিবিড় সম্পর্ক। কিন্তু বর্তমানে মুকসুদপুর পৌরসভার বর্জ্য নিয়মিত নদীতে ফেলার কারণে নদটি ভয়াবহ দূষণের মুখে পড়েছে। নদের পানি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ছে, চারদিকে ছড়িয়ে পড়ছে দুর্গন্ধ। একই সঙ্গে মশা-মাছির উপদ্রব বৃদ্ধি পাওয়ায় জনস্বাস্থ্য নিয়েও দেখা দিয়েছে উদ্বেগ।
স্থানীয়দের অভিযোগ, পৌরসভার বিভিন্ন ওয়ার্ড থেকে প্রতিদিন ট্রাকে করে গৃহস্থালী ও বাজারের বর্জ্য এনে ৪ নম্বর ওয়ার্ডের চন্ডিবর্দী এলাকায় কুমার নদের তীরে ফেলা হচ্ছে। এসব বর্জ্যের একাংশ সরাসরি নদের পানিতে মিশে যাচ্ছে। ফলে পানির স্বাভাবিক প্রবাহ ও পরিবেশ মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
পৌরসভা সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালের ২০ মার্চ ১৭ দশমিক ২ বর্গকিলোমিটার এলাকা নিয়ে মুকসুদপুর পৌরসভা প্রতিষ্ঠিত হয়। বর্তমানে ৯টি ওয়ার্ড নিয়ে গঠিত এ পৌরসভা ২০১৭ সালে 'খ' শ্রেণিতে উন্নীত হয়। প্রায় ৩০ হাজার ৯৫৯ জন মানুষের বসবাস এই পৌর এলাকায়। অথচ প্রতিষ্ঠার দীর্ঘ সময় পার হলেও এখনো স্থায়ী বর্জ্য ব্যবস্থাপনার কোনো ভাগাড় নির্মাণ করা হয়নি। প্রথম দিকে ঢাকা-খুলনা মহাসড়কের পাশে বর্জ্য ফেলা হতো। পরে গোপীনাথপুর আটাডাঙ্গা বাওড়ে বর্জ্য অপসারণ করা হলেও বর্তমানে কুমার নদের তীরেই বর্জ্য ফেলা হচ্ছে।
চন্ডিবর্দী গ্রামের বাসিন্দা মবিন শেখ বললেন, প্রতিদিন পৌরসভার গাড়িতে করে নদের পাশে ময়লা ফেলা হচ্ছে। বর্জ্য পানিতে মিশে নদের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে। দুর্গন্ধে আশপাশে বসবাস করাও কঠিন হয়ে পড়েছে। একই সঙ্গে মশা-মাছির উপদ্রব আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ী রকিবুল ইসলাম কনকের ভাষ্য, ঝড়ো হাওয়া উঠলে ময়লার স্তূপ থেকে প্লাস্টিক ও অন্যান্য আবর্জনা উড়ে বাজারজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। আবার বৃষ্টির সময় পচা বর্জ্য থেকে তীব্র দুর্গন্ধ সৃষ্টি হয়। এতে ব্যবসা পরিচালনা করা কঠিন হয়ে দাঁড়ায়।
পথচারী উত্তম কুমার জানান, দুর্গন্ধের কারণে অনেক সময় মুখে কাপড় চেপে চলাচল করতে হয়। বর্জ্য ফেলার স্থানের পাশে একটি স্কুল ও একটি মসজিদ রয়েছে। শিক্ষার্থী, অভিভাবক ও মুসল্লিদের চরম দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে। অনেকে বাধ্য হয়ে বিকল্প পথ ব্যবহার করছেন।
টেংরাখোলা বাজারের ব্যবসায়ী হাসান মোল্যা বললেন, বাজারের জবাই করা পশুর বর্জ্য, পচা ফল ও সবজির সঙ্গে অন্যান্য আবর্জনা মিশে অসহনীয় দুর্গন্ধ সৃষ্টি করছে। এতে ক্রেতাদের বাজারে আসার আগ্রহও কমে যাচ্ছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের গোপালগঞ্জ জেলা কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক মাহফুজুর রহমান বলেন, রান্নাঘরের উচ্ছিষ্ট, খাবারের বর্জ্য ও শাকসবজির খোসা পচনশীল বর্জ্য। অন্যদিকে প্লাস্টিক, কাচ, কাগজ ও ধাতব সামগ্রী পুনর্ব্যবহারযোগ্য। আবার হাসপাতালের বর্জ্য ও রাসায়নিক পদার্থ ঝুঁকিপূর্ণ বর্জ্যের মধ্যে পড়ে। এসব বর্জ্য যত্রতত্র ফেলা হলে পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই বর্জ্যের ধরন অনুযায়ী বৈজ্ঞানিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা পৌর কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. রায়হান ইসলাম শোভনের মতে, উন্মুক্ত স্থানে বর্জ্য ফেলে রাখলে সেখান থেকে রোগজীবাণু ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা থাকে। মাছি খাবারের ওপর বসে বিভিন্ন রোগ ছড়াতে পারে। একই সঙ্গে মানুষ ছাড়াও গবাদিপশু ও অন্যান্য প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।
এ বিষয়ে মুকসুদপুর পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদ আশিক কবির জানালেন, স্থায়ী ভাগাড় নির্মাণের জন্য খাস জমি নির্ধারণের প্রক্রিয়া চলছে। জমি নির্বাচন শেষ হলে দ্রুত ভাগাড় নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে। পাশাপাশি পৌরসভার প্রতিটি ওয়ার্ডে বড় আকারের ডাস্টবিন স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।







