শ্যামনগর
কাদাময় রাস্তায় ধানের চারা রোপণ করে প্রতিবাদ

রাস্তা পাকা করার দাবিতে এলাকার কয়েকজন তরুণ ধানের চারা রোপণ করেন, ছবি : আগামীর সময়
সামান্য বৃষ্টি হলেই কাদায় পরিণত হয় পাঁচ কিলোমিটার সড়ক। কোথাও হাঁটুপানি, কোথাও পিচ্ছিল কাদা। এই সড়ক দিয়ে হেঁটে চলাচল করাই হয়ে ওঠে দুরুহ। বর্ষা মৌসুমে দুর্ভোগ আরও বাড়ে। দীর্ঘদিনের এমন দুর্ভোগের প্রতিবাদে এবার সড়কের কাদাময় অংশে ধানের চারা রোপণ করেছেন সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী এলাকার স্থানীয় কয়েকজন তরুণ।
আজ রবিবার ফরেস্ট অফিস এলাকার নূর মোহাম্মদের বাড়ি থেকে ভেটখালী অভিমুখে আব্দুর রহমানের বাড়ি পর্যন্ত সড়কটির দক্ষিণ কৈখালী বায়তুল মামুর জামে মসজিদের সামনে এ প্রতীকী প্রতিবাদ করেন তারা।
স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, কৈখালী ফরেস্ট অফিস এলাকার নূর মোহাম্মদের বাড়ি থেকে ভেটখালী অভিমুখে হায়দারের ব্রিজ হয়ে আব্দুর রহমানের বাড়ি পর্যন্ত সড়কটির দৈর্ঘ্য প্রায় পাঁচ কিলোমিটার। স্থানীয়ভাবে এটি ‘সীমান্ত সড়ক’ নামে পরিচিত। দীর্ঘদিন ধরে সড়কটি কাঁচা ও বেহাল অবস্থায় থাকায় বর্ষায় দুর্ভোগ চরমে ওঠে।
স্থানীয় বাসিন্দা এবাদুল ইসলামসহ কয়েকজন জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে তাদের এলাকার একমাত্র চলাচলের রাস্তাটি সংস্কার না হওয়ায় বর্ষায় দুর্ভোগ চরমে ওঠে। হাঁটুপানি ও কাদায় শিক্ষার্থী, চাকরিজীবীসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষকে চলাচলে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। জরুরি রোগীকে হাসপাতালে নিতে সড়কপথে যানবাহন চলাচল না করায় নদীপথে ট্রলারের ওপর নির্ভর করতে হয়।
এলাকাবাসীর দাবি, তাদের এই সড়ক দিয়ে চলাচল করা প্রায় ৫০০ মোটরসাইকেল থাকলেও বর্ষায় সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে সেগুলো ব্যবহার করা যায় না। স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের কাছে বারবার জানিয়েও সমাধান না হওয়ায় রবিবার কয়েকজন তরুণ ও এলাকাবাসী মিলে রাস্তা পাকা করার দাবিতে কাদাময় অংশে ধান রোপণ করেছে। কর্তৃপক্ষের নজরে আনতে এ প্রতীকী প্রতিবাদ করা হয়েছে বলে দাবি তাদের।
পূর্ব কৈখালী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র আকরাম হোসেন। সে বলে, ‘প্রতিদিন আমাকে সকালে স্যান্ডেল হাতে নিয়ে স্কুল ড্রেসের প্যান্ট হাঁটু পর্যন্ত তুলে এই পাঁচ কিলোমিটার রাস্তার অনেকাংশে হেঁটে স্কুলে যেতে হয়। আবার স্কুল ছুটির পর একই কায়দায় বাড়িতে ফিরে আসতে হয়। এভাবে আর কত দিন?’
এ বিষয়ে কৈখালী ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ১ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আব্দুর রশিদ জানান, কৈখালী ফরেস্ট অফিস এলাকার নূর মোহাম্মদের বাড়ি থেকে ভেটখালী অভিমুখে হায়দারের ব্রিজ হয়ে আব্দুর রহমানের বাড়ি পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার দীর্ঘ রাস্তাটি কমপক্ষে ৭০/৮০ বছরের পুরোনো। রাস্তাটি ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে কয়েকবার মাটির কাজ করে উন্নয়ন করা হয়েছে। তবে বর্ষা এলে দুর্ভোগের সীমা থাকে না।
তবে তিনি এলজিইডির পক্ষ থেকে সড়কটির মাপ-জরিপ হয়েছে দাবি করে জানান, বর্তমানে এই সড়কের বিষয় নিয়ে চেয়ারম্যান ঢাকাতে অবস্থান করছেন উল্লেখ করে দ্রুতই সড়কটির কাজ হবে বলে দাবি করেছেন।
কৈখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান বলেছেন, গ্রামের কিছু তরুণ রাস্তায় ধান রোপণ করেছেন বলে ফেসবুকে তিনি ছবি দেখেছেন। রাস্তাটি অনেক দিনের পুরোনো। বিষয়টি স্থানীয় স্থানীয় সরকার প্রকৌশলীর কার্যালয়ে অনেক আগে জানানো হয়েছে। সড়কটি গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে জেনেছি। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে এলাকার মানুষ ভোগান্তি পোহালেও কর্তৃপক্ষ বিষয়টি আমলে নিচ্ছে না।
এদিকে সড়কটি নিয়ে স্থানীয় ক্ষোভের বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শেখ আব্দুর রহিমের ১ আগস্ট উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাছে দেওয়া একটি লিখিত অভিযোগে। অভিযোগপত্রে তিনি দাবি করেন, কৈখালী ইউনিয়নের জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলো বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম ব্যবহৃত ও ঝুঁকিপূর্ণ বাঁধের ওপরের কিছু সড়ককে ‘সাতক্ষীরা অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পে’ অন্তর্ভুক্ত করে টেন্ডারের জন্য সুপারিশ করা হয়েছে।
চেয়ারম্যানের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় প্রশাসনের কর্মকর্তাদের কাছে জনগুরুত্বপূর্ণ সড়কগুলোর বিষয়ে সুপারিশ করা হলেও উপজেলা প্রকৌশলী সেগুলো যথাযথভাবে মূল্যায়ন করেননি। ফলে এলাকার মানুষের মধ্যে ক্ষোভ তৈরি হয়েছে। তিনি বিষয়টি সরেজমিন তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তবে অভিযোগপত্রে উপজেলা প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে উৎকোচ গ্রহণ এবং ‘অদৃশ্য শক্তির কালো টাকার প্রভাবে’ প্রকল্প নির্বাচনের যে অভিযোগ করা হয়েছে, সে বিষয়ে তিনি অবগত নন বলে জানান উপজেলা প্রকৌশলী এম আব্দুস সামাদ।
প্রতিবেদকের কাছে অভিযোগের বিষয়টি তুলে ধরলে তিনি তা মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। তার ভাষ্য, ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ায় চেয়ারম্যান তার বিরুদ্ধে এমন অভিযোগ তুলেছেন।
তবে ‘সীমান্ত সড়ক’ নামে পরিচিত রাস্তাটি পাকা করার জন্য গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নয়নকাজের তালিকায় রয়েছে বলে জানান উপজেলা প্রকৌশলী। পর্যায়ক্রমে রাস্তাটিও পাকা করা হবে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
অভিযোগের বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুজ্জাহান কনকের কাছে বক্তব্য জানতে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।






