আত্মহত্যার মুখোশে চাপা ছিল জোড়া খুন

গ্রাফিকস: আগামীর সময়
ভেতর থেকে বন্ধ একটি আবাসিক হোটেলের কক্ষ। সিলিং ফ্যানে ঝুলছে এক তরুণের নিথর দেহ, আর বিছানায় পড়ে আছে এক তরুণীর প্রাণহীন শরীর। ঘটনাস্থলের দৃশ্য দেখে প্রথমে সবারই ধারণা হয়েছিল, প্রেমঘটিত বিরোধের জেরে তরুণীকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন তরুণ। প্রায় ১০ মাস তদন্ত শেষে থানা পুলিশও সেই সিদ্ধান্তেই পৌঁছায়।
কিন্তু ঘটনাস্থলের কিছু নীরব আলামত যেন অন্য গল্প বলছিল। বালিশের সাদা কভারে রক্তমাখা হাতের ছাপ, ফ্যানে ঝুলন্ত মরদেহের বাঁধা হাত, কক্ষে পড়ে থাকা ভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেটের ফিল্টার, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং ঘটনাস্থলের নানা অসঙ্গতি শেষ পর্যন্ত উন্মোচন করে ভয়াবহ সত্য।
আত্মহত্যা নয়, এটি ছিল পরিকল্পিত জোড়া হত্যাকাণ্ড। তরুণীকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর হত্যা করা হয়। আর তরুণকে হত্যা করে আত্মহত্যার নাটক সাজাতে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়েছিল।
সুমাইয়ার শরীরে কেবল মিজানুরের ডিএনএ পাওয়ার তথ্য তদন্তকে বিভ্রান্ত করেছিল। তবে অন্যান্য আলামত, প্রযুক্তিগত তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন সম্ভব হয়েছে।
ঘটনাটি ২০১৬ সালের ২২ এপ্রিলের। রাজশাহী মহানগরের বোয়ালিয়া থানার হোটেল নাইস ইন্টারন্যাশনালের ৩০৩ নম্বর কক্ষ থেকে উদ্ধার করা হয় পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সুমাইয়া নাসরীন (২১) এবং রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মিজানুর রহমানের (২৩) মরদেহ। পরদিন সুমাইয়ার বাবা পুলিশ সদস্য মো. আব্দুল করিম অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ধর্ষণ ও হত্যা মামলা করেন।
মামলাটি তদন্ত করে বোয়ালিয়া থানা পুলিশ ২০১৭ সালের ১৮ ফেব্রুয়ারি আদালতে ‘তথ্যগত ভুল’ উল্লেখ করে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। সেখানে বলা হয়, মিজানুর রহমান সুমাইয়াকে হত্যার পর আত্মহত্যা করেছেন। তবে এই তদন্তে সন্তুষ্ট হতে পারেননি নিহতদের স্বজন এবং রাষ্ট্রপক্ষ।
পাবলিক প্রসিকিউটরের আপত্তির পর আদালত অধিকতর তদন্তের দায়িত্ব দেয় পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই) রাজশাহীকে।
তদন্তভার পেয়েই ঘটনাস্থলের প্রতিটি আলামত নতুন করে বিশ্লেষণ শুরু করেন পিবিআই কর্মকর্তারা। প্রথমেই তাদের নজরে আসে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ অসঙ্গতি। কক্ষে ছয়টি ভিন্ন ব্র্যান্ডের সিগারেটের ফিল্টার পাওয়া যায়, অথচ দুই ভিকটিমের কেউই ধূমপায়ী ছিলেন না। মিজানুরের মরদেহের দুই হাত বাঁধা ছিল, যা আত্মহত্যার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। সুমাইয়ার মাথার নিচে থাকা বালিশের সাদা কভারে রক্তমাখা হাতের ছাপ ছিল, কিন্তু নিহত দুজনের কারও হাতেই রক্ত ছিল না। ঘটনাস্থলে পাওয়া মিজানুরের সাধারণ বাটন ফোন দিয়ে ফেসবুকে আত্মহত্যার ইঙ্গিত দিয়ে স্ট্যাটাস দেওয়াও সম্ভব ছিল না। এসব আলামতই তদন্তকারীদের সন্দেহ জাগায় যে ঘটনাটি আত্মহত্যা নয়।
