ময়মনসিংহে ভিক্ষুকদের জন্য দোকানের সামনে টাকার বাক্স

ছবি: আগামীর সময়
বৃহস্পতিবার এলেই ময়মনসিংহ নগরীর বড় বাজারের চেনা দৃশ্যটি যেন একটু বদলে যায়। দোকানের সামনে ক্রেতাদের ভিড়, ব্যস্ততার ফাঁকে বিক্রেতাদের হাঁকডাক, আর তার মধ্যেই একসঙ্গে জড়ো হন কয়েকশ ভিক্ষুক। কেউ লাঠিতে ভর দিয়ে, কেউ ধীর পায়ে, কেউবা দল বেঁধে ঘুরে বেড়ান দোকান থেকে দোকানে। জীবিকার তাগিদে তাদের কণ্ঠে ভেসে আসে সাহায্যের আকুতি।
তবে বড় বাজারের একটি দোকানের সামনে এসে তাদের আর হাত পাততে হয় না। বলতে হয় না, ‘কিছু টাকা দেবেন?’ অপেক্ষাও করতে হয় না দোকানির দিকে তাকিয়ে।
দোকানের সামনে রাখা একটি প্লাস্টিকের বাক্স থেকেই নিয়মমতো টাকা নিয়ে চলে যান তারা।
নগরীর সাংস্কৃতিক অঙ্গনে পরিচিত বাদ্যযন্ত্র বিক্রয় প্রতিষ্ঠান ‘নবাব এন্ড কোং’-এর সামনে দেখা মেলে এই ব্যতিক্রমী দৃশ্যের। বাক্সটিতে রাখা থাকে ভাংতি টাকা। কোনো ভিক্ষুক এসে সেখান থেকে দুই টাকা নেন, কেউ পাঁচ টাকা। কেউ আবার নিজের কাছে থাকা ভাংতি টাকা দিয়ে প্রয়োজনীয় টাকা তুলে নেন। এরপর নির্বিকারভাবে চলে যান পরের গন্তব্যে।
বিষয়টি যেন দান নেওয়া ও দেওয়ার প্রচলিত দৃশ্যের এক নীরব মানবিক বিকল্প। এখানে নেই করুণার প্রদর্শন, নেই দীর্ঘ কথাবার্তা, নেই কারও সামনে হাত পেতে দাঁড়িয়ে থাকার অস্বস্তি। আছে শুধু প্রয়োজনের সময় প্রয়োজনটুকু নেওয়ার সুযোগ।
দোকানের কর্ণধার ও ময়মনসিংহের বিরল বাদ্যযন্ত্র সংগ্রাহক রেজাউল করিম আসলাম জানান, ভিক্ষুকদের সুবিধার কথা চিন্তা করেই এমন ব্যবস্থা করেছেন তিনি।
তার ভাষায়, এতে ভিক্ষুক ও দাতা উভয়ের সময় সাশ্রয় হয়। কথা বলারও প্রয়োজন হয় না।
প্রতি বৃহস্পতিবারই বড় বাজার এলাকায় ভিক্ষুকদের আনাগোনা বেশি থাকে। সকাল ১১টা থেকে বিকেল পর্যন্ত এভাবে টাকা নেওয়ার সুযোগ থাকে। তবে সকালবেলাতেই ভিড় বেশি হয় বলে জানান তিনি।
সময়ের সঙ্গে মানুষের জীবন যেমন ব্যস্ত হয়ে উঠেছে, তেমনি বেড়েছে মানুষের প্রয়োজনও। সেই ব্যস্ততার মাঝেও কারও অসহায়ত্বকে একটু সহজ করে দেওয়ার এমন ছোট্ট উদ্যোগ হয়তো খুব বড় কোনো পরিবর্তনের গল্প নয়। কিন্তু কারও জন্য দুই টাকা, পাঁচ টাকা কখনো কখনো একবেলার খাবারের সমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
আর সেই টাকাটি যখন কারও হাতে তুলে না দিয়ে একটি বাক্সে রাখা থাকে, তখন দানের দৃশ্যটিও বদলে যায়। দাতা থাকেন আড়ালে, গ্রহীতাকেও দাঁড়িয়ে থাকতে হয় না কারও সামনে। দুজনের মাঝখানে থাকে শুধু একটি প্লাস্টিকের বাক্স।
বড় বাজারের কোলাহলের মধ্যে তাই প্রতি বৃহস্পতিবার এই বাক্সটি হয়ে ওঠে এক নীরব মানবিকতার প্রতীক। কেউ হয়তো দুই টাকা নিয়ে চলে যান, কেউ পাঁচ টাকা। কিন্তু সেই সামান্য টাকার সঙ্গে যে সম্মানটুকু জড়িয়ে থাকে, তার মূল্য কিছুতেই টাকায় মাপা সম্ভব নয়।