এরপর প্রযুক্তিনির্ভর তদন্ত শুরু হয়। কললিস্ট বিশ্লেষণ, সাক্ষ্য-প্রমাণ যাচাই এবং ঘটনার ধারাবাহিকতা পুনর্গঠনের মাধ্যমে একজন সন্দেহভাজনকে শনাক্ত করে পিবিআই। জিজ্ঞাসাবাদে তিনি হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেন এবং অন্য সহযোগীদের নাম জানান। পরে গ্রেপ্তার হওয়া আসামিদের মধ্যে তিনজন আদালতে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন।
ত্রিমুখী প্রেম
১০ জুলাই ২০২৬
তদন্তে জানা যায়, কক্ষে ঢোকার পর মিজানুরকে মারধর করে হত্যা করা হয়। অন্যদিকে সুমাইয়াকে সংঘবদ্ধ ধর্ষণের পর একটি টুল দিয়ে মাথায় আঘাত করা হয়। পরে বালিশচাপা দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। হত্যাকাণ্ডকে আত্মহত্যা হিসেবে উপস্থাপন করতে মিজানুরের মরদেহ সুমাইয়ার ওড়না দিয়ে ফ্যানের সঙ্গে ঝুলিয়ে রাখা হয়।
হত্যার আগেই ভয় দেখিয়ে মিজানুরের ফেসবুকের পাসওয়ার্ড নিয়ে তার আইডি থেকে আত্মহত্যার ইঙ্গিত দিয়ে একটি স্ট্যাটাস দেওয়া হয়। ব্যবহৃত স্মার্টফোনটি নিয়ে যায় আসামিরা। এরপর কক্ষের মূল দরজা ভেতর থেকে বন্ধ করে জানালা দিয়েই পালিয়ে যায় তারা।
দীর্ঘ তদন্ত শেষে ২০১৯ সালের ১৫ এপ্রিল পিবিআই ছয়জনের বিরুদ্ধে নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইনে অভিযোগপত্র দেয়। তারা হলেন— মূল পরিকল্পনাকারী রাহাত মাহমুদ, আহসান হাবিব ওরফে রনি, বোরহান কবির ওরফে উৎস, আল-আমিন এবং হোটেল নাইস ইন্টারন্যাশনালের কর্মচারী বখতিয়ার ও নয়ন হোসেন।
তদন্ত কর্মকর্তা, তৎকালীন রাজশাহী পিবিআইয়ের এসআই মহিদুল ইসলাম বলেছেন, এটি ছিল একটি ক্লুলেস হত্যাকাণ্ড। তবে ঘটনাস্থলের আলামতই শেষ পর্যন্ত তদন্তের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।
তার ভাষ্য, থানা পুলিশের প্রতিবেদনে মিজানুরের মৃত্যুকে আত্মহত্যা বলা হলেও ঘটনাস্থলে পাওয়া বিভিন্ন আলামত সে ধারণার সঙ্গে মিলছিল না। ফ্যানে ঝুলন্ত মরদেহের দুই হাত বাঁধা ছিল। গলায় দুই পাশে দাগ ছিল এবং তার প্যান্ট কোমর থেকে নিচে টেনে নামানো অবস্থায় ছিল। এসব দেখে শুরু থেকেই হত্যার সন্দেহ তৈরি হয়েছিল।
ত্রিভুজ প্রেমের সম্পর্কের জেরে প্রতিশোধ নিতে এই হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনা করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব ও খনিবিদ্যা বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী রাহাত মাহমুদ।
তিনি আরও উল্লেখ করেছেন, সুমাইয়ার শরীরে কেবল মিজানুরের ডিএনএ পাওয়ার তথ্য তদন্তকে বিভ্রান্ত করেছিল। তবে অন্যান্য আলামত, প্রযুক্তিগত তথ্য ও সাক্ষ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন সম্ভব হয়েছে।
পিবিআইয়ের পুলিশ সুপার (লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া) আবু ইউছুফ বলেছেন, শুরুতেই ঘটনাস্থলের প্রতিটি আলামত গুরুত্ব দিয়ে বিশ্লেষণ করা হলে রহস্য উদ্ঘাটনে এত দীর্ঘ সময় লাগত না। শুধু কক্ষের দরজা ভেতর থেকে বন্ধ ছিল—এই একটি বিষয়কে কেন্দ্র করে আত্মহত্যার ধারণায় সীমাবদ্ধ থাকায় থানা পুলিশের তদন্ত ভুল পথে এগিয়ে যায়।
তার ভাষ্য, জানালা দিয়ে প্রবেশের সম্ভাবনা, বাঁধা হাত, রক্তমাখা হাতের ছাপ, প্রযুক্তিগত তথ্য এবং ভিকটিমদের ব্যক্তিগত সম্পর্ক—এসব গুরুত্বপূর্ণ বিষয় যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি।





